প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ১২, ২০২৬, ৫:২৭ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ অগাস্ট ২৯, ২০২৬, ৩:৪৫ পি.এম
একই ধর্ম্মের হরেক তরীকা ধর্ম্মীয় আদর্শিক দিককে প্রশ্নবিদ্ধ করবেই
অনলাইন শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬,
দুইদশক আগের কথা।তখন সদ্যপ্রয়াত ভায়রা ভাইয়ের কূলখানিতে গিয়েছিলাম তার হবিগঞ্জ শহরস্থ বাসভবনে। নিকটাত্মীয় স্বজনের অনেকেই উপস্থিত হয়েছিলেন এ অনুষ্টানে।দোয়াদুরূদ পাঠ শেষে মিলাদ মাহফিল সম্পন্ন হলেও হাত উচিয়ে মোনাজাত হলোনা। মৌলানা সাহেব বলেছিলেন -আত্তাহিয়াতু পাঠ করেছি ,আর দোয়ার প্রয়োজন নেই।মনে মনে তখন ভেবেছিলাম ,বাসার দুতিনজন নামাজ আদায়কালে আত্তাহিয়াতু পাঠতো করেনই। তাহলে এই কূলখানি অনুষ্টানের কি প্রয়োজন ছিলো? এতো দূর থেকে আসাটাই তাহলে ভূল? মুখ খুলে বলেছিলাম -আত্তাহিয়াতুর ভাবার্থ অনেকে জানেনা। তোতা পাখীর মতো শুধু আউড়িয়েই যায়।তাই সবার মনঃতুষ্টির জন্য একটি মোনাজাত করলে ক্ষতি কি? কথা শুনে তেলে বেগুণে জ্বলে উঠেছিলেন মৌলানা সাহেব।বলেছিলেন -আপনি আবার কোত্থাইক্যা আইলেন মোল্লা সাহেব? আজাইররা প্যাচাল শুরু করেছেন। পারলে আপনি মোনাজাত পাঠ করেন ,আমি পারবোনা।কথায় কথা বাড়ার সাথে মোল্লার গোয়ার্তুমিও বাড়তে পারে এই আশংকায় আমাকেই ভাটি দিতে হয়েছিলো।
খানাপিনা শেষে ভায়রা ভাইয়ের বড় ছেলে মৌলানা সাহেবের হাতে দু'শ টাকা তুলে দিলে তিনি বলেছিলেন -"ওবেটা,ইতায় পোষাইতো নায়,ওতো দূরথাকি আইছি। আরও কিছু দেওন লাগবো।তুমিতো বোধহয় তোমার মৌলভী বাজারী খালুর ফান্দে পইড়া আমারে কম দিতাছো"।দূর থেকে মনে মনে বলেছিলাম -দোষতো নন্দঘোষেরই।এক দুর্মুখ বলেছিলেন -এইদেশে দোয়া লম্বাবাট্টির পেছনে আছে টাকার পরিমাপ।ওয়াজীর সুরও উঠা নামা করে টাকার অঙ্কে।হালজমানায় কথাটি প্রযোজ্য হতে পারে।কিন্তু আগের জমানা ছিলো ব্যতিক্রমী।আমি দেখেছি আমার নিজ এলাকার এক ওয়াজ মাহফিলে এসেছিলেন প্রিন্সিপাল হরমুজ উল্লা সায়দা সাহেব।আয়োজকদের পক্ষ থেকে তার হাতে ৫০ টাকা তুলেদেয়া হলে তিনি ২০ টাকা রেখে ৩০ টাকা ফেরত দিয়েছিলেন।বলেছিলেন -আমার আসা যাওয়া বাবদ খরচ হয়েছে ২০ টাকা।এগুলোই নিলাম,তার বেশী নিতে পারবোনা।
হরমুজ উল্লা সাহেব ওয়াজস্থলে এসেছিলেন বাসে চেপে এবং পায়ে হেঁটে।তার কোন বাণিজ্যিক ধান্ধা ছিলোনা।এখন হুজুরের আগমণ ঘটে হেলিকপ্টারে চড়ে কিংবা এসি সংযুক্ত মার্সিডিজে চেপে।সুতরাং তাদের খর্চের অঙ্কতো উন্নীত হবে সহস্র কিংবা লাখের অংকে।আগের ওয়াজ মাহফিল ছিলো গাম্ভীর্য্যের প্রতীক এবং ভাব ও আবেগের সংমিশ্রণে টইটম্বুর।এখন রূপ নিয়েছে ফ্যাশন এবং অতিরন্জনের গড্ডালিকা প্রবাহে।আগেকার মৌলানা সাহেবরা গুরু গম্ভীর সুরে বয়ান দিতেন।পিন পতন নীরবতায় হাজিরানরা কান পেতে বয়ান শুনে নিজেদেরকে পরিশুদ্ধ করার পথ বেছে নিতেন।এখনকার ওয়াজীদের বড় অংশ হেলিয়া দুলিয়া ওয়াজ করেন।কখনও কানফাঁটা আওয়াজ দিয়ে মন্চকে কাঁপিয়ে তোলেন।কোরআান হাদিস ছেড়ে রাজনৈতিক বক্তব্যে নিয়ে হুজুর যখন আওয়াজ ছাড়েন তখন সঙ্গত ভাবেই প্রশ্ন জাগে-এটি ইসলামী জলসা নাকি রাজনৈতিক সমাবেশ?হুজুর কি মোফাস্সের নাকি রাজনৈতিক ফেরিওয়ালা? ওয়াজমন্চে যখন জিকির জমে উঠে তখন অঙ্গভঙ্গী দেখে এটিকে বাউলগানের পরিশীলিত সংস্করণ বলেই প্রতীয়মান হয়।এ ব্যাপারে বেশী অগ্রসর হচ্ছিনা।
একই ধর্ম্মের হরেক তরীকা ধর্ম্মীয় আদর্শিক দিককে প্রশ্নবিদ্ধ করবেই।সেদিন শহরের এক মসজিদে নামাজ আদায় করতে গিয়ে বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছি। আমার সম্মুখ সারির একজন এবং পাশের অপর জন ফরজ নামাজ শেষে ইমামের মুনাজাতে হাত উঠান নি।সুন্নত আদায় কালে রুকুতে যাবার আগে তকবিরে তাহরিমার মতো হাত উচালেন।তখন অজান্তেই প্রশ্ন উঠেছিলো ,একই জামায়াতে দুই তরীকার নামাজ? আমি বা আমরা শুদ্ধ নাকি অপর পক্ষ শুদ্ধ?দুইযুগ আগে লন্ডনের রিজেন্ট পার্ক মসজিদে জু'মার নামাজ আদায় করতে গিয়ে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম।দুই তৃতীয়াংশ মুসল্লীর মাথায় টুপী দেখি নাই।বরং আমি এবং আমার চাচাতো ভাইয়ের মাথায় টুপী দেখে অনেকে কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলো আমাদের দিকে। মসজিদ টিতে সৌদী মুসলমানদের উপস্থিতি বেশী থাকে।জুমার ফরজনামাজ শেষে সুন্নত চার রাকায়াত নামাজ শুরু করে পড়েছিলাম বিপদে।অধিকাংশ মুসল্লী ফরজ আদায় করে যে যার পথ ধরেছিলো।মাঝপথে আমরা দু'জন সুন্নতের ইস্তেমাল করতে গিয়ে মসজিদ ত্যাগীদের পথের কাঁটা হয়ে উঠেছিলাম।একজনতো আমার পিঠের উপর পা রেখেই বের হয়ে গিয়েছিলো।এই মসজিদের ইমাম ইংরেজীতেই খুতবা পাঠ করেছিলেন সমকালীন বিশ্ববাস্তবতা নিয়ে।আমাদের দেশে হলেতো হই চই বেঁধে যেতো।আওয়াজ উঠতো -ইমাম সাহেব খুতবার বই থুইয়া আজে বাজে বকলো কেন? রিজেন্টপার্ক মসজিদে নামাজ আদায় করে এই ধারণা জন্মেছিলো যে বাঙাল মুল্লুকের নামাজের তরীকা এবং মধ্যপ্রাচ্যীয় নামাজের তরীকাতে হের ফের আছে।দুবাইতে বসবাস রত আমার শ্যালক ও তার তিন সহযোগী শবে বরাতের নফল নামাজ ও জিকির আসকারের জন্য মসজিদের @এশার জামায়াতে শরীক হয়েছিলো।এশার নামাজ শেষে নফল নামাজ ও জিকির আদায় কালে পুলিশ এসে তাদেরকে চ্যালেম্জ করে বসে।শবে বরাত কে তারা ভাগ্যরজনী তথা কল্পনা বিলাস গণ্যকরে মসজিদ থেকে তাদরকে তাড়িয়ে দিয়েছিলো।বাংলাদেশে মৌসুম এলে বাহারি প্যান্ডেল সাজিয়ে স্থানে স্থানে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন যেভাবে হয় মক্কা মদীনা সহ সন্নিহিত মুসলিম রাষ্ট্র সমূহে এ ধরণের ইন্তেজাম নেই।তাই বলে কি সে সমস্থ অন্চল থেকে ইসলাম উবে গেছে?আমার এ উক্তিতে হয়তো কোন কোন মহল বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারেন।মানলাম ,ওয়াজ মাহফিলে ইসলামী চেতনার প্রসার ঘটায়। কিন্তু যে চেতনা বিভ্রান্তি ও বিভক্তির ব্যাপ্তি ঘটায় সে চেতনার কি কোন প্রয়োজন আছে? তারাবির নামাজ ২০ রাকায়াত না ৮ রাকায়াত এ বিভ্রান্তিতো কোন আম মুসলমান আনেনি? এসেছে ওয়াজ মাহফিলের বক্তা থেকে।তাবলীগ জায়েজ নাকি না জায়েজ এ প্রশ্নতো সাধারণ মুসলমান থেকে আসেনি।এক ওয়াজ মাহফিল থেকে দাড়িয়ে অন্য এলাকার ওয়াজীকে বাতিল বা মুরতাদ ঘোষণার ক্ষমতা কে কাকে দিলো? মিলাদ শরিয়ত বিরোধী এবং কিয়াম বেধাত এমন ফতোয়াতো আম পাবলিক দেয়নি! এমতাবস্থায় সঙ্কটে আছেন আম মুসলমান।তাদের সম্মুখে সমান লেবাসধারি ধর্ম্ম বেত্তার কাফেলা।তন্মধ্যে কে সহি আর কে মেকী সেটি নির্ণয়ের মানদন্ডতো হাতে নেই।মন্জিলে মকসুদ কোথায় দাড়িয়ে আছে সেটিও ঠাহর করা মুশকিল।
অতি সন্নাসে যেমন গাজন নষ্ট হয় তেমনি অতি রন্জন বা অতি ভক্তিতে ধর্ম্মও বোধ হয় খেলো হয়ে উঠে।এতো ওয়াজ মাহফিল এবং এতো ধর্ম্মীয় প্রতিষ্টানের ঘনঘটার মধ্যেও মসজিদের পান্জেগানা নামাজে নামাজীর সংখ্যা বাড়ছেনা কেনো? শহরের অবস্থা যেমন তেমন শহর তলি ও গ্রামীণ মসজিদ গুলোতে নামাজীর উপস্থিতি দেখলে হতবাক হতে হয়।পরিণতি কোন দিকে এগোচ্ছে?
Shared post
Sirajul Islam Siddiki
সুন্দর কথা পড়ে খুব ভালো লাগলো। আম মুসলমান বড়ই বিপদে পড়েছে। ওটা বেদাত ওটা নাজায়েজ শুনতে শুনতে কান ভরে গেছে। আসলে আমাদের পুর্ব পুরুষ গন যে ভাবে চলেছেন আমমরাও সেই ভাবে চলবো ইনশাআল্লাহ।
হযরত আলী (রা:) ও বিখ্যাত সাহাবী মুয়াবিয়া (রা:) কে কাফের উপাধি দিয়েছিল তথাকথিত তৌহিদী জনতা, এবং তাদেরকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল এরাই। অথচ এই তথাকথিত তৌহিদী জনতা নামাজ,রোজা সহ ইসলামের বিধিবিধান মেনে চলতো। ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের প্রসার কোন নবী রাসুলের মাধ্যমে ঘটেনি। এখানে ওয়াজ ব্যবসায়ীদের দ্বারা ইসলাম প্রতিনিয়ত তার সৌন্দর্য হারাচ্ছে এবং ইসলামের প্রকৃত আকিদা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বনী ইসরায়েল জাতিরা ৭১ টি ভাগে বিভক্ত হয়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আর আমরা মুসলমানেরা ৭২ টি ভাগে ভাগ হবো এটা আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বলে গেছেন। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সেই ভবিষ্যৎ বাণী ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। সুতরাং আমাদের ধ্বংস হতে আর বেশি দেরি নেই।
-
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।
সম্পাদক ও প্রকাশক : এম জি কিবরিয়া চৌধুরী
দৈনিক বাংলাদেশ অর্থনীতি ৮৫, নয়াপল্টন (৪র্থ তলা) ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ। মোবাইল: ০১৭১২-৭১৪৪৯৩, ০১৫৩৪-৬৪৬১৪১
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত