বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে যে কয়জন মুষ্টিমেয় কর্মকর্তার নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, ড. সা’দত হুসাইন তাঁদের অন্যতম। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি সততা, নিয়মানুবর্তিতা, পেশাগত দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসে একটি মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এই কর্মকর্তা প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব পর্যন্ত অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন এবং অবসরজীবনেও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তাঁর কর্মজীবন ও ব্যক্তিত্ব পরবর্তী প্রজন্মের সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
ড. সা’দত হুসাইনের প্রকৃত উত্তরাধিকার কোনো পদ-পদবিতে নয়, বরং তিনি যে মূল্যবোধ ধারণ ও চর্চা করে গেছেন তার মধ্যে নিহিত। এমন এক সময়ে, যখন প্রশাসনে পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে, তখন তাঁর জীবন প্রমাণ করে যে ব্যক্তিগত সততা ও নৈতিক সাহস দিয়ে একজন কর্মকর্তা প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতাকেও অতিক্রম করতে পারেন। মুক্তিযোদ্ধা, অর্থনীতিবিদ, প্রশাসক ও লেখক—এই বহুমাত্রিক পরিচয়ের সমন্বয়ে গড়া তাঁর জীবন বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে তিনি থেকে যাবেন নিষ্ঠা, নিয়মানুবর্তিতা ও নির্মোহ কর্তব্যপরায়ণতার এক জীবন্ত পাঠ হিসেবে।
ড. সা’দত হুসাইন ১৯৪৬ সালের ২৪শে নভেম্বর নোয়াখালী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। মেধাবী এই শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং অর্থনীতি বিষয়ে অধ্যয়ন সম্পন্ন করেন। কর্মজীবনের মধ্যপর্যায়ে এসে তিনি উচ্চতর গবেষণায় মনোনিবেশ করেন এবং ১৯৮৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি একাডেমিক উৎকর্ষের এই সমন্বয় তাঁর নীতিনির্ধারণী কাজে গভীর বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করেছিল।
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭০ সালে তিনি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তৎকালীন সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানে (সিএসপি) যোগদান করেন। ১৯৭১ সালে নড়াইলে শিক্ষানবিশ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। পাকিস্তানি শাসনের অধীনে চাকরি অব্যাহত রাখার নিরাপদ পথ পরিহার করে তিনি ওই বছরের এপ্রিল মাসে ভারতে গমন করেন এবং প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধকালে প্রবাসী সরকারের অধীনে তিনি সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করেন। একজন তরুণ কর্মকর্তা হিসেবে ক্যারিয়ারের সূচনালগ্নেই দেশের ডাকে সাড়া দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত তাঁর দেশপ্রেম ও নৈতিক দৃঢ়তার পরিচয় বহন করে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত তাঁর গ্রন্থ *মুক্তিযুদ্ধের দিন-দিনান্ত* ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়, যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চায় একটি মূল্যবান প্রামাণ্য সংযোজন হিসেবে বিবেচিত।
স্বাধীন বাংলাদেশে সা’দত হুসাইন প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। মাঠপর্যায়ের প্রশাসন থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত তাঁর কর্মপরিধি বিস্তৃত ছিল। তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করেন। কর্মজীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন এবং ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন শেষে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস থেকে যথারীতি অবসর গ্রহণ করেন।
প্রতিটি দায়িত্বে তিনি যে বৈশিষ্ট্যের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন, তা হলো কঠোর নিয়মানুবর্তিতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দৃঢ়তা এবং সব ধরনের অনৈতিক প্রভাব থেকে নিজেকে দূরে রাখার সক্ষমতা। সহকর্মী ও অধস্তন কর্মকর্তাদের কাছে তিনি ছিলেন একাধারে কঠোর প্রশিক্ষক ও স্নেহশীল অভিভাবক।
অবসর-পরবর্তী দায়িত্ব: পাবলিক সার্ভিস কমিশন-অবসর গ্রহণের পরও রাষ্ট্র তাঁর অভিজ্ঞতা ও সততাকে কাজে লাগাতে চেয়েছে। ২০০৭ সালে তিনি বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন এবং ২০১১ সাল পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও স্বচ্ছতার নীতিকে সমুন্নত রাখার প্রয়াস তাঁর এই দায়িত্বকালের উল্লেখযোগ্য দিক। যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি নিজে একদিন সিভিল সার্ভিসে প্রবেশ করেছিলেন, জীবনসায়াহ্নে সেই নিয়োগপ্রক্রিয়ার অভিভাবকত্বের দায়িত্ব পালন তাঁর কর্মজীবনে এক অর্থপূর্ণ পূর্ণতা এনে দেয়।
ব্যক্তিজীবনে সা’দত হুসাইন ছিলেন সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর। তাঁর স্ত্রীর নাম শাহানা চৌধুরী। এই দম্পতির এক পুত্র—শাহজেদ সা’দত—এবং দুই কন্যা রয়েছে। উল্লেখ্য, সা’দত হুসাইনের মৃত্যুর মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে, ২০২০ সালের ১৩ই মে, শাহানা চৌধুরীও মৃত্যুবরণ করেন।
জীবনের শেষ দিকে সা’দত হুসাইন কিডনি জটিলতা, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। ২০২০ সালের ১৩ই এপ্রিল গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তির পর থেকে তিনি অচেতন অবস্থায় ছিলেন এবং ২০২০ সালের ২২শে এপ্রিল ৭৩ বছর বয়সে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের প্রশাসনিক অঙ্গন, সুশীল সমাজ ও সাবেক সহকর্মীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।
প্রকাশিত গ্রন্থ:
অবসর জীবনে তিনি লেখালেখি করেছেন। তার লেখা কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো-
১। "মুক্তিযুদ্ধের দিন-দিনান্ত",
২। "ছেঁড়া কথার উড়াল ফানুস",
৩। "নীচু স্বরে উঁচু কথা",
৪। "স্মৃতি-প্রীতির সজীব পাতা",
৫। "রুক্ষ সূক্ষ হীর মুক্তো"।- এছাড়া তিনি একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন।
কৃতজ্ঞতা: একটি ছবি জনাব আব্দুল আউয়াল মজুমদারের পোস্ট থেকে নেয়া।
Shamim Alrazi's Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।