জানি প্রতিবেশীরা কী বলাবলি করে। এক বুড়ি বিধবা, হাতে টিফিন ক্যারিয়ার, বারবার হাসপাতালে যায় এক তরুণ, অবিবাহিত ডাক্তারের জন্য নিজের হাতে রান্না করা খাবার নিয়ে। ফিসফিস শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। মেয়ে ফোনে শুনে চিৎকার করে বলল, "মা, তুমি কি একেবারে পাগল হয়ে গেছ? লোকে কী বলবে?"
কারণ এই মানুষটা আমার জন্য যা করেছে, আমার নিজের ছেলেমেয়ে সারা জীবনেও তা করেনি।
আমার নাম জাহানারা বেগম, বয়স ৬৪।
অনেক বছর ধরেই আমি একা থাকি। শহরে ছোট্ট একটা বাড়ি, উঠোনে লাউ আর কাঁচা মরিচের গাছ। স্বামী মারা গেছেন আট বছর আগে। হার্ট। সারা জীবন কারখানায় খেটেছেন, শরীরটা ওখানেই রেখে এসেছেন। দুই সন্তান, রেহানা আর রুবেল, অনেক আগেই বিদেশে চলে গেছে, একজন লন্ডনে, একজন সৌদিতে। ভালো জীবনের জন্যই তো ওদের মানুষ করেছিলাম, বিদেশে পাঠিয়েছিলাম।
কিন্তু ওরা খুব কমই খোঁজ নেয়। ফোন করে বছরে কয়েকবার, বড়জোর ঈদে-পরবে। আর যখন করে, বেশিরভাগ সময় কথা ঘুরেফিরে টাকায় গিয়ে ঠেকে। রুবেলের ব্যবসায় লোকসান, রেহানার ছেলের স্কুলের খরচ, এটা লাগবে, সেটা লাগবে। আমার জমানো টাকা থেকে একটু এদিক-ওদিক পাঠাই, নিজের পেনশন ভেঙে। "মা, তুমি কেমন আছ?" এই প্রশ্নটা শেষ কবে ওরা সত্যিকারের মন থেকে করেছে, মনে পড়ে না। টাকা পাঠালে দুদিন ফোন আসে, তারপর আবার চুপ।
আর গত তিন বছর ধরে আমার জোড়ায় জোড়ায় ব্যথা।
প্রথমে হাঁটুতে। একটু কটকট করে, সকালে জমে যায়। বয়স হয়েছে, ভাবতাম, একষট্টি বছর, এ আর এমন কী। কিন্তু ওটা স্বাভাবিক ছিল না। এক মাস পর সিঁড়ি বেয়ে নামতেই পারতাম না। হাঁটু ফুলে যেন কুমড়ো। এরপর কোমরে, পিঠে ছড়িয়ে পড়ল। ব্যথা পায়ের দিকে নেমে ঝিনঝিন করত। প্রতিটা পা ফেলা যেন কেউ হাঁটুর মালাইচাকিতে ছুরি ঢুকিয়ে দিচ্ছে।
কবিরাজ দেখালাম, তেল-মালিশ, গরম সেঁক। কিছু হলো না। তারপর হোমিও। তারপর পাড়ার চেম্বারের ডাক্তার, পাঁচ মিনিট সময় দিলেন, বললেন বাত, ওষুধ লিখে দিলেন। ছয় মাস খেলাম, কিছুই না। ব্যথা বরং বাড়ল। এক দুষ্টচক্র, ব্যথা, ওষুধ, ব্যথা আরও জোরে ফিরে আসে, আরও কড়া ওষুধ, আর পেট নষ্ট। গ্যাস্ট্রিকে পেট জ্বলে যেত ব্যথার ওষুধে। মেঝেতে সিজদা দিতে গেলে হাঁটু যেন খুলে আসত, চোখে পানি চলে আসত। ধীরে ধীরে লাঠি ধরতে হলো, সিঁড়িতে দুই হাতে রেলিং ধরে উঠতাম। একা থাকি, ঘরের কাজ করাই দায় হয়ে দাঁড়াল।
শেষে বড় হাসপাতালের হাড়ের বিভাগে গেলাম। ভোরবেলা গিয়ে লম্বা লাইনে দাঁড়ালাম, লাঠিতে ভর দিয়ে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
আর সেই লাইনেই প্রথম তাঁর নাম শুনি।
আমার সামনে-পেছনে যারা দাঁড়িয়ে ছিল, সবার মুখে এক কথা। এক ডাক্তারের নাম। ডা. অনূপ ঝুরানি। এক বৃদ্ধ লাঠি উঁচিয়ে বললেন, "এই একজন মানুষই আমাকে হুইলচেয়ার থেকে বাঁচিয়েছেন।" পাশে বসা আমারই বয়সী এক মহিলা বললেন, "উনি এত বড় ডাক্তার, বিভাগের প্রধান, বিদেশ থেকে বড় বড় লোক আসে ওঁর কাছে, অথচ আমার মতো গরিবের কথাও এমন মন দিয়ে শোনেন, যেন আপন কেউ।" আরেকজন বলল, উনি নাকি রোগী দেখতে দেখতে নিজের খাওয়াই ভুলে যান। সবাই এক সুরে তাঁর প্রশংসা করছিল।
আমি ভাবলাম, এত উঁচু পদের ডাক্তার, আমার মতো একজনের দিকে ফিরেও তাকাবেন কি না।
সেদিন যখন আমার পালা এল, তিনি আমার রিপোর্ট আর এক্স-রে অনেকক্ষণ ধরে দেখলেন। একটুও তাড়া দিলেন না। তারপর যা করলেন, তা আজও ভুলিনি। একটু ঝুঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "খালা, বাসায় রান্না কে করে দেয়? সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয় না? রাতে ব্যথায় ঘুম আসে তো? বাসায় দেখার কেউ আছে?"
কেউ আমাকে এসব শেষ কবে জিজ্ঞেস করেছে, মনে পড়ল না। এত বড় একজন ডাক্তার আমার জীবনের খোঁজ নিচ্ছেন। বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। আমি বললাম, "বাবা, তিন বছর ধরে লড়ছি। ছয় রকমের ওষুধ খেয়েছি। কিছুই কাজ করে না। পেট নষ্ট হয়ে গেছে, তবু ব্যথা করেই যায়।"
তিনি শান্ত গলায় বললেন, "জাহানারা খালা, শুধু ব্যথার ওষুধ খেয়ে গেলে এই ক্ষয় থামবে না, শুধু শরীর আরও নষ্ট হবে। এমন একটা জিনিস আছে যা ভেতর থেকে জোড়া আর হাড়ের কাজে সাহায্য করে, শরীরের নিজের সেরে ওঠার ক্ষমতাটা জাগিয়ে তোলে। মুখে খাওয়ার ক্যাপসুল, দিনে মাত্র একটা। কোনো জাদু নয়, শুধু নিয়ম করে খেতে হবে আর একটু সময় দিতে হবে।"
আমাকে কিছু ক্যাপসুল দিলেন নিজের হাতে। বললেন, "আপনার কাছ থেকে আমি কিছু চাই না। শুধু নিয়ম করে খান, দিনে একটা। এক মাস পর আবার আসবেন, নিজের চোখেই দেখবেন।"
দিনে একটা করে খেতে শুরু করলাম। বিশেষ কিছুর আশা করিনি, তিন বছরের হতাশার পর আশা করাই বা কী করে যায়। কিন্তু নিয়ম করে খেয়ে গেলাম, সকালে একটা, রোজ।
এক সপ্তাহ পর টের পেলাম, সকালের সেই জমে যাওয়া ভাবটা তত জোরালো নয়। দুই সপ্তাহ পর একটু সাহস করে নড়াচড়া শুরু করলাম। তিন সপ্তাহ পর অনেক দিন পর প্রথমবার একা একা সিঁড়ি বেয়ে উঠোনে নামলাম। ধীরে, কিন্তু নিজে নিজে, কারও হাত না ধরে। বাইরে বেরিয়ে রোদে দাঁড়িয়ে শুধু নিঃশ্বাস নিলাম, আর চোখে পানি এসে গেল, এবার সুখের।
এক মাস পর আবার হাসপাতালে গেলাম, এবার লাঠি ছাড়া। তিনি আমাকে হেঁটে ঢুকতে দেখে এমন খুশি হলেন, যেন নিজের ঘরের কেউ সুস্থ হয়েছে। নিজের রোগীর জন্য কেউ এত আন্তরিকভাবে খুশি হতে পারে, ভাবিনি।
সেদিন বেরোনোর সময় খেয়াল করলাম, দুপুর গড়িয়ে গেছে, অথচ তাঁর টেবিলে খাবার নেই। এক নার্স আস্তে করে বলল, উনি বিয়ে করেননি, সারাদিন রোগী নিয়ে পড়ে থাকেন, ঠিকমতো খানও না, বাসায় রেঁধে দেওয়ার কেউ নেই।
আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। যে মানুষটা আমাকে নতুন জীবন ফিরিয়ে দিল, সে নিজে দুপুরে না খেয়ে থাকে।
পরের বার আমি রেঁধে নিয়ে গেলাম। মাছ-ভাত, নিজের হাতে, যত্ন করে। প্রথমে তিনি খুব না-না করলেন, বললেন এসবের কোনো দরকার নেই। কিন্তু আমি ছাড়িনি। বললাম, "বাবা, আমার তো রাঁধার কেউ নেই, খাওয়ানোরও কেউ নেই। তুমি খেলে বুড়ির মনটা ভরে।" শেষে তিনি রাজি হলেন, আর খেয়ে বললেন এত ভালো রান্না অনেক দিন খাননি।
সেই থেকে শুরু। যতবার হাসপাতালে যেতাম, শুধু ওষুধ আনতে নয়, এমনিতেও, কিছু না কিছু রেঁধে নিয়ে যেতাম। কখনো মাছ-ভাত, কখনো পিঠা, ঈদে সেমাই। তিনি ব্যস্ততার ফাঁকে একটু বসতেন, খেতেন, আর আমরা গল্প করতাম। আমার ছেলেবেলার কথা, তাঁর ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নের কথা। তিনি হাসতে হাসতে বলতেন, "খালা, আপনি তো আমাকে আমার মায়ের কথা মনে করিয়ে দেন।" এভাবেই আমরা বন্ধু হয়ে গেলাম। এক বুড়ি, আর তার ছেলের বয়সী এক বড় ডাক্তার।
আর প্রতিবেশীরা ফিসফিস করত। বলুক। ওরা তো জানে না, একজন অচেনা মানুষ কী করে আরেকজনকে মৃত্যুর মুখ থেকে টেনে তোলে।
তারপর একদিন আমি মন ঠিক করে ফেললাম। আমার তো আপন বলতে কেউ নেই। ছেলেমেয়ে শুধু টাকার সময় ফোন করে। ভাবলাম, আমার যা কিছু আছে, শহরের বাড়ি, গ্রামের ভিটেমাটি, সারা জীবন গার্মেন্টসে সেলাই করে জমানো সঞ্চয়, সব এই মানুষটার নামে লিখে দেব, যে আমার আপন না হয়েও আপন হয়েছে। একদিন উকিলের কথাটাও তাঁকে বলে ফেললাম। বললাম, বাবা, আমি সব তোমার নামে লিখে দিতে চাই।
তিনি অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর আমার হাত দুটো ধরে বললেন, "খালা, এটা করবেন না। আমি আপনার চিকিৎসা করেছি একজন ডাক্তার বলে, আপনাকে আপন ভেবে, টাকা বা সম্পত্তির জন্য নয়। আপনি যে আমাকে নিজের ছেলের মতো দেখেন, এই ভালোবাসাটুকুই আমার কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া। আপনার এই সম্পত্তি আমি নিতে পারব না।"
আর তারপর যা বললেন, তা আমার চোখ খুলে দিল। "আপনার ছেলেমেয়ের ওপর অভিমান করে থাকবেন না, খালা। ওরা দূরে থাকে, সংসারের চাপে হয়তো ভুল করছে, দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু ওরা তো আপনারই সন্তান। ওদের ক্ষমা করে দিন। আপনার সম্পত্তি আপনার সন্তানদের কাছেই থাক, ওটাই ঠিক।"
এত বড় মনের মানুষ আমি জীবনে দেখিনি। যে চাইলে সব পেতে পারত, সে নিজে থেকে ফিরিয়ে দিল, আর উল্টো আমার সন্তানদের হয়ে কথা বলল।
আজ এক বছর হলো আমি আবার নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আছি। প্রতিদিন হাঁটি, বাজারে যাই, উঠোনের গাছে পানি দিই, কোমর সোজা করে দাঁড়াই, ঠিকমতো নামাজ পড়তে পারি, মেঝেতে সিজদা দিতে পারি। সেই ক্যাপসুল আমি এখনো খাই, দিনে একটা করে। এখন নিজেই আনিয়ে নিই।
কেন আজ এই সব লিখছি? কারণ কিছুদিন আগে খবরে ডা. অনূপ ঝুরানিকে নিয়ে একটা বড় লেখা বেরিয়েছে। তাঁর সেই পদ্ধতি, সেই ক্যাপসুল নিয়ে বিস্তারিত সব লেখা আছে সেখানে, কীভাবে এটা কাজ করে, আমার মতো হাজার হাজার মানুষ কীভাবে আবার হাঁটতে শিখেছে, সব বলা আছে।
আমি চাই আপনিও লেখাটা পড়ুন। বিশেষ করে যদি আপনার বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে থাকে আর জোড়ায় বা পিঠে ব্যথা বাড়ছে।
দয়া করে চিকিৎসা ফেলে রাখবেন না। জোড়া আর মেরুদণ্ডের ক্ষয় নিজে নিজে সারে না, প্রতিটা দিন দেরি মানে অক্ষমতার আরও কাছে চলে যাওয়া। পারলে ভালো একজন ডাক্তার দেখান, আর এই ক্যাপসুলের কথাও জেনে নিন, শুনেছি এখনো ঘরে বসে আনানো যায়।
নিচের লেখাটা পড়ুন। জেনে নিন ডা. অনূপ ঝুরানির এই ক্যাপসুল কীভাবে কাজ করে আর কীভাবে সেটা আনাতে হয়। আমি যা পেরেছি, আপনিও পারবেন।
জাহানারা বেগম, ৬৪ বছর, ঢাকাBaws follow