ফ্ল্যাটের চাহিদা কমার প্রধান কারণ হিসেবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস ও বিনিয়োগে অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করেন রিহ্যাব সভাপতি। তার মতে, মানুষ ফ্ল্যাট কিনতে চায় না—বিষয়টি এমন নয়; বরং বর্তমান দামে কেনার সামর্থ্য অনেকের নেই। উচ্চ সুদে গৃহঋণ নেওয়াও মধ্যবিত্তের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, আবাসন খাতের সংকট করোনাকাল থেকেই বাড়তে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও বিনিয়োগের অর্থ ও মুনাফা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
ক্ষতিগ্রস্ত ২৭০ সংযুক্ত শিল্প
আবাসন খাতের সঙ্গে রড, সিমেন্ট, সিরামিক, ফার্নিচারসহ প্রায় ২৭০টি সংযুক্ত শিল্প জড়িত বলে জানান আলী আফজাল। এসব শিল্পের বড় ক্রেতা আবাসন খাত। ফলে ফ্ল্যাট নির্মাণ ও বিক্রি কমে গেলে সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোর বিক্রিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে ব্যাংকঋণ পরিশোধে সমস্যা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
রিহ্যাব সভাপতির দাবি, আবাসন খাতে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ কর্মরত। প্রকল্প কমে যাওয়ায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে। তবে ছাঁটাইয়ের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তাঁর কাছে নেই বলে জানান তিনি।
ফ্ল্যাটের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে আনতে নিবন্ধন ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন রিহ্যাব সভাপতি। তার ভাষ্য, বর্তমানে ফ্ল্যাটের নিবন্ধন ও সংশ্লিষ্ট কর-ফি মিলিয়ে ব্যয় প্রায় ১১ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এতে ক্রেতার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে এবং অনেকে নিবন্ধন পিছিয়ে দেন। তিনি বলেন, প্রকৃত বাজারমূল্যের ভিত্তিতে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা এবং ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে নামানো গেলে ক্রেতারা উপকৃত হবেন, একই সঙ্গে নিবন্ধন বাড়ার মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়তে পারে।
এ ছাড়া জমি ও ভবনের নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা পুরোপুরি ডিজিটাল করার দাবি জানান তিনি। তার মতে, অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা ও অনিয়মের কারণে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বাড়ে, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদেরই বহন করতে হয়।
৫ শতাংশ সুদে গৃহঋণের প্রস্তাব
মধ্যবিত্তের আবাসন নিশ্চিত করতে গ্রাহকপর্যায়ে ৫ শতাংশ সুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ দেওয়ার প্রস্তাব দেন আলী আফজাল। তাঁর মতে, ঢাকায় তুলনামূলক বেশি সুদে, জেলা শহরে আরো কম সুদে এবং উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলে প্রায় ১ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে রাজধানীমুখী চাপ কমানো সম্ভব। পাশাপাশি আবাসন ব্যবসায়ীদের জন্য এক অঙ্কের সুদে ঋণের ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
তিনি বলেন, আবাসনকে শুধু বাণিজ্যিক খাত হিসেবে না দেখে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এ খাতে নীতিসহায়তা দিলে নির্মাণ ব্যয় কমানো এবং সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা সহজ হবে।
সাশ্রয়ী আবাসন গড়ে তুলতে সরকারি জমি ব্যবহার করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন রিহ্যাব সভাপতি। তার মতে, কৃষিজমি নষ্ট না করে অব্যবহৃত সরকারি জমিতে পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলা যেতে পারে। পাশাপাশি ঢাকার আশপাশের জেলা ও উপজেলা থেকে রাজধানীতে যাতায়াত সহজ করতে উন্নত সড়ক যোগাযোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তিনি আরো বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে পুনরায় সচল করতে সরকারের নীতিসহায়তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন জরুরি। ঋণ পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফ ও স্বল্প সুদে অর্থায়নের বিষয়ে নেওয়া উদ্যোগগুলোর সুফল ব্যবসায়ীরা যেন পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। রিহ্যাব সভাপতির মতে, সরকার, ব্যাংক ও আবাসন ব্যবসায়ীদের সমন্বিত উদ্যোগে নির্মাণ ব্যয়, গৃহঋণের সুদ ও নিবন্ধন ব্যয় কমানো গেলে আবাসন খাতে গতি ফিরবে। এতে শুধু ফ্ল্যাটের বাজার নয়, সংশ্লিষ্ট শিল্প, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিও উপকৃত হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : এম জি কিবরিয়া চৌধুরী
দৈনিক বাংলাদেশ অর্থনীতি ৮৫, নয়াপল্টন (৪র্থ তলা) ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ। মোবাইল: ০১৭১২-৭১৪৪৯৩, ০১৫৩৪-৬৪৬১৪১
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত