শেখ হাসিনার চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের পালস ভালো বোঝেন—এমন দ্বিতীয় কোনো রাজনীতিবিদ সম্ভবত বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সাংগঠনিক দক্ষতা, সংগঠনের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে কুক্ষিগত করে ফেলা—কোনো সাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও সক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
ভারত হাসিনাকে সর্বতোভাবে ব্যাকআপ করেছে—এ কথা সত্য। কিন্তু ব্যক্তিগত যোগ্যতা না থাকলে অন্যের পায়ে ভর করে খুব বেশি দূর হাঁটা যায় না। তখন নিজে সংসদের চেয়ারে বসে টেবিল চাপড়াতে হয়, আর প্রধানমন্ত্রীর সামনে দাঁড়িয়েই প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে অন্য কাউকে বক্তব্য দিতে হয়।
বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হওয়ার পর শেখ হাসিনা পুরোপুরি ব্যাকফুটে পড়ে গিয়েছিলেন। এখনো তিনি সেখানেই আছেন, তবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।
পালিয়ে যাওয়ার পরও হাসিনা ও ভারত সেনাপ্রধান ওয়াকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি অব্যাহত রেখেছে। ওয়াকারের মাধ্যমে মার্শাল ল’ জারি করাতে না পারলেও ড. ইউনূসের সরকারকে প্রচণ্ড চাপে রাখতে তারা সক্ষম হয়েছে। কোনো রকম মৌলিক সংস্কার ছাড়াই একটি গতানুগতিক নির্বাচন দিয়ে বিদায় নিতে ড. ইউনূস বাধ্য হয়েছেন। এটাকে শেখ হাসিনার প্রাথমিক সাফল্য বলতেই হবে।
আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশে কী ঘটতে যাচ্ছে, সেটা তাঁদের পক্ষে বোঝা খুবই সহজ—যাঁরা শেখ হাসিনার প্লেবুক পড়তে জানেন। ক্রিকেটে প্রত্যেক ব্যাটসম্যানের যেমন কিছু ফেভারিট স্ট্রোক থাকে, তেমনি হাসিনাও কয়েকটি পরিচিত ছকে খেলেন।
সেই খেলার অংশ হিসেবেই ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপিতে ইতিমধ্যে বিপুলসংখ্যক আওয়ামী লীগের লোকজনের অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছে। এদের অধিকাংশই স্বল্পপরিচিত মুখ। এলাকার মানুষ তাদের চেনে, কিন্তু এলাকার বাইরে তাদের কোনো পরিচিতি নেই।
যাদের কিছুটা পরিচিতি আছে, তারা এসব অনুপ্রবেশকারীর মাধ্যমে কৌশলে ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলেছে এবং বিএনপির পেছনে অর্থ ও জনশক্তি বিনিয়োগ করছে। আওয়ামী লীগের টাকা ও জনবলের ওপর ভর করে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে পেরে ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির ওইসব স্থানীয় নেতা এখন ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছে।
দুর্বল কেউ হঠাৎ প্রতাপশালী হয়ে উঠলে যা হয়, সারা দেশে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় নেতাদের অবস্থা এখন ঠিক তাই। এসব স্থানীয় নেতার মুখ দিয়ে জামায়াত ও এনসিপির বিরুদ্ধে যেসব লাগামহীন হুমকি-ধমকি দেওয়ানো হচ্ছে, সেগুলো আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার পরিকল্পনার অংশ। এখন বিষয়টি আর হুমকি-ধমকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; সারা দেশে জামায়াত ও এনসিপির ওপর সহিংস হামলা চালানো হচ্ছে।
পুলিশ ও প্রশাসন সম্পূর্ণ নীরব। কারণ মাঠপর্যায়ের পুলিশ ও প্রশাসনের প্রায় পুরোটাই আওয়ামী লীগের তৈরি। তাদের সঙ্গে পলাতক পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে।
কাজেই ছক অনুযায়ী আগামী মাসগুলোতে জামায়াত ও এনসিপির ওপর হামলা চলতেই থাকবে এবং এর মাত্রা ক্রমাগত বাড়বে।
জামায়াত ও এনসিপি বর্তমানে যেভাবে সহায়ক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে, সেটা শেখ হাসিনার জন্য হতাশাজনক। উত্তেজনা ও সহিংসতা না বাড়লে বাংলাদেশের রাজনীতিতে হাসিনা আবার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না।
হবিগঞ্জে যা ঘটেছে, সেটা মূলত একটি রিহার্সেল। জুলাই মাসে, জুলাই বিপ্লবের শীর্ষ নেতাদের গায়ে হাত তুলে নিজেদের পরিকল্পনার কার্যকারিতা আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা সফলভাবেই পরীক্ষা করে দেখেছে।
ধীরে ধীরে আক্রমণের মাত্রা এতটাই তীব্র করা হবে, যাতে জামায়াত ও এনসিপি আর চুপ করে সহ্য করতে না পারে। যখন তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাবে এবং তারা বিএনপির বিরুদ্ধে ‘অল-আউট অ্যাকশন’-এ যাবে, তখনই খেলার ছক পাল্টে যাবে।
একদিকে বিএনপির সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির চাপ, শীতের সেচ মৌসুমে সার ও জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি; অন্যদিকে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া জামায়াত ও এনসিপির ‘অল-আউট অ্যাকশন’—দুইয়ে মিলে ভয়াবহ এক পরিস্থিতি তৈরি হবে।
তখন সুযোগ বুঝে মাঠের আন্দোলনে ঢুকে পড়বে আওয়ামী লীগ। বিএনপির পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাবে। কারণ বিএনপি যাদের জোরে এখন গুন্ডামি-মাস্তানি করছে, সেই জনশক্তির প্রায় পুরোটাই মূলত আওয়ামী লীগের।
এই ডিসেম্বরে কাজ না হলে পরের ডিসেম্বরে হবে।
কেন ডিসেম্বরে হবে?
যারা সরকারে থাকে, তারা জানে—ডিসেম্বর সরকারের জন্য সংকটের মাস। অন্যদিকে ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের রমরমা ‘চেতনা’ ব্যবসার মৌসুম।
তারেক রহমান কি মোকাবিলা করতে পারবেন?
এক কথায় উত্তর হলো—না, পারবেন না।
দলের শীর্ষ পর্যায়ে তারেক রহমানের সামান্য কিছু নিয়ন্ত্রণ থাকলেও তৃণমূলে তাঁর নিয়ন্ত্রণ ইতিমধ্যেই প্রায় শূন্যের কোটায়। তৃণমূলে চেইন অব কমান্ড বজায় রাখতে যে ধরনের সাংগঠনিক শক্তি, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব প্রয়োজন, সেটা বিএনপির কোনো কালেই ছিল না; এমনকি জিয়াউর রহমানের সময়েও ছিল না।
মনে রাখতে হবে, চট্টগ্রাম বিএনপির দেনদরবার সামলাতে গোয়েন্দাদের সতর্কতা উপেক্ষা করে এক সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার চট্টগ্রাম সফরে গিয়ে জিয়াউর রহমান ক্যু-দেতাদের সহজ শিকারে পরিণত হয়েছিলেন।
দলের শীর্ষ নেতাদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে এক কাপড়ে খালেদা জিয়াকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো আন্দোলন হয়নি।
এতিমের টাকা চুরির মিথ্যা মামলায় খালেদা জিয়া যখন কারাগারে গেলেন, তখনো বিশ্বাসঘাতক নেতারা তাঁর মুক্তির জন্য কোনো কার্যকর আন্দোলনের ডাক দেননি।
তারও আগে ঢাকার বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রাম্য সিঁদেল চোরের মতো দাঁড় করিয়ে দিনের পর দিন প্রহসনের বিচার চালানো হয়েছিল। তখনো বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কেউ আন্দোলনের ডাক দেওয়া তো দূরের কথা, সামান্য প্রতিবাদ পর্যন্ত করেননি।
খালেদা জিয়া ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’র ডাক দিয়েছিলেন। মাত্র দুটি বালুর ট্রাক তাঁর সামনে হিমালয়ের মতো দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। বিশ্বাসঘাতকদের কেউ সেদিন বের হয়ে বেগম খালেদা জিয়ার পাশে দাঁড়ায়নি।
হ্যাঁ—হাসিনার ছক সফল হলে বিশ্বাসঘাতক ও কাপুরুষ বিএনপির কাউকে তারেক রহমানের পাশেও পাওয়া যাবে না। খুব সম্ভবত জিয়াউর রহমানের চেয়েও করুণ পরিণতি তারেক রহমানের জন্য অপেক্ষা করছে।
পুরো সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে তৈরি হয়েছিল এবং সেই কাঠামো এখনো প্রায় সম্পূর্ণ অক্ষত। ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির টি-শার্ট পরে আওয়ামী লীগ ইতিমধ্যে মাঠ দখল করে ফেলেছে।
হবিগঞ্জের ঘটনার পরও যারা খেলা বুঝতে পারছে না, তারা যখন বুঝতে পারবে, ততক্ষণে “মাঠ চলে যাবে বলের বাইরে”।
না—এই মুহূর্তে তারেক রহমানকে কোনো সুসংবাদ দিতে পারছি না বলে দুঃখিত।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মতো বুদ্ধিমত্তা ও সক্ষমতা—দুটির একটিও তাঁর নেই। মা-বাবার দোয়া ‘ধানের শীষ’ পরিবহনে চড়ে জীবনে প্রথম ও সম্ভবত শেষবারের মতো ক্ষমতায় এসেছেন বেচারা। অথচ তিনি যে চেয়ারে বসে আছেন, সেই চেয়ারের পিয়ন হওয়ার যোগ্যতাও তিনি রাখেন কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।
তারেক রহমানের মতো যোগ্যতাসম্পন্ন একজন মানুষকে কোনো বড় প্রতিষ্ঠান অফিস ম্যানেজার পদে চাকরি দেবে—বলুন তো?
আমার কথা বিশ্বাস না হলে, যারা বড় কোম্পানির ইন্টারভিউ বোর্ডে থাকেন, তাঁদের জিজ্ঞাসা করবেন, প্লিজ।
আমাদের দেশের মানুষের দুর্ভাগ্য ও রাজনৈতিক অযোগ্যতা হলো—তারা এমন একজন লোকের হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে, যিনি ৬১ বছরের জীবনে নিজের উপার্জনে কোনো দিন নিজের সংসারও পরিচালনা করেননি।
হ্যাঁ—এটাই সত্যি।
এটাই বাস্তবতা।
তারেক রহমান, আপনাকেই বলছি—
Poor man—your days are numbered!
মইনুল হক
ডেট্রয়েট, মিশিগান।Mohammad Moeenul Hoque's Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।