এই বইটা পড়ার পর ইতিহাসের ক্লাসরুমে শেখা আমেরিকার "সভ্যতা বিস্তারের গল্প" আর আগের মতো ঠিক হজম করতে পারবেন না। ১৮৬০ থেকে ১৮৯০, ত্রিশ বছরের এক রক্তাক্ত অধ্যায়, যেখানে "পশ্চিম জয়" শব্দটার আড়ালে লুকিয়ে ছিল একটার পর একটা গোত্র নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার করুণ ইতিহাস।
মূল বইয়ের নাম Bury My Heart at Wounded Knee, লিখেছেন মার্কিন লেখক ও ইতিহাসবিদ ডি ব্রাউন, প্রকাশ ১৯৭০ সালে। বাংলায় অনুবাদ করেছেন দাউদ হোসেন, নাম রাখা হয়েছে "আমারে কবর দিও হাঁটুভাঙ্গার বাঁকে"। এই নামটাও ধার করা, স্টিফেন ভিনসেন্ট বেনের একটা কবিতা থেকে, "American Names"। কবিতার শেষ লাইনটাই বইয়ের নাম হয়ে গেছে, আর সেই লাইন এখন আর কবিতার নয়, ইতিহাসের এক নৃশংস মুহূর্তের প্রতিশব্দ। ১৮৯০ সালের ২৯ ডিসেম্বর, সাউথ ডাকোটার উনডেড নি ক্রিকের ধারে মার্কিন সেনাবাহিনী নিরস্ত্র লাকোটা সিওদের উপর গুলি চালায়, মারা যায় দেড়শোর বেশি মানুষ, বেশিরভাগই বৃদ্ধ, নারী আর শিশু।
ব্রাউন এই বইয়ে নাভাহো, শায়েন, সিওক্স, ইউটসহ একের পর এক গোত্রের গল্প বলেছেন, শুধু সাধারণ ইতিহাস বই যেভাবে বলে সেভাবে না। তিনি ব্যবহার করেছেন কাউন্সিল রেকর্ড, চুক্তির নথি, আত্মজীবনী, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে ওইসব গোত্রের প্রধানদের মুখের সাক্ষ্য।
এতদিন পশ্চিম আমেরিকার ইতিহাস মানেই ছিল কাউবয়, সোনার খনি, রেলপথ, আর "সাহসী পাইওনিয়ারদের" জয়ের গল্প। ইন্ডিয়ানদের কথা এলেও সেটা লেখা হতো সাদা মানুষের কলমে, তাদের চোখ দিয়ে। ব্রাউনের বইটাই প্রথম বড় স্কেলে ঘটনাটা উল্টে দিলো, ভুক্তভোগীর জবানিতে ইতিহাস লেখা হলো। এইজন্যই বইটা শুধু বেস্টসেলার হয়নি, চল্লিশ লাখেরও বেশি কপি বিক্রি হয়ে সতেরোটা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। প্রকাশের পর প্রায় এক বছর ধরে হার্ডকভার বেস্টসেলার তালিকায় ছিল, যা নন-ফিকশন ইতিহাসের বইয়ের জন্য সেসময়ে একটা বিশেষ ঘটনাই বটে।
লেখিকা লেসলি মারমন সিল্কো, যিনি নিজেও নেটিভ আমেরিকান লেখক, এই বই সম্পর্কে বলেছিলেন এই বইয়ে ব্রাউনের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির জোরটাই বইটাকে জীবন্ত করে তুলেছে। এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায় বইটার শক্তি ঠিক আসলে কোথায়। ব্রাউন কোনো নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক সাজেননি, তিনি সচেতনভাবে একটা পক্ষ নিয়েছেন, আর সেই সততাটাই পাঠককে ধাক্কা দেয়।
বইটার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বিস্তারিততা। একটা দুটো গোত্রের করুণ কাহিনি না, আঠারোটা অধ্যায় জুড়ে একের পর এক গোত্রের নিজস্ব ট্র্যাজেডি, যাতে পাঠকের মনে হয় এটা বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা না, বরং একটা সুপরিকল্পিত, পদ্ধতিগত ধ্বংসযজ্ঞ। প্রতিটা চুক্তি ভাঙা, প্রতিটা "শান্তি আলোচনা" আসলে আরেকটা জমি কেড়ে নেওয়ার প্রস্তুতি, এই প্যাটার্নটা বারবার দেখতে দেখতে পাঠক নিজেই বুঝে যায় এখানে ভুল বোঝাবুঝির কোনো জায়গা নেই।
তবে এটাও সত্যি, বইটা পঞ্চাশ বছরের পুরনো, আর ইতিহাসবিদরা এখন বলেন এতে কিছু ফাঁক আছে, কিছু জায়গায় তথ্যগত ভুলও আছে। পরবর্তীতে পিটার কজেন্সের মতো ইতিহাসবিদরা আরও গবেষণালব্ধ বিকল্প বর্ণনা নিয়ে এসেছেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, নতুন গবেষণাগুলো ব্রাউনের মূল বক্তব্যটা খণ্ডন করতে পারেনি, শুধু বিস্তারিত করেছে। অর্থাৎ তথ্যে ফাঁক থাকলেও সিদ্ধান্তটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে।
আরেকটা কথা বলা দরকার, এই বই পড়তে আরাম লাগবে না। এটা কোনো সহজপাচ্য উপন্যাস না যেটা এক বৈঠকে শেষ করে ভালো লাগা নিয়ে ঘুমাতে যাবেন। প্রতিটা অধ্যায় শেষ হয় নতুন একটা পরাজয়ে, নতুন একটা ভাঙা প্রতিশ্রুতিতে। মাঝে মাঝে মনে হবে লেখক যেন ইচ্ছে করেই একঘেয়ে করে তুলছেন, কিন্তু আসলে এই পুনরাবৃত্তিই বইয়ের কৌশল, ইতিহাসটাও তো আসলে পুনরাবৃত্তিরই।
যারা শুধু "ভালো লাগার" জন্য বই পড়েন, তাদের জন্য এটা না। কিন্তু যারা ইতিহাস মানে শুধু বিজয়ীদের গল্প শুনে বড় হয়েছেন, আর একবার অন্য পাশের গল্পটা শুনতে চান, এই বই তাদের জন্য এক গোল্ড মাইন। যারা কলোনিয়াল ইতিহাস, আদিবাসী অধিকার, বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নৈতিকতা নিয়ে ভাবতে ভালোবাসেন, তাদের শেলফে এই বইয়ের একটা জায়গা খুইবই প্রাপ্য।
মন দিয়ে পড়লে পড়া শেষ করার পরও এই বই আপনাকে ছাড়বে না। "সভ্যতা", "উন্নয়ন", "অগ্রগতি" শব্দগুলো শুনলেই মাথায় প্রশ্ন উঠবে, কার বিনিময়ে? ব্রাউন একটা জাতিকে তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলার সুযোগ দিয়েছেন, আর সেই সুযোগটাই তাদের ইতিহাসে প্রথম।
আপনারা কেউ কি এই বইটা পড়েছেন
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।