অনলাইন শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
কারাগার যখন ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ: বন্দিত্বের আড়ালে মানবিক ও রাজনৈতিক সংকট
বাংলাদেশের কারাগারব্যবস্থার সাম্প্রতিক চিত্র শুধু প্রশাসনিক সংকট নয়; এটি বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক স্বা:ধীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগের কারণ। যুক্তরাজ্যের Birkbeck, University of London-এর Institute for Crime & Justice Policy Research পরিচালিত World Prison Brief-এর তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ বাংলাদেশের ৭৫টি কারাগারে বন্দি ছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ১৮০ জন, যেখানে সরকারি ধারণক্ষমতা মাত্র ৪৫ হাজার ১৮৬ জন—অর্থাৎ ধারণক্ষমতার ২২৬.১ শতাংশ। একই তথ্য অনুযায়ী ৬৬.৯ শতাংশ বন্দি বিচারাধীন।
দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় বাংলাদেশের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। কারাগারের ধারণক্ষমতার বিপরীতে শ্রীলঙ্কায় বন্দিত্ব ২১৬ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৬৩ শতাংশ, নেপালে ১৪৪ শতাংশ এবং ভারতে ১১৩ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জনের জায়গায় প্রায় ২২৬ জন বন্দি। এর অর্থ শুধু অতিরিক্ত ভিড় নয়—একটি জায়গা দখল করছেন যখন দুইয়ের বেশি মানুষ, তখন ঘুম, খাবার, চিকিৎসা, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত মর্যাদা—সবকিছুর ওপর চাপ পড়ে।
মানবিক সংকটের প্রমাণও গুরুতর। কারা অধিদপ্তর ও হাসপাতালের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় ১,২৩৫ বন্দির মৃত্যু হয়েছে; এর মধ্যে অন্তত ৩০০ জন হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান।
এর সঙ্গে রাজনৈতিক গ্রেপ্তারের প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। Human Rights Watch (HRW) ২৩ আগস্ট ২০২৬-এর প্রতিবেদনে জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিক, নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে শত শত মানুষ দীর্ঘদিন বিচার-পূর্ব আটক রয়েছেন; অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা প্রমাণের যথেষ্ট ভিত্তি নেই বলে পরিবার ও আইনজীবীরা দাবি করেছেন। HRW আরও কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার কারাগারে মৃত্যুর বিষয়েও তদন্ত ও ন্যায্য বিচারপ্রক্রিয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
এর সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে ৫ অক্টোবর ২০২৬-এ HRW ঢাকায় একটি রাজনৈতিক সভা থেকে প্রায় ২৯০ জনকে আটক এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তারের ঘটনাকে রাজনৈতিক অধিকার সংকটের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অবশ্য কোনো ব্যক্তির অপরাধ বা নির্দোষিতা আদালতই নির্ধারণ করবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—বিচার শেষ হওয়ার আগেই এত মানুষ কেন কারাগারে, কেন জামিনের পথ এত কঠিন, এবং রাজনৈতিক পরিচয় কি আইনের প্রয়োগে পার্থক্য তৈরি করছে?
রাষ্ট্রের শক্তি গণগ্রেপ্তারে নয়। নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক মামলা, দ্রুত বিচার এবং প্রত্যেক নাগরিকের মানবিক মর্যাদা রক্ষায়। অন্যথায় কারাগারের এই ২২৬ শতাংশ ধারণক্ষমতা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতার পরিসংখ্যান নয়—এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য একটি গভীর মানবিক ও গণতান্ত্রিক সতর্কবার্তা।⁩
 মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।