প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ১১, ২০২৬, ৫:০৫ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুন ৩, ২০২৬, ২:৪০ পি.এম
ঋণের ফাঁদে উন্নয়ন বাজেট
২০২৬-২৭ অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেটে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৩৭ শতাংশ
পরিস্থিতি উত্তরণে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করে নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দেওয়ার তাগিদ অর্থনীতিবিদদের
সরকারের উন্নয়ন বাজেটে ঋণনির্ভরতা বাড়ছে। প্রতি বছরের বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বিশাল আকারের বরাদ্দ রাখা হয়।
এডিপিতে অসংখ্য প্রকল্পও নেওয়া হয়। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয় তার অন্তত ৩৫ শতাংশ বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা থেকে আসবে বলে পরিকল্পনা করা হয়। একই সঙ্গে দেশি অর্থায়নের অভাবে বড় বড় বিদেশি ঋণও নেওয়া হয়। পরে চড়া সুদে সেই ঋণ পরিশোধ করতে হয় দীর্ঘমেয়াদে।
এতে প্রতি বছর সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি এক ধরনের ঋণের ফাঁদে আটকে যাচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। যার ফলস্বরূপ প্রতি বছর বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়ছে অব্যাহতভাবে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করে নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে জোর দেওয়ার প্রতি তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। আবার কখনো কখনো অর্থাভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ নানান কারণে সেগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় কিংবা দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হয়।
তখন সংশোধিত বাজেটে এডিপির আকার কমিয়ে আনা হয়। প্রত্যাশিত বৈদেশিক সহায়তা ও ঋণ না মিললে সে লক্ষ্যমাত্রায়ও ছুরি চালানো হয়। এতে বছরের শুরুতে বিশাল আকারের এডিপি নিয়ে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দেখানো হলেও বাস্তবে তা আর চূড়ান্ত রূপ নেয় না। যা অযাচিত বাধা হিসেবে দেখা দেয় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে। অর্থ ও পরিকল্পনা বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্রমতে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান প্রত্যাশা করা হয়েছিল ৮৬ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে মূল এডিপিকে কাটছাঁট করে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা করা হয়।
বাজেট সংশোধনের সময় বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ৭২ হাজার কোটি টাকা। একইভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অনুমোদিত এডিপির আকার ধরা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা, যার মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে এবং ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে আসবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে সরকারের বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার উন্নতি হবে বলে মনে করে পরিকল্পনা কমিশন।জানা গেছে, গত পাঁচ অর্থবছরে সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়নে বৈদেশিক ঋণ-অনুদাননির্ভরতা অনেকটা বেড়েছে। কমেছে অভ্যন্তরীণ সম্পদের ব্যবহারের হার। গত ২০২০-২১ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) মোট বরাদ্দের মধ্যে প্রকল্প ঋণ-অনুদান হিসেবে বরাদ্দ ছিল ৩০ দশমিক ১০ শতাংশ অর্থ। পরে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে শুধু ২০২২-২৩ অর্থবছর সংশোধিত এডিপির মোট বরাদ্দের মধ্যে প্রকল্প ঋণ-অনুদান হিসেবে বরাদ্দ অর্থের হার আগের অর্থবছরের তুলনায় সামান্য কমেছিল। এ ছাড়া বাকি চার অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান গ্রহণের এই হার বেড়েছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে এটি ছিল মোট বরাদ্দের ৩১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এর পরের অর্থবছরের এটি আবার বাড়ে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ হার বেড়ে হয় ৩২ দশমিক ৮২ শতাংশ।
পরের অর্থবছরে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেটে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৩৭ শতাংশ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও এটা প্রায় ৩৭ শতাংশের কিছুটা বেশি। অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ সম্পদের হার কিছুটা কমেছে। গত ২০২০-২১ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে মোট বরাদ্দের ৬৯ দশমিক ৯০ শতাংশ দেওয়া হয় অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ হার কমে হয়েছে ৬৪ দশমিক ১৯ শতাংশ। এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের মতো দেশগুলোর নিজস্ব সম্পদ খুবই সীমিত। এ ছাড়া আমাদের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ খুবই কম। যদিও আমাদের কাছাকাছি অর্থনীতির অনেক দেশের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ আরও ভালো। এর ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের বিদেশি ঋণ ও সহায়তার দিকে নির্ভর করতে হয়। সেটা আবার ঋণের বোঝা বাড়ায়। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নিজেদের সম্পদ বাড়াতে হবে। একইভাবে সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : এম জি কিবরিয়া চৌধুরী
দৈনিক বাংলাদেশ অর্থনীতি ৮৫, নয়াপল্টন (৪র্থ তলা) ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ। মোবাইল: ০১৭১২-৭১৪৪৯৩, ০১৫৩৪-৬৪৬১৪১