সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনা আমাদের আবাসন খাতের একটি বড় ক্ষতকে বারবার সামনে এনে দাঁড় করাচ্ছে। আর তা হলো—ভবনের দুর্বল অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা। বহুতল ভবন তো বটেই, এমনকি ৪ থেকে ৭ তলা বিশিষ্ট মাঝারি আকারের ভবনগুলোও এখন অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে থমথম করছে। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে চারতলা একটি সাধারণ ভবন তৈরিতেও অগ্নিনিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
আমাদের দেশের বেশিরভাগ ভবনে যা কেবল কাগজের নকশায় সীমাবদ্ধ, সৌদি আরবে তা বাস্তব এবং আইনিভাবে বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশের অনিরাপদ ভবনগুলোকে সুরক্ষিত করতে এখন সময় এসেছে সেই 'সৌদি মডেল' অনুসরণের।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন? সৌদি আরবের আইন অনুযায়ী, চারতলা বা তার বেশি উচ্চতার যেকোনো ভবনে স্বয়ংক্রিয় ফায়ার স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম (Fire Sprinkler System) থাকা বাধ্যতামূলক। প্রতিটি কক্ষে, করিডোরে এবং বাণিজ্যিক স্পেসে এই স্প্রিঙ্কলার লাগানো থাকে। আগুন লাগার সাথে সাথে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে এই স্প্রিঙ্কলারগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সচল হয়ে পানি ছিটানো শুরু করে। ফলে ফায়ার সার্ভিস আসার আগেই আগুন প্রাথমিক অবস্থাতেই নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
এর পাশাপাশি, ভবনের বাইরে স্থাপন করা থাকে বিশেষ ফায়ার পাইপলাইন বা রাইজার সিস্টেম। এর ফলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এসে সময় নষ্ট না করে সরাসরি নিচে থাকা এক্সট্রা পাইপ সিস্টেমের মাধ্যমে পুরো ভবনে পানি সরবরাহ করতে পারে।
বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র: কাগজে পাস, বাস্তবে ফাঁকি,বাংলাদেশেও বহুতল বা বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদনের জন্য ফায়ার সেফটি প্ল্যান জমা দিতে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাজউক বা ফায়ার সার্ভিসের কাছ থেকে কাগজে-কলমে অনুমতি নেওয়ার পর অনেক ভবন মালিকই খরচ বাঁচানোর জন্য এই আধুনিক স্প্রিঙ্কলার বা এক্সটার্নাল পাইপ সিস্টেম স্থাপন করেন না। ৭ তলা বা তার চেয়ে ছোট ভবনগুলোকে তো অনেকেই 'নিরাপদ' ভেবে এই ব্যবস্থার বাইরেই রেখে দেন। ফলে ছোট একটি আগুন মুহূর্তেই পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে রূপ নেয় বড় ট্র্যাজেডিতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে: "আগুন লাগার পর নেভানোর চেয়ে, আগুন যেন ছড়াতে না পারে সেই ব্যবস্থা রাখাটাই আসল বুদ্ধিমত্তা। ৪ থেকে ৭ তলা ভবনে স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম থাকলে ৮০% অগ্নিকাণ্ড শুরুতেই থামানো সম্ভব।
দেশের প্রতিটি ভবন এবং শপিং মল ও বাজারকে নিরাপদ করতে অবিলম্বে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া উচিত: আইনের কঠোর প্রয়োগ: ৪ তলা বা তার বেশি উচ্চতার প্রতিটি নতুন ও পুরাতন ভবনে ফায়ার স্প্রিঙ্কলার এবং এক্সটার্নাল ফায়ার পাইপলাইন স্থাপন আইন করে বাধ্যতামূলক করতে হবে।
নিয়মিত ঝটিকা অভিযান ও চেকিং: প্রতিটি এলাকার ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিতে হবে, যাতে তারা নিয়মিত প্রতিটি ভবন ও বাজার পরিদর্শনে যান। নকশা অনুযায়ী স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম সচল আছে কিনা তা কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে।
জবাবদিহিতা ও লাইসেন্স বাতিল: যেসব ভবন মালিক আইন অমান্য করে এই সিস্টেম ইনস্টল করবেন না বা বন্ধ রাখবেন, তাদের ভারী জরিমানা এবং ভবনের ব্যবহারের অনুমতি (Occupancy Certificate) বাতিল করতে হবে।
উন্নয়নের মহাসড়কে থাকা বাংলাদেশে আর কোনো 'স্মার্ট' ভবনই নিরাপদ নয়, যদি না সেখানে জীবন বাঁচানোর ন্যূনতম ব্যবস্থা থাকে। সৌদি আরবের মতো আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় ফায়ার ফাইটিং ব্যবস্থা যদি আমরা আমাদের দেশের প্রতিটি কোণায় নিশ্চিত করতে পারি, তবে ভবিষ্যতে অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতি এবং লাশের মিছিল দুটিই শূন্যে নেমে আসবে। এখন প্রয়োজন শুধু প্রশাসনের সদিচ্ছা এবং কঠোর তদারকি।
সম্পাদক ও প্রকাশক : এম জি কিবরিয়া চৌধুরী
দৈনিক বাংলাদেশ অর্থনীতি ৮৫, নয়াপল্টন (৪র্থ তলা) ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ। মোবাইল: ০১৭১২-৭১৪৪৯৩, ০১৫৩৪-৬৪৬১৪১
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত