গুলশান ১ নম্বরের ১৩৬ নম্বর রোডের যে বাসায় ইলিয়াস কাঞ্চন থাকেন, সেখানে আগের মতো উচ্ছ্বাস নেই। তবে গতকাল শনিবার রাতে যেন কিছুক্ষণের জন্য ফিরে পেয়েছিল প্রাণচাঞ্চল্য। দরজা পেরিয়ে বসার ঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ল চলচ্চিত্রের বরেণ্য অভিনয়শিল্পী সুচন্দাকে। পাশের সোফায় ছোট বোন চম্পা। দুজনে দীর্ঘদিনের প্রিয় সহকর্মী ইলিয়াস কাঞ্চনের অপেক্ষায়। বসার ঘরের অন্য প্রান্তে অপেক্ষা করছিলেন আরও কয়েকজন।
শনিবার রাত তখন আটটা। বাড়ির দরজা খুলে দিলেন ইলিয়াস কাঞ্চনের ছেলে জয়। অসুস্থতার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। তাঁকে দেখতে তাই ছুটে এসেছেন চলচ্চিত্রের সহকর্মীরা। সুচন্দা ও চম্পার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেবল সহকর্মীর নয়, আত্মীয়তার মতো। একসঙ্গে কাজ করেছেন, রয়েছে সিনেমার অসংখ্য স্মৃতি। সেই টানেই দেশে ফেরার খবর শুনে দুই বোন এসেছেন তাঁকে দেখতে। সঙ্গে এনেছেন উপহার।
ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল পরিচালক গাজী মাহবুবকেও। তিনিও এসেছেন তাঁর প্রিয় মানুষটির সঙ্গে দেখা করতে। তবে তখনো ঘুমে ইলিয়াস কাঞ্চন। মাগরিবের নামাজ শেষে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তিনি। প্রায় রাত নয়টার দিকে ছেলে জয় তাঁকে শোবার ঘর থেকে বসার ঘরে নিয়ে এলেন। সামনে সুচন্দা ও চম্পাকে দেখেই যেন চমকে উঠলেন ইলিয়াস কাঞ্চন। তারপর মুখে ফুটে উঠল হাসি। চোখেমুখে দেখা গেল আবেগও। দীর্ঘ অসুস্থতার ক্লান্তি ছাপিয়ে প্রিয় মানুষদের কাছে পাওয়ার আনন্দ যেন তাঁকে অন্য এক জগতে নিয়ে গেল।
শুরুতেই কাঞ্চনের হাতে তুলে দেওয়া হলো ফুলের তোড়া। কে এসেছেন, জানতে চাইলে হাসতে হাসতে সুচন্দা ও চম্পার দিকে তাকালেন তিনি। যেন নাম বলার প্রয়োজনই নেই—এই দুই মুখ তাঁর কাছে বহু পুরোনো, বহু পরিচিত। কথা বলতে বলতে একসময় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন কাঞ্চন ও চম্পা। চম্পা বললেন, ‘আমরা আপনাকে ভালোবাসি।’
কাঞ্চনও বললেন, ‘আমিও ভালোবাসি সবাইকে। খুব ভালো লাগছে।’ চম্পা আবার জানতে চাইলেন, ‘কতটা ভালোবাসেন?’ কাঞ্চন তখন দুই হাত প্রসারিত করে বললেন, ‘এতটা ভালোবাসি।’ কথাটা শেষ হতেই ঘরে থাকা সবাই হেসে ওঠে। দীর্ঘ চিকিৎসা, অসুস্থতা আর অনিশ্চয়তার দিনগুলো যেন কিছুক্ষণের জন্য দূরে সরে গেল।
এরপর সুচন্দা ও চম্পাকে দুই পাশে বসিয়ে একরকম পুরোনো দিনের আড্ডায় মেতে উঠলেন ইলিয়াস কাঞ্চন। কথার ফাঁকে ফাঁকে ফিরে এল তাঁর কর্মময় জীবনের নানা স্মৃতি। উঠল সুচন্দা প্রযোজিত ‘তিনকন্যা’ ছবির প্রসঙ্গও। যে ছবিতে অভিনয় করেছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন। সিনেমার সেই দিনগুলো যেন আবারও ঘরের ভেতর ফিরে এল কথায়, হাসিতে আর স্মৃতিচারণায়।
একপর্যায়ে দুই বোনের অনুরোধে গান ধরলেন ইলিয়াস কাঞ্চন। শুরুতে গাইলেন ‘অচেনা’ ছবির জনপ্রিয় গান ‘আর যাব না আমেরিকা’। গান গাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে ঠোঁট মেলালেন সুচন্দা ও চম্পা। এরপর আরও কয়েকটি গান শোনালেন তিনি। আড্ডা তখন জমে উঠেছে। হাসি আর কথায় বাড়িটা যেন কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গেল দীর্ঘ অসুস্থতার সময়টুকু।
এর মধ্যেই একে একে এসে পৌঁছান চলচ্চিত্র অঙ্গনের আরও কয়েকজন। ছিলেন অভিনয়শিল্পী সুব্রত, জ্যাকি আলমগীর, প্রযোজক নেতা খোরশেদ আলম। চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির পক্ষ থেকে এসেছিলেন জয় চৌধুরী ও আবীর চৌধুরী।
এরপর চম্পা সঙ্গে করে নিয়ে আসা জমজমের পানি বোতলটা এগিয়ে দিলেন কাঞ্চনের দিকে। নিজের হাতে সেই পানি ইলিয়াস কাঞ্চনকে পান করালেন তিনি। সঙ্গে আনা উপহারের কয়েকটা পাঞ্জাবিও তুলে দিলেন তাঁর হাতে। চম্পার অনুরোধ, পাঞ্জাবিগুলো যেন এবার লন্ডনে যাওয়ার সময় সঙ্গে নিয়ে যান কাঞ্চন। সেখানে গিয়ে যেন উপহারের এসব পোশাক পরেন।
কথা, হাসি আর স্মৃতিচারণায় কখন যে রাত সাড়ে দশটা বেজে গেছে, টেরই পাওয়া যায়নি। কিন্তু এবার বিদায়ের পালা। সুচন্দা ও চম্পাকে তাদের বাসায় ফিরতে হবে। আর ইলিয়াস কাঞ্চনেরও ঘুমের সময় হয়ে এসেছে। ছেলে জয় জানালেন, এখনো এশার নামাজ পড়া হয়নি তাঁর। নামাজ পড়েই ঘুমিয়ে পড়বেন তিনি।
লিফটে একসঙ্গে নামতে নামতে এই প্রতিবেদককে সুচন্দা বললেন, ‘চমৎকার একটা আড্ডা হলো। আমাদের যেমন বেশ ভালো লাগল, কাঞ্চন সাহেবও বেশ উপভোগ করেছেন। অনেক হাসি আর আড্ডা করল। মনে হচ্ছে, আল্লাহ তাঁকে দ্রুত সুস্থ করে তুলবেন।’ বড় বোনের কথায় সায় দিলেন চম্পাও। এরপর দুজন গাড়িতে উঠে চলে গেলেন নিজেদের গন্তব্যে।
দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে দেশে
এর আগে ৩ আগস্ট যুক্তরাজ্যে ১৫ মাসের বেশি সময়ের চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। জনপ্রিয় এই চিত্রনায়ক ও ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা)-এর চেয়ারম্যান গত বছরের এপ্রিল থেকে লন্ডনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হওয়ার পর সেখানে হাসপাতাল ও মেয়ে ইমা ইসলামের বাসায় থেকে তাঁর চিকিৎসা চলেছে।
গত বছরের আগস্টে লন্ডনের একটি হাসপাতালে ইলিয়াস কাঞ্চনের মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকেরা টিউমারের বড় একটি অংশ অপসারণ করতে সক্ষম হলেও ঝুঁকির কারণে পুরো টিউমার সরানো সম্ভব হয়নি। পরে চিকিৎসকেরা তাঁকে ব্রেন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানান।
সম্পাদক ও প্রকাশক : এম জি কিবরিয়া চৌধুরী
দৈনিক বাংলাদেশ অর্থনীতি ৮৫, নয়াপল্টন (৪র্থ তলা) ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ। মোবাইল: ০১৭১২-৭১৪৪৯৩, ০১৫৩৪-৬৪৬১৪১