কোনো কোনো মুহূর্ত যা আর কিছুতেই ফিরে পাওয়া যায় না। আমার ছবিওয়ালা জীবনে তসলিমা নাসরিন ও সলমন রুশদির সাক্ষাতটিও তাই; এই বিখ্যাত ও বিতর্কিত মাথায় জারি থাকা মৃত্যু ফতোয়াধারী দুজনের মুখোমুখি একবারই মাত্র দেখা হয়েছিলো তাও কলকাতায়, এবং এই সেই মুহূর্ত যা ওয়ার্ল্ড এক্সক্লুসিভ হিসাবে পৃথিবীতে একমাত্র আমার ক্যামেরাতেই ধরা আছে। বিশ্ব সাহিত্য মহলে দুজনেরই অবাধ বিচরণ হলেও এই সাক্ষাতের পর আর কোনোদিনই দুজনকে একসাথে দেখা যায় নি। ফলে একজন ফটো জার্নালিস্ট হিসাবে আমার কাছে এই ছবিটির গুরুত্ব অপরিসীম।
তসলিমা যখন কলকাতায় থাকতো সেইসময় ওর বহু ছবি আমি তুলেছি। আলাপ বন্ধুত্ব খুবই ছিলো, যা আজও বজায় আছে। দিল্লী গেলেই আমি ওর সঙ্গে দেখা করি। কিন্তু একটা বিষয় বলতেই হয় যে, যতবারই দেখা হয়েছে ওর কলকাতায় থাকার ইচ্ছের কথা ব্যক্ত করেছে।
আজ প্রায় কুড়ি বছর পর যখন তসলিমা কলকাতায় ফিরছে স্বাভাবিকভাবেই সেই খবরে শিল্পী , সাহিত্যিক, পাঠক ও সংস্কৃতি মহলে খুশির হাওয়া। আমিও খুবই আনন্দিত।
তসলিমা ও রুশদির এই একমাত্র সাক্ষাতের ছবির গল্পটি সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকদিন আগেই লিখেছি। আমার বইয়েও গল্পটি প্রকাশিত হয়েছে। তবুও তসলিমার ফেরার আনন্দে নিজের ছবিটির স্মৃতিচারণ করতে খুব ইচ্ছে হলো। গল্পটি তাই আবারও আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করে নিলাম....
বিশ্বে এই দুজন মানুষ একবারই মিলিত হন তাও এই কলকাতায়.... এ ছবি আমারই তোলা।
পাশাপাশি দেশের দুই প্রান্তের সাহিত্যক যারা দুজনেই আজ নির্বাসিত স্ব স্ব জগৎ থেকে ....একবারই তারা কিছুক্ষন মুখোমুখী হয়েছিলেন। আর সেই সাক্ষাতের ছবি শুধু এক্সক্লুসিভ না পুরো ঘটনাটা নাটকের স্ক্রিপ্টের মত আমারই সাজানো। আর হয়তো কোন সম্ভাবনাই নেই সলমান রুশদি এবং তসলিমাকে একসাথে কখনো আবার দেখার!! অথচ পৃথিবীতে এই দুজন মানুষ তাদের লেখার জন্য কোন একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সারা পৃথিবী জুড়ে ফতোয়া জারি করে রেখেছে যে এদের কোতল করার!!
ভাবলে অবাক লাগে, সারাজীবন এরা আমার আপনার সাধারণ মানুষের মতো জীবন ধারণ করতে পারলো না। কত ঘৃনা পুষে রাখার নিদর্শন এটাই যে, এতদিন পরও আমরা দেখলাম সলমন রুশদির উপর হামলা করতে। অবাক হয়ে ভাবি, লেখক তার দৃষ্টিকোণে যা লেখে সেটা কারো পছন্দ নাও হতে পারে কিন্তু তাই বলে মৃত্যুর ফতোয়া!!
১১ই সেপ্টেম্বর ২০০৪ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় কলকাতার পাতায় তসলিমা নাসরিন ও সলমান রুশদির এই ছবিটি প্রকাশিত হয়। কিন্তু কি করে ওদের দুজনের দেখা করিয়ে আমি ছবিটা তুললাম তা এখনও ভাবলে খুব আশ্চর্য্য লাগে। কারণ ওদের দুজনের কাছেও তার আগে কোনো ধারণা ছিলো না ওদের দেখা হতে পারে। আমার কাছেও নয়।
তসলিমা নাসরিনের সাথে আমার যোগাযোগ ছিলো বন্ধুর মতো। সেসব কথা আমি একদিন শোনাবো। তসলিমার প্রথম প্রথম কলকাতা থাকার সময় ছবি তোলার সূত্রেই আমার সাথে ওর যোগাযোগ। আনন্দ পাবলিশার্স এর বাদলদা ,সুবীরদাও আমায় অনেক সাহায্য করেছেন।
তসলিমার অদ্ভুত অদ্ভুত আবদার ছিলো। একবার ওর রাতেই শ্মশান দেখার ইচ্ছে হলো। প্রথমে গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু ওর নাছোড়বান্দা আবদারে কেওড়াতলা শ্মশানে যেতেই হলো। সেদিন সাহিত্যিক সুনীলদার জন্মদিনের পার্টি ছিলো। ওখান থেকেই আমরা অনেক রাতে কেওড়াতলা শ্মশান যাই। সাথে আমি ও বিখ্যাত পরিচালক গৌতম হালদার।
সেই রাতে শ্মশানের লম্বা লাইন ছিল শবদেহের। বৃষ্টিও হচ্ছিল। গৌতমদার গাড়িতেই গেছিলাম আমরা তিনজন। তসলিমা গাড়ি থেকে নেমে মুখ ঢেকে শ্মশানে ঘুরতে লাগলো। আমরা একটু গার্ড করে দূরে দূরে ওকে দেখে যাচ্ছি। পুলিশ তো আছেই।
হঠাৎই আমার কানে এলো, "আরে এটা তসলিমা নাসরিন না?"
কিছু শ্মশানযাত্রীর ভিতরে বেশ শোরগোল পরে গেলো। তসলিমাকে দেখার জন্য গুঞ্জন। আমরা তড়িঘড়ি ওকে টেনে নিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে পালিয়ে বাঁচলাম।
তসলিমা মাঝে মাঝে আমায় বলতো, "অশোক আমি কোনদিন স্বভুমি যাইনি। একদিন নিয়ে চলো।"
আমি বলতাম, "ঠিক আছে একদিন যাব।"
তারপর থেকে যখনই তসলিমার সঙ্গে দেখা হয় ওর আবদার শুনতে হতো, "ঐ অশোক কবে যাব আমরা স্বভূমি?"
আমিও, "দাঁড়াও দাঁড়াও সময় মত ঠিক হবে।"....এই বলে যেতাম।
একদিন খবরের কাগজে দেখলাম সলমন রুশদি কলকাতায় এসেছেন। সেদিনই আমার মাথায় ওদের দুজনের ছবি তোলার ভাবনা এসেছিলো। কিন্তু রুশদির সঙ্গে কি করে সাক্ষাৎ করবো ?
তসলিমা তো তখন ঘরের মেয়ে কিন্তু রুশদিকে চিনিও না তাছাড়া তাজ বেঙ্গল হোটেলে কড়া নিরাপত্তা। এমন কি রুশদি কোথায় যাবে কি করবে তাও কেউ জানে না। দিন রাত ভাবতাম যদি ছবিটা তুলতে পারি তাহলে একদিন না একদিন এ ছবির মূল্যায়ন হবে। এর গুরুত্ব আমার কাছে অনেক।
মনে পড়ছে না কোন একটা সূত্র থেকে ( কাগজ কিংবা পুলিশও হতে পারে ) জানতে পারলাম সলমন রুশদি স্বভূমিতে এক সাহিত্য আলোচনায় পরদিন থাকতে পারেন ? যদিও তা কনফার্ম নয়।
সঙ্গে সঙ্গে মনে পরে গেলো, তসলিমাও তো অনেকদিন ধরে বলে আসছিল স্বভূমি যাবার কথা। ফোনে ওকে বললাম, "আমি কাল ফ্রী আছি চলো স্বভূমি যাই।"
ও বললো, "তোমার প্রেসের গাড়িতেই যাবো। প্রেস দেখে আমায় অনেকেই বুঝতে পারবে না। পুলিশদের স্কট আর নেবো না।'
তসলিমা তো পেলাম এদিকে মনের ভিতরে এক উত্তেজনা শুরু হলো, রুশদি আসবে তো ?
দুপুরে তসলিমার বাড়িতেই খেয়ে বিকাল তিনটের সময় ওকে নিয়ে রওনা দিলাম স্বভূমির দিকে। টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। আবহাওয়াটা বেশ ভালো। ওখানে পৌঁছে তসলিমা নিজের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। বহু স্টলে গিয়ে না কিনলেও সব জিনিস দেখছে। কিছু কেনাকাটিও করল। আমরা চা খেলাম। বললো জায়গাটা বেশ ভালো। কিন্তু আমার মাথায় তখন একচিন্তা, "রুশদি আসবে তো?"
যারা স্বভূমি গেছেন তারা জানেন যে গেট দিয়ে ঢুকে অনেকটা সিঁড়ি এঁকেবেঁকে স্বভূমির মূল জায়গায় যেতে হয়। সেখানেও উঁচুনিচু সিঁড়ি ভেঙে নানান স্টল। আগে ওটা ধাপা ছিল ( জঞ্জাল ফেলা হতো) হর্ষ নেওটিয়ার বাবা তখনকার শ্রদ্ধেয় মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর থেকে এক টাকায় কিনে স্বভূমি করেন।
এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছে আমি সারাক্ষণ ওই সিঁড়িগুলোর দিকেই তাকিয়ে যাচ্ছি।
আমাকে এত অন্যমনস্ক দেখে তসলিমা একবার তো বলেই ফেললো, "এই অশোক তুমি করো কি ? চলো আমি এবার কাপড়ের দোকানগুলোতে যাই। দেখি যদি কিছু কেনা যায়।"
এদিকে আমি কিন্তু ওকে খুব একটা ভেতরে নিয়ে যাচ্ছি না। কাছাকাছি ঘুরছি।
বললাম, "বেশী দূরে যাবে না। আমি একটু বসলাম পা ব্যাথা করছে।"
আসল কথা হচ্ছে, অন্ধকার হয়ে এসেছে, আমায় ওই লাইটে রুশদিকে দেখতে হবে তো!! একবার হলে ঢুকে পড়লে আমার ছবি তোলা কঠিন হয়ে যাবে।
নানান কিছু ভাবছি। হঠাৎ দেখি গোটা চার পাঁচেক সিকিউরিটি রুশদিকে নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে আমার ডাইনে বাঁয়ে তাকিয়ে দেখি তসলিমা নেই। সে তখন অনেকটা পিছনে এক জায়গায় দোকান থেকে কি সব কিনছে!! আমি দ্রুত গিয়ে ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে এলাম।
তসলিমা বললো আরে, "করো কি?"
আমি বললাম, "সলমান রুশদিকে দেখলাম।"
ও বললো, "হ্যাঁ আমি জানি তো ও কলকাতায় এসেছে।"
বললাম, "স্বভূমি এসেছে দেখা করবে না? চলো না..."
দেখলাম ওর কোনো গরজ নেই। উল্টে আমায় বললো, "তুমি যাও ছবি তোলো।"
বলেই গুম মেরে দাঁড়িয়ে থাকলো....
আরে এতো দেখছি মহাবিপদ। বুঝলাম, তসলিমা যাবে না। কি মনে হলো, আমি তরতর করে কিছু সিঁড়ি বেয়ে নেমে একবারে রুশদির সামনে।
সরাসরি বললাম, "মিস্টার রুশদি ইউ নো তসলিমা নাসরিন ?"
রুশদি বললেন, "ইয়েস অফকোর্স।"
তারপরেই রুশদিকে বললাম, "লুক দেয়ার সি ইজ।"
আমার কথা শুনে রুশদি তসলিমার দিকে এগিয়ে গেলেন। তসলিমাও রুশদি এগিয়ে আসতে দেখেই নিজেও এগিয়ে এলেন। কিন্তু জায়গাটায় খুব একটা আলো নেই। আমি আন্দাজ করেই ক্যামেরায় ক্লিক করলাম। সাদা কালো ছবিটা দেখলেই বুঝতে পারবেন।
"হ্যাল্লো তসলিমা হাও আর ইউ".....বলেই তসলিমার সাথে হ্যান্ডশেক করে রুশদি বললেন..."হিয়ার আই হ্যাভ সাম ওফ মাই লিটারেরি ওয়ার্ডস। ডু কাম এন্ড ব্রাউজ।"
গোটা ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটে গেল যে আমি কি তুললাম জানিনা। এরপরই রুশদি হলের ভেতরে ঢুকে গেলেন।
তসলিমাকে বললাম, "চলোনা ভেতরে যাই।"
তসলিমা বলল, "না। আমি কেন যাব? ওরা কি আমায় ইনভাইট করেছে ?"
বললাম, "কেন রুশদি তো বললেন যেতে। আরে তুমি ঢুকলে ওরাও বর্তে যাবে।"....বলেই প্রায় হাত ধরে তসলিমাকে নিয়ে হলে ঢুকে পড়লাম। কর্তৃপক্ষরা তসলিমাকে দেখেই সামনের চেয়ারে নিয়ে গিয়ে বসালো।
কিন্তু কিছুক্ষন পর লক্ষ্য করলাম তসলিমার মন নেই ওখানে বসার। বা ওদের কথা শোনার। কিন্তু আমি চাইছিলাম একটু গুছিয়ে কিছু ছবি যাতে তোলা যায়। অন্ধকারে কি যে তুললাম। আর একটা সুযোগ যদি পাওয়া যায়।
হঠাৎ করে দেখি তসলিমা সিট ছেড়ে রুশদির কাছে গিয়ে কি একটা বলছে। তারপরেই বেরিয়ে এলো। আমার কথা শোনা তো দূরে থাক। আমি খুব দ্রুত ওই মুহূর্তটা ক্লিক করলাম। এখানে সেই ছবিও আছে। এবার মনে ভীষন শান্তি এলো।
বেরিয়ে আর একবার চা খেয়ে তসলিমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গাড়িতে উঠে তসলিমাকে বললাম, "আমাকে আনন্দবাজারে নামিয়ে তুমি ক্যামাক স্ট্রিট(তসলিমার বাড়ি) চলে যাও। রাস্তায় কোনো কাজ থাকলে করে নিও। তাড়াহুড়ো নেই।"
লক্ষ্য করলাম, গাড়িতে ও একটু চুপ ছিল। আমি তো কতক্ষনে অফিস পৌঁছবো সেই ভাবছি।
হটাৎ তসলিমা বলে উঠলো, "আচ্ছা অশোক তুমি জানতা না যে এখানে সলমান রুশদি আসবে ?"
আমি চুপ করে থাকলাম। অফিস নামার সময় পিঠে আলতো করে চাটি মেরে বলল, "তুমি খুব পাজি বদমাইশ। আমি সব বুঝেছি।"
গল্পটা এখানেই শেষ। তারপর কেটে গেছে কত বছর!! তসলিমা রুশদি দুজনেই নির্বাসিত পৃথিবীর অন্য প্রান্তে। আজও ভাবলে অবাক লাগে....শুধুমাত্র একটা ছবি তোলা থাকলো পৃথিবীর এমন দুজন লেখক লেখিকার যাদের মাথায় মৃত্যু ফতোয়া....যে ছবি আজ একটা ইতিহাস।
তসলিমা, রুশদির বিরুদ্ধে ফতোয়া জারিকে আমি এখনও ধিক্কার জানাই। এগুলো সুস্থ সমাজের কাজ নয়। আমাদের আসলে এখনও বহু পথ বাকি মনের জানলা খুলতে!!
অশোক মজুমদার।।
১৭.০৭.২০২৬
Ashok Majumder's Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।