প্রায় ২৬ বছর আগের সেই দিনের কথা মনের পাতায় ভেসে উঠলেই আজও আমি শিহরিত হয়ে উঠি।
আমার সৌভাগ্য হয়েছিল—বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত আলোকচিত্রী হিসেবে হোয়াইট হাউসের Oval Office-এ উপস্থিত থাকার।
১৯ অক্টোবর ২০০০।
হোয়াইট হাউসের Oval Office-এ মার্কিন প্রেসিডেন্ট Bill Clinton-এর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী Sheikh Hasina-র বৈঠক। দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর ও বিস্তৃত করা, গণতন্ত্র ও অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন, আইনের শাসন, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক শান্তি, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা, অর্থনীতি ও বাণিজ্য, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, শ্রমিক অধিকার, শিশুশ্রম, নারী ও শিশু পাচার, সন্ত্রাসবাদসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হয়। সেই বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতেও এসব বিষয়ের বিস্তৃত উল্লেখ রয়েছে।
আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়—সেদিন আমি শুধু একজন আলোকচিত্রী ছিলাম না; ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের খুব কাছ থেকে সাক্ষী হওয়ার সুযোগও পেয়েছিলাম।
১৬ অক্টোবর ২০০০ — Washington
আমাদের উড়োজাহাজ যতই ওয়াশিংটনের আকাশের দিকে এগিয়ে আসছিল, আমরা ততই উত্তেজনায় অস্থির হয়ে উঠছিলাম। একসময় নিচে তাকিয়ে যেন চোখের পাতা আর পড়ছিল না। এতো এতো সামরিক বিমান—নানা মডেলের, নানা আকারের—থরে থরে সাজানো।
উপর থেকেই নজরে পড়ল Air Force One। একটি নয়, একই রকম, একই রঙের দুটি বিমান। জানলাম, প্রেসিডেন্ট বিমানে ওঠার পর দুটিই একসঙ্গে উড়ে যায়, দুই দিগন্তে। কোনটিতে প্রেসিডেন্ট আছেন, তা যেন সহজে কেউ বুঝতে না পারে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানটি সকাল ১১টার দিকে Washington-এর Andrews Air Force Base-এ এসে নামল। মার্কিন দেশের রাজধানীর মাটিতে আমাদের বিমানটিও যেন বাতাসে তুমুল গর্জন তুলে এসে নামল—গায়ে বাংলাদেশের গর্বের লাল-সবুজ পতাকা।
ঢাকা থেকে যাত্রীবাহী বিমানটি প্রধানমন্ত্রীকে ওয়াশিংটনে নামিয়ে দিয়ে যাত্রী নিয়ে তখনই নিউইয়র্কের উদ্দেশে ফিরে গেল।
এই সফরটি ছিল ১৬–১৯ অক্টোবর ২০০০। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ঐতিহাসিক নথিতেও এটিকে শেখ হাসিনার Working Visitহিসেবে ১৬ থেকে ১৯ অক্টোবর ২০০০ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াশিংটনের ঐতিহাসিক Blair House-এ অবস্থান করেন—যেটি White House-এর ঠিক উল্টো পাশে Pennsylvania Avenue-তে অবস্থিত এবং বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অতিথিদের আতিথেয়তায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার ব্যবহার করে।
১৭ অক্টোবর — Pentagon
পরদিন, ১৭ অক্টোবর সকালে, ছিল মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর Pentagon পরিদর্শন।
ছাত্রজীবনে রাজপথ কাঁপানো স্লোগানে স্লোগানে যে পেন্টাগনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতাম—“কালো হাত ভেঙে দাও”—সেই পেন্টাগনেই আজ আমি দাঁড়িয়ে।
কিছুক্ষণ পরেই এলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।
কী দারুণ সম্মান! আবারও আমাদের লাল-সবুজ পতাকাকে সম্মান জানাল পেন্টাগনের চৌকস মেরিন সেনারা। বাংলাদেশের পতাকার ইতিহাস ও লাখো শহীদের আত্মত্যাগের কথা জেনে কমান্ডারও আবেগাপ্লুত হয়ে প্রধানমন্ত্রীকে এবং বাংলাদেশের পতাকাকে সম্মান জানান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ। সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদনেও ১৭ অক্টোবরের Pentagon সফরের কথা উল্লেখ রয়েছে।
সেই রাতেই Washington-এ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত K. M. Shehabuddin প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেন।
১৮ অক্টোবর — অপেক্ষার দিন
তবে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন তখন মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি-আলোচনার জন্য Sharm el-Sheikh, Egypt-এ ছিলেন। ১৬–১৭ অক্টোবর তিনি সেখানে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি-সম্মেলনে অংশ নেন।
এরপর ১৮ অক্টোবর তাঁকে USS Cole-এ নিহত মার্কিন নাবিকদের স্মরণসভায় Norfolk, Virginia-তে যেতে হয়। ফলে শেখ হাসিনার সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকটি পিছিয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সফর একদিন বাড়িয়ে ১৯ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের সঙ্গে বৈঠকের সুযোগ করে নেন। হোয়াইট হাউসের ১৯ অক্টোবরের ব্রিফিংয়েও বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
আর তাই অপেক্ষা—পরদিনের জন্য।
১৯ অক্টোবর — Oval Office
অবশেষে এলো সেই দিন।
১৯ অক্টোবর সকালে White House-এর Oval Office-এ প্রেসিডেন্ট Bill Clinton এবং প্রধানমন্ত্রী Sheikh Hasina-র বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগমনের কিছু আগেই পৌঁছে গেলাম।
প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন স্বাগত জানালেন। প্রধানমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে বিখ্যাত Rose Garden-এর দিক থেকে হেঁটে এলেন Oval Office-এর দরজার সামনে। এরপর দুই নেতার উপস্থিতিতে আলোকচিত্রী ও সংবাদকর্মীদের সামনে ছবি তোলার পালা।
আর সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের খুব কাছেই ছিল আমার ক্যামেরা।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আলোকচিত্রী হিসেবে আমি তখন তাঁদের সঙ্গে Oval Office-এ।
দুই নেতার প্রতীক্ষিত আলোচনা শুরু হলো।


বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আরও গভীর ও বিস্তৃত করা
গণতন্ত্র, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ এবং আইনের শাসন
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক শান্তি ও SAARC
বাংলাদেশের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম
চট্টগ্রাম পার্বত্য শান্তিচুক্তি ও গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি
Comprehensive Nuclear-Test-Ban Treaty (CTBT)
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস ও মার্কিন বিনিয়োগ
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আরও সুবিধা
তথ্যপ্রযুক্তি এবং Internet for Economic Development Initiative
বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র Tax Treaty ও Air Services
শ্রমিক অধিকার, তৈরি পোশাকশিল্প ও শিশুশ্রমনারী ও শিশু পাচার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ মোকাবিলা
সন্ত্রাসবাদ ও মাদক পাচার বাংলাদেশের পুলিশ ও কারাগারের পেশাগত উন্নয়ন
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের অবদান আর্সেনিক দূষণ, পরিবেশ ও Clean Energy Cooperation
এসব বিষয়ই ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত U.S.–Bangladesh Joint Statement-এ বিভিন্নভাবে নথিভুক্ত হয়েছিল। যৌথ বিবৃতিতে গণতন্ত্র, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, আইনের শাসন, দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি, আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতাসহ দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্র তুলে ধরা হয়।
একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডে দণ্ডিত সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গ। একই সময়ের হোয়াইট হাউস ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের অনুরোধের জন্য একটি extradition treaty প্রণয়নের বিষয়ে আগ্রহী ছিল এবং বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত তথ্যও দিয়েছিল।
সেদিনের বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ, পররাষ্ট্র সচিবসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
১৯ অক্টোবরের সেই বৈঠকটি আজও আমার কাছে শুধুই একটি রাষ্ট্রীয় সফরের ছবি নয়।