শত্রু তুমি, বন্ধু তুমি...
১৯৯২ সাল।
তখন আমাদের সারাটা জীবন জুড়েই টিএসসি।
সকালে এসে সারাদিন সংস্কৃতি উদ্ধার করে গভীর রাতে ডেড়ায় ফিরি। জুয়েল (হাসান আবিদুর রেজা) সহ আমরা চারজন মোহাম্মদপুরে এক চিলেকোঠার বাসিন্দা।
সেই তুমুল সময়ে দুই তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বীর গল্প এটা। উঠতি তরুন বয়সে খুব কাছাকাছি থেকে দেখা।
ইতিমধ্যে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালালদের গণ আদালতে বিচারের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
'ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি' 'মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র কমান্ড' 'মুক্তিযোদ্ধা যুব কমান্ড' গঠন হয়েছে। টিএসসি কেন্দ্রীক প্রায় সব সংস্কৃতিকর্মীরা জড়িয়ে গেছে এই আন্দোলনে। দুপুরের খাবারের কোন হিল্লে না হলে আমরা হেঁটে চলে যাই এলিফ্যান্ট রোডের আম্মা( শহীদ জননী)'র বাসায়। পুরো বাড়ি জুড়ে সারাক্ষন শ'য়ে শ'য়ে তরুন-যুবকের সরব উপস্থিতি। ডেকের পর ডেক চড়ানো হচ্ছে। প্লেট পাতলেই একহাতা খিচুড়ি মিলে যায়।
সেখানেই প্রথম দেখি এই দুই তরুনকে। শহীদ জননী'র অন্দরমহল পর্যন্ত ছিলো তাদের অবাধ বিচরন।পুরো বাড়ি, আন্দোলনে আসা তরুনদের নিয়ন্ত্রন করতেন তারা। খাওয়া শেষে পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে শহীদ জননীর পক্ষে ব্রীফ করতেন। শহীদ জননীকে 'আম্মা' ডাকটাও আমরা আত্মস্থ করে ফেলি এদের কাছ থেকে।
শহীদ জননীর বাড়ির বিভিন্ন ব্যবস্থাপনায় আশরাফ কায়সারের উপস্থিতি ছিলো সবচে উজ্জ্বল, সরব। আসিফ নজরুল সবসময় সিনিয়রদের সাথে গুজুরগুজুরে ব্যস্ত থাকতেন। আঠাঁর মতো সব সময় লেগে থাকতেন শাহরিয়ার কবীরের সাথে। সিনিয়রদের সাথে বৈঠকে পর বৈঠক করতেন। হাতে কিছু কাগজপত্র, ফাইল থাকতো।
আশরাফ কায়সার জাহাংগীরনগরের ছাত্র। সাংবাদিক হিশেবে তখনো হইচই ফেলে দেবার মতো আহামরি কিছু করতে পারেননি। কিন্তু আসিফ নজরুল তখনই কয়েকটা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করে লাইমলাইটে, শাহরিয়ার কবীরের স্নেহধন্য।পাশাপাশি আইনের ছাত্র। আন্দোলন গড়ে উঠেছে তার বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র করে।ফলে সবখানে তার প্রভাব ছিলো আশরাফ কায়সারের থেকে বেশী।
নীতি নির্ধারনে সিনিয়র নেতাদের সাথে এরা অংশ নিতেন। ফলে সব তরুনেরা ঘিরে রাখতো, নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকতো এদের। এরাই ছিলো গণ আদালতের তরুন প্রতিনিধিদের নেতা।
গণ আদালতের নথি ছিলো আসিফ নজরুলের জিম্মায়। ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গণ আদালতে সেই নথি পৌছেনি। লাখো মানুষের সামনে অপদস্ত হয়েছিলেন শহীদ জননী।
শহীদ জননী মরনব্যাধি কান্সারের সাথে লড়ছিলেন।এই ঘটনায় তিনি এতোটাই বিপর্যস্ত হয়ে পরেন যে, আন্দোলনের সমস্ত আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।গুরুতর অসুস্থ হয়ে অসহায় মৃত্যুবরন করেন।
শোনা যায়, আইন বিভাগের জামাতি শিক্ষক শাহ আলমের হাতে গণ আদালতের নথি তুলে দেয়ার বিনিময়ে যুক্তরাজ্যে স্কলারশিপ নিয়েছিলেন আসিফ নজরুল।
প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পিএইচডি শেষে আসিফ নজরুল শিক্ষক হিশেবে আইন বিভাগে যোগ দ্যান।
আশরাফ কায়সার রিপোর্টিং-এ যুক্ত থাকেন। পাশাপাশি গড়ে তোলেন বিজ্ঞাপনী সংস্থা।
এক্টিভিজম,কলাম, টকশো উপস্থিতিতে দুজনেই দারুন পাল্লা দিচ্ছিলেন। কিন্তু এইপর্বেও যথারীতি আসিফ নজরুলের চেয়ে অনুজ্জ্বল হয়ে থাকলেন আশরাফ কায়সার।
চব্বিশে দু'জনই রাজপথে ছিলেন সরব। কিন্তু ৫ আগস্ট আসিফ নজরুল পৌছে গেলেন ক্যান্টনমেন্ট। ৮ তারিখ পর্যন্ত অন্তর্বর্তি সরকারের প্রধান হওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। কিন্তু সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ পলিসি মেকার হিশেবে নিজেকে ঠিকই প্রতিষ্ঠা করেন।
আর টকশো তে কখনো সরকারের গুনগান, কখনো তীব্র সমালোচনা করে যমুনার আশেপাশে ভেড়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন আশরাফ কায়সার।
কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যুক্ত হওয়ার আশরাফ কায়সারের সব প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দ্যান প্রথম আলো ও খোদ আসিফ নজরুল।
আসিফ নজরুল এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যুক্ত হওয়ার আক্ষেপ নিয়ে লেখালেখি করে সময় কাটাচ্ছেন। আশরাফ কায়সার টকশোতে ব্যস্ত তারেক রহমানের কৃপাদৃষ্টির।চেষ্টা অব্যাহত আছে।থাকবে।
লেগে রাহো আশরাফ ভাই!
কপাল আর লুংগি কার যে কখন খুলে যাবে, কেউ জানেনা!
by শ্রদ্ধেয় আশরাফুল আলম রিপন
Kamrul Hasan Khokon's Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।