ইন্ডিয়ান আউটলুককে দেওয়া বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার বিশেষ সাক্ষাৎকার।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক সৌরভ শর্মা।
সৌরভ শর্মা :- আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
শেখ হাসিনা - বাংলাদেশ এক গুরুতর রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটা শুধু এক সরকারের বদলে আরেক সরকারের ক্ষমতায় আসা নয়। এটা রাষ্ট্রের নিজস্ব চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন। এটা গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে প্রশ্ন। আমরা যখন সরকারে ছিলাম, তখন আমরা বাংলাদেশকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, উন্নয়ন-কেন্দ্রিক এবং নিরাপদ দেশ হিসেবে গড়ে তুলেছিলাম। আজ সেই বাংলাদেশের জায়গা নিচ্ছে ভয়, গণ-সহিংসতা, প্রতিশোধের রাজনীতি, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং ক্রমবর্ধমান চরমপন্থা। যে বাংলাদেশ সমৃদ্ধি, আস্থা এবং বিশ্বব্যাপী সম্মানের দিকে অবিচলিতভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল, তা এখন ভয়, অনিশ্চয়তা এবং অন্ধকারের আবহে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এটা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটা বাংলাদেশের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ধ্বংসাত্মক রাজনীতির পরিণতি।
সৌরভ শর্মা - রহমান তার প্রথম বড় দ্বিপাক্ষিক সফরের জন্য ভারতের পরিবর্তে চীনকে বেছে নিয়েছেন।
শেখ হাসিনা - প্রত্যেক সরকারেরই তার কূটনৈতিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করার অধিকার আছে। কিন্তু একটি স্বাভাবিক রাষ্ট্রে, সেই অগ্রাধিকারগুলো ইতিহাস, ভূগোল, জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের কল্যাণ দ্বারা পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে তার প্রতিবেশী, বিশেষ করে আমাদের ঐতিহাসিক বন্ধু ভারতের কাছে কখনোই ভুল বার্তা পাঠানো উচিত হয়নি। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধু দুটি সরকারের মধ্যেকার সম্পর্ক নয়, বরং তা গড়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধ, রক্তের ঋণ, ভূগোল, নিরাপত্তা এবং আমাদের জনগণের মধ্যকার জীবন্ত বন্ধনের দ্বারা। বাংলাদেশের উচিত সকল বন্ধু দেশের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। আমাদের চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং অন্যদের সাথে কাজ করা উচিত। কিন্তু ভারসাম্যের অর্থ ইতিহাস ভুলে যাওয়া নয়। এর অর্থ কোনো পরীক্ষিত বন্ধুর সাথে অনিশ্চয়তা তৈরি করাও নয়।
সৌরভ শর্মা - বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের যে পরিবর্তন হচ্ছে, আপনি সেটিকে কীভাবে দেখছেন?
শেখ হাসিনা - বাংলাদেশ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীদের পরিচালিত গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞ বাংলাদেশের মানুষ আজও ভুলে যায়নি। তাই পাকিস্তানের সঙ্গে যেকোনো সম্পর্কই হতে হবে ইতিহাসের সত্যকে স্বীকার করার ভিত্তিতে।
কিন্তু আজ আমরা যা দেখছি, তা কেবল স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়। কূটনৈতিক সৌহার্দ্যের নামে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। পাকিস্তানপন্থী শক্তিকে পুনর্বাসন, সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রভাব বাড়ানো এবং তরুণ প্রজন্মকে পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে গভীর রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। যারা বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানের ছায়াতলে ফিরিয়ে নিতে চায়, তারা অত্যন্ত বিপজ্জনক খেলায় মেতেছে।
সৌরভ শর্মা - আপনার শাসনামলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নিরাপত্তা, সংযোগ (কানেক্টিভিটি) এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতায় যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা কি এখন ঝুঁকির মুখে বলে আপনি মনে করেন?
শেখ হাসিনা - বাংলাদেশে এমন কিছু রাজনৈতিক শক্তি রয়েছে যারা ভারতকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। ভারতবিরোধী রাজনীতি বরাবরই তাদের অন্যতম হাতিয়ার। তারা এটি জাতীয় স্বার্থে নয়, বরং সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে।
আমাদের সরকার গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, স্থলসীমান্ত চুক্তি, সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি, আঞ্চলিক ট্রানজিট সংযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, শরণার্থী প্রত্যাবাসন এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতাসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করেছে। এগুলো কোনো আকস্মিক অর্জন ছিল না।
কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস এবং বর্তমান সরকারের সময়ে তারা এমন একটি চুক্তিও দেখাতে পারেনি। এখন মানুষ তাদের প্রচারণার বাস্তবতা বুঝতে পারছে।
বাংলাদেশে যদি উগ্রবাদ বৃদ্ধি পায়, সংখ্যালঘুরা যদি ভয়ের মধ্যে বসবাস করে এবং ভারতবিরোধী রাজনীতি যদি রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা পায়, তাহলে এই সব অর্জন চাপে পড়বে। দিল্লি ও ঢাকার উচিত স্বল্পমেয়াদি কূটনৈতিক সুবিধার বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র, নিরাপত্তা এবং জনগণের আস্থার বিষয়টি বিবেচনা করা।
সৌরভ শর্মা - বর্তমান সরকার নাকি দেশের গণমাধ্যমকে আপনার বক্তব্য বা সাক্ষাৎকার প্রচার করতে নিরুৎসাহিত করছে।
শেখ হাসিনা - শুধু আমার কণ্ঠ নয়,আওয়ামী লীগও নয়—বাংলাদেশে আজ মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি ও প্রগতিশীল মূল্যবোধের পক্ষে যারা কথা বলেন, তাদের সবাইকে জনজীবন থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। তার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভয়ের শাসন। শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী ও অভিনয়শিল্পীদের মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে,অথবা উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হামলার শিকার হতে হচ্ছে।
সৌরভ শর্মা - আপনি বারবার বাংলাদেশে ফিরে আসার ইচ্ছার কথা বলেছেন। কোন পরিস্থিতিতে সেই প্রত্যাবর্তন সম্ভব বলে মনে করেন?
শেখ হাসিনা - আমি আগেই বলেছি, আমি এ বছরই দেশে ফিরব। আমি ফিরতে চাই, কারণ বাংলাদেশ ভালো নেই এবং দেশের মানুষ কষ্টে আছে।
অসাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা দখলকারী অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার এবং সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান বিএনপি সরকার দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
দেশে আইনের শাসন নেই, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই, গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার সুযোগ নেই। মানুষের ওপর ভয়ের সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমন সময়ে আমি দেশের বাইরে থাকতে পারি না। দেশের মানুষ আমাকে ফিরাতে চায়। তারা বিশ্বাস করে, আমি তাদের এই দুর্দশা থেকে মুক্ত করতে সহায়তা করতে পারব। তাদের পাশে দাঁড়ানো আমার দায়িত্ব।
সৌরভ শর্মা - আপনার দল কীভাবে নিজেদের পুনর্গঠন করবে?
শেখ হাসিনা - প্রত্যেক রাজনৈতিক দলকেই একসময় কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আওয়ামী লীগও এখন সেই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—এটি এক ধরনের স্বাভাবিক আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়া।
যারা আদর্শের জন্য এই দলে এসেছিলেন, তারা আজ আরও দৃঢ়ভাবে দলের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আর যারা ব্যক্তিগত সুবিধা, ক্ষমতা বা সুযোগের জন্য এসেছিলেন, তারা দল বদল করে বা নীরব থেকে নিজেদের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করছেন।
এতে আওয়ামী লীগ দুর্বল হয়নি; বরং আরও পরিশুদ্ধ হয়েছে।
আমি সবসময় তরুণ নেতৃত্বকে উৎসাহ দিয়েছি। আজ অনেক তরুণ নেতা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, নির্যাতন ও চাপ উপেক্ষা করে সাহসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের পতাকা বহন করছেন। তারাই আমাদের ভবিষ্যৎ।
গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে এলে নতুন করে কাউন্সিলের মাধ্যমে দল পুনর্গঠন করা হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মেধাবী ও দেশপ্রেমিক তরুণদের নেতৃত্বে আনা হবে। সেই পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই নেওয়া হয়েছে।
সৌরভ শর্মা - আপনি বর্তমানে নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন। এই কঠিন সময়ে ভারত আপনার সঙ্গে কেমন আচরণ করেছে?
শেখ হাসিনা - ভারত আমাকে সর্বোচ্চ সম্মান, মর্যাদা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করেছে। আমি নিয়মিত আমার পরিবার, দলের নেতা-কর্মী এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।
ভারতের জনগণ ও সরকারের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। কঠিন সময়ে ভারত আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, যেমনটি ১৯৭১ সালেও দাঁড়িয়েছিল।
ভারতে অবস্থান করলে সেই ইতিহাস আরও গভীরভাবে অনুভব করি। বাংলাদেশ যখনই সংকটে পড়েছে, তখনই ভারত ও বাংলাদেশের জনগণের সম্পর্ক কেবল কূটনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি মানবিক এবং ঐতিহাসিক সম্পর্ক।
আমি এ বছরই দেশে ফিরব। কারণ আমার দেশ ভালো নেই, আর দেশের মানুষ কষ্টে আছে। বর্তমান বিএনপি সরকার দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সৌরভ শর্মা - ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কিংবা জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে কি আপনার যোগাযোগ রয়েছে? বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের অবস্থানকে কীভাবে দেখেন?
শেখ হাসিনা - সব ধরনের কূটনৈতিক বা ব্যক্তিগত যোগাযোগ প্রকাশ্যে আলোচনা করা যায় না। ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং ঐতিহাসিক বন্ধু।
আমি বিশ্বাস করি, ভারতের নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
তবে আমি মনে করি, তারা ভালোভাবেই উপলব্ধি করেন যে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা, ভারতের নিরাপত্তা এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
সৌরভ শর্মা - আপনার শেষ দিকের শাসনামলে এমন কোনো বিষয় আছে, যা আপনি ভিন্নভাবে করতে চাইতেন?
শেখ হাসিনা - আমাদের সময়ে সমালোচনা সর্বত্র ছিল—সংবাদপত্রে, টেলিভিশনে, অনলাইন মাধ্যমে, টক শোতে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
মানুষ প্রতিদিন আমাকে, আমার সরকারকে এবং আমার দলকে সমালোচনা করত। আমি সেই সমালোচনা শুনেছি। যেখানে সংশোধনের প্রয়োজন ছিল, সেখানে সংশোধন করেছি।
কেবল সরকারের সমালোচনা করার কারণে কাউকে রাষ্ট্রের শত্রু ঘোষণা করা হয়নি।
সৌরভ শর্মা - আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য আপনি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে কেমন অপরিহার্য বলে মনে করেন?
শেখ হাসিনা - বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্থিতিশীল, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক দুই দেশের জনগণের কল্যাণ এবং সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা ভারতের সঙ্গে যে আস্থার ভিত্তি গড়ে তুলেছিলাম, তা সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সমুদ্রসীমা ও স্থলসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি এবং জনগণের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
Shafiq Babu's Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।