তিনি কেন এই কথাটি বলেছিলেন, তার মূল কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. জীবনের আসল অগ্রাধিকার বুঝতে পারা:
মানুষ সুস্থ অবস্থায় টাকা, গাড়ি, বাড়ি এবং সামাজিক প্রতিপত্তির পেছনে অন্ধের মতো ছোটে। কিন্তু হাসপাতালের বেডে শুয়ে স্টিভ জবস উপলব্ধি করেছিলেন যে, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে এই ধন-সম্পদের কোনো মূল্য নেই। সমস্ত টাকা দিয়েও তখন এক মুহূর্তের জন্য অতিরিক্ত একটা নিঃশ্বাস বা সুস্থ জীবন কিনে নেওয়া সম্ভব হয় না।
২. সম্পদের সীমাবদ্ধতা অনুধাবন:
টাকা দিয়ে পৃথিবীতে দামি গাড়ি, বাড়ি, পোশাক বা বিলাসবহুল আসবাবপত্র সবই কেনা যায়। এমনকি নিজের কাজ করে দেওয়ার জন্য মানুষও ভাড়া করা যায়। কিন্তু হাসপাতালের বেডে থাকা অবস্থায় তিনি বুঝেছিলেন, আপনার হয়ে রোগ ভোগ করার জন্য বা আপনার হয়ে মৃত্যুবরণ করার জন্য কাউকে টাকা দিয়ে ভাড়া করা অসম্ভব।
৩. স্বাস্থ্যই যে আসল সম্পদ তা প্রমাণ করা:
মানুষ বেঁচে থাকার জন্য জীবনের সব শক্তি এবং সময় ব্যয় করে টাকা রোজগার করে। কিন্তু যখন সেই মানুষটিই কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে আইসিইউ (ICU) বা হাসপাতালের বিছানায় পড়ে থাকে, তখন সেই জমিয়ে রাখা সব অর্থ শেষ হয়ে যায় শুধু সামান্য একটু বেঁচে থাকার আকুতিতে। অর্থাৎ, যে টাকা উপার্জনের জন্য স্বাস্থ্য নষ্ট করা হয়েছিল, সেই স্বাস্থ্য ফিরে পাওয়ার জন্য সব টাকা বিলিয়ে দিতেও মানুষ দ্বিধা করে না।
৪. বস্তুগত সুখের অসারতা:
তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, বস্তুগত বা জাগতিক সব সুখ আসলে ক্ষণস্থায়ী। যখন মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে, তখন একজন মানুষের কাছে তার কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্সের চেয়ে তার আপনজনদের ভালোবাসা এবং সুস্থভাবে বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা হয়ে দাঁড়ায়।
সংক্ষেপে:
এই উক্তিটির মাধ্যমে তিনি মানবজাতিকে একটি বড় শিক্ষা দিয়ে গেছেন—অর্থের পেছনে অন্ধ হয়ে না ছুটে নিজের স্বাস্থ্য, পরিবার এবং ভালোবাসার মানুষদের সময় দেওয়া উচিত। কারণ জীবনের শেষ মুহূর্তে হাসপাতালের বেডটিই সবচেয়ে দামি বিছানায় পরিণত হয়, যেখানে পুরো জীবনের উপার্জন বিলিয়ে দিয়েও মানুষ কেবল একটু নিঃশ্বাস ভিক্ষা চায়।

স্টিভ জবস (Steven Paul "Steve" Jobs)
ছিলেন একজন বিশ্বখ্যাত মার্কিন প্রযুক্তি উদ্ভাবক, দূরদর্শী উদ্যোক্তা এবং বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপল ইনকর্পোরেটেডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৫৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে পার্সোনাল কম্পিউটার বিপ্লবের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য করা হয়।
কর্মজীবন ও অবদান:
অ্যাপল প্রতিষ্ঠা:
১৯৭৬ সালে বন্ধু স্টিভ ওজনিয়াকের সাথে মিলে নিজের গ্যারেজে অ্যাপল কম্পিউটার কোম্পানি চালু করেন।
বহিষ্কার ও নেক্সট (NeXT):
১৯৮৫ সালে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের কারণে অ্যাপল থেকে বরখাস্ত হন এবং পরে 'নেক্সট' কম্পিউটার প্রতিষ্ঠা করেন।
পিক্সার অ্যানিমেশন:
১৯৮৬ সালে পিক্সার অ্যানিমেশন স্টুডিওস কিনে নেন, যা পরে বিখ্যাত 'টয় স্টোরি' সিনেমা উপহার দেয়।
অ্যাপলে প্রত্যাবর্তন:
১৯৯৭ সালে নেক্সট কোম্পানিকে অ্যাপল কিনে নিলে তিনি সিইও হিসেবে পুনরায় ফিরে আসেন।
আইকনিক পণ্য:
তাঁর নেতৃত্বে আইম্যাক (iMac), আইপড (iPod), আইফোন (iPhone) এবং আইপ্যাড (iPad) বাজারে আসে, যা প্রযুক্তির দুনিয়া বদলে দেয়।
ব্যক্তিগত জীবন ও দর্শন:
শৈশব:
ক্যালিফোর্নিয়ার কিউপারটিনোতে পল ও ক্লারা জবস নামের এক দম্পতির কাছে তিনি দত্তক সন্তান হিসেবে বড় হন।
শিক্ষা:
রিড কলেজে ভর্তি হলেও মাত্র ছয় মাস পর তিনি প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা ছেড়ে দেন (ড্রপআউট)।
দর্শন:
প্রাচ্যের দর্শন ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল, যার প্রভাব তাঁর পণ্যের সহজ-সরল বা মিনিমালিস্টিক ডিজাইনে দেখা যায়।
বিখ্যাত বক্তব্য:
২০০৫ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে তাঁর দেওয়া বক্তব্যটি বিশ্বজুড়ে বিপুল অনুপ্রেরণা জাগায়, যেখানে তিনি বলেছিলেন—"ক্ষুধার্ত থাকো, বোকা সেজে থাকো" (Stay hungry, stay foolish)।