সড়ক ও রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সড়ক, সেতু ও রেল খাতের এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হতে পারে কয়েক লাখ কোটি টাকা। তবে তালিকায় থাকা সব প্রকল্পের জন্য অর্থায়ন পাওয়া যাবে না বা এখনই সেসব বাস্তবায়ন না–ও হতে পারে। তবে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে সরকার বেশি জোর দেবে।
২১ ও ২২ জুন দুই দিনের সফরে প্রধানমন্ত্রীর কুয়ালালামপুর যাওয়ার কথা আছে। সেখান থেকে তাঁর চীন সফরে যাওয়ার কথা। চার মাস আগে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চীনের অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে বেশি ৯টি প্রকল্পের নাম জমা দিয়েছে সেতু বিভাগ। এর মধ্যে আছে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ও গাইবান্ধার বালাসীঘাটের মধ্যে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ প্রকল্প। এটি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে রয়েছে।
দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের জন্য তিনটি সম্ভাব্য পথ (অ্যালাইনমেন্ট) নিয়ে সমীক্ষা চলছে। এগুলো হলো বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি উপজেলা-জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার মধ্য দিয়ে যমুনা নদীর ওপর। অন্যটি গাইবান্ধার বালাসী ঘাট থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ পর্যন্ত। এর বাইরে অন্য যেকোনো উপযুক্ত স্থানে।
এ ছাড়া দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের জন্য তিনটি সম্ভাব্য পথ (অ্যালাইনমেন্ট) নিয়ে সমীক্ষা চলছে। এগুলো হলো বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি উপজেলা-জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার মধ্য দিয়ে যমুনা নদীর ওপর। অন্যটি গাইবান্ধার বালাসী ঘাট থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ পর্যন্ত।
বর্তমানে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর এবং সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা সংযোগকারী যমুনা সেতু দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৩ হাজার যানবাহন চলাচল করে। ঈদের সময় এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। চার লেনের বিদ্যমান সেতুতে তখন দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়।
চীনা অর্থায়নের জন্য প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় যমুনা সেতুর পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ। এই সেতু নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ও রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ার মধ্যে।
পদ্মা সেতুর স্থান নির্ধারণের সময় এই পথটিও বিবেচনায় ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা রুটে সেতুটি নির্মাণ করা হয়।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ার মধ্যে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি আছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ৪৬ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প নিয়েছিল। এর অনেকগুলোই ছিল অপরিকল্পিত। এই ভুল যেন না হয়। সেবাধর্মী প্রকল্প হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই সেবা কীভাবে দেওয়া হবে, তা ঠিক করতে হবে। আর অবকাঠামো প্রকল্প হলে অবশ্যই এর সঙ্গে সংযোগকারী কী কী সুবিধা হতে পারে, তা ভাবতে হবে। নতুবা বড় প্রকল্পের সুফল পুরোটা পাওয়া যাবে না।
সামছুল হক, অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ, বুয়েট ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ
ঢাকা–চট্টগ্রামে উড়াল মহাসড়ক
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে একটি উড়াল মহাসড়ক নির্মাণের প্রতিশ্রুতি আছে। সেতু বিভাগ তাদের তালিকায় এই প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত করে চীনা অর্থায়নের চেষ্টা করতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে দিনে ৩০ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচল করে। দেশের প্রধান বন্দরের সঙ্গে রাজধানীকে যুক্ত করেছে এই মহাসড়ক।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ক্রমবর্ধমান যান চলাচলের কথা বিবেচনা করে ২০০৪ সালে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণসহ একটি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৮ সালে এর সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশা প্রণয়নে অর্থায়ন করে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। ২০১৩ সালের মার্চে অর্থনৈতিক বিষয়–সংক্রান্ত কমিটি পিপিপির অধীন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের অনুমোদন দেয়। ২১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এক্সপ্রেসওয়েটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে ২০২১ সালে এসে প্রকল্পটি বাতিল করে দেয় তৎকালীন সরকার।
তবে সওজ এখনো প্রকল্পটি বাস্তবায়নে তৎপর। তারা বিদ্যমান চার লেনের মহাসড়ক ১০ লেনে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। অন্যদিকে সেতু বিভাগ পথটি উড়াল পথে করার প্রস্তাব দিয়েছে।
ঢাকার জন্য সাবওয়ে ও নতুন এক্সপ্রেসওয়ে
রাজধানীর যানজট কমাতে ঢাকায় পাতাল পথ বা সাবওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনাও চীনা অর্থায়নের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। এর জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে সেতু বিভাগ।
সমীক্ষা অনুযায়ী, রাজধানীর ১১টি রুটে ২৩৮ কিলোমিটার সাবওয়ে নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে চারটি পথ নির্মাণের পরিকল্পনা আছে। এগুলোতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা।
এ ছাড়া সাভারের হেমায়েতপুর থেকে কেরানীগঞ্জ হয়ে নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দ পর্যন্ত প্রায় ৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি উড়াল মহাসড়ক বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পরিকল্পনাও আছে। এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে ২০১৭ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। এটি নির্মাণ করা হলে ঢাকা শহরের ওপর চাপ কমবে এবং তা ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েকে যুক্ত করবে বলে সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা।
সেতু বিভাগের তালিকায় থাকা আরও প্রকল্প হচ্ছে—পাবনা-রাজবাড়ীর মধ্যে সেতু নির্মাণ এবং দ্বিতীয় মুক্তারপুর সেতু নির্মাণ।
এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের মধ্যে বিদ্যমান মুক্তারপুর সেতুটি নির্মিত হয়েছিল চীনের অনুদানে। পরে চীন সেতুটি বিনা পয়সায় মেরামতও করে দেয়। ইতিমধ্যে চীনের রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন নিজেদের অর্থে সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে। এখন নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের মধ্যে আরেকটি সেতু নির্মাণে চীনা অর্থায়ন চায় সেতু বিভাগ।
দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ও রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ার মধ্যে। পদ্মা সেতুর স্থান নির্ধারণের সময় এই পথটিও বিবেচনায় ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা রুটে সেতুটি নির্মাণ করা হয়।
এর বাইরে সেতুবিষয়ক গবেষণা এবং সেতু বিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে চীনা অর্থায়নে দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায় সেতু বিভাগ।
চীনের অর্থায়নে কর্ণফুলী টানেল নির্মিত হয়েছে। ঢাকা-আশুলিয়া উড়াল সড়ক প্রকল্পের কাজ চলমান আছে। বিমানবন্দর থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত নির্মাণাধীন ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগে হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিমানবন্দর থেকে তেজগাঁও অংশ দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। এটিও চীনা কোম্পানি নির্মাণ করছে।