অন্য সময় যেমন করেন, তেমনি ঘরভর্তি সংবাদ মাধ্যম প্রধানদের এড়িয়ে গিয়েছিলেন তৌফিক ভাই। পুরোটা সময় আমার মতো ক্ষুদ্রর সাথে তার কথা চলেছিল। অন্যদের এড়িয়ে চলতেই হয়তো তার সেই আপাত আশ্রয়। যমুনা টেলিভিশনের সিইও ফাহিম ভাই আমাদের এমন সময়ের বেশকিছু ছবি তুলেছিলেন, যে কারণে এভাবে বলার সুযোগ হলো।
এটা মেনে নিতেই হবে যে তৌফিক ভাই অনেক অহংকারী ছিলেন। বিবিসির বাংলা বিভাগের প্রধান সাবির মুস্তাফা এই অহংকারের একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিন প্রতিষ্ঠানে একইসঙ্গে কাজ করার কথা তুলে ধরে সাবির মুস্তাফা বলেন, “প্রতিটা ক্ষেত্রে আমি দেখেছি যে তিনি কাজের প্রতিটা ক্ষেত্রে হাই স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করার চেষ্টা করতেন। ভাষার দিক থেকে, নিউজের স্ট্রাকচারের দিক থেকে, ইনফরমেশনের দিক থেকে, ইনফরমেশনের অ্যাকিউরেসির দিক থেকে… সব দিক থেকে খুবই হাই স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করতেন। “ফলে অন্যরা যখন এই স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করে না, তখন তিনি ন্যাচারালি খুশি হতেন না। তিনি সেই স্ট্যান্ডার্ডটা সবার কাছ থেকেই এক্সপেক্ট করতেন। সেজন্যই অনেকে তাকে মিসরিড করত যে তিনি অহংকারী।”
সেই অহংকারী মানুষটা আজ সবাইকে ছেড়ে মাটির নীচে চলে যাবেন। তার এই অহংকারটা যারা পেশাদারিত্বের সাথে নিয়ে নিয়েছেন তারা তার কাছ থেকে আঘাত পেলেও অসাধারণভাবে তাকে নিয়ে লিখেছেন, বিদায় দিয়েছেন। ব্যক্তিগত ক্ষোভ অথবা কিছু না পাবার বেদনা থেকেও কিছু মানুষ সেটি করতে পারেননি।
বিবিসি ও ডেইলি স্টারে তার সাবেক সহকর্মী শাকিল আনোয়ার বলেছেন,“হি ওয়াজ আ ভেরি কম্পিটেন্ট জার্নালিস্ট, অ্যাজ ওয়েল অ্যাজ ভেরি কম্পিটেন্ট। “পথ হাঁটেন সবাই, পথ তৈরি করেন কেউ কেউ। বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় তৌফিক ইমরোজ খালিদী পথিকৃৎ” পাভেল রহমানের এই বক্তব্য তাই যথার্থ।
২০০০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে যোগ দেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। প্রথম আলোতে তখন আমার লিড স্টোরিগুলো আসতে শুরু করেছে। আমার কাছে প্রথম আলো-ই তখন বিবিসি। নিজের দক্ষতায় প্রতিষ্ঠিত সেই জীবন ছেড়ে দেশে আসা তৌফিক ভাই এ জীবনে আমার জন্য কিছু করতে পারেননি। বিডিনিউজে চাকুরি দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম আলো ছেড়ে আমি যাইনি। রুবী গিয়েছিল, কাছ থেকে শিখেছিল অনন্য সম্পাদনার কৌশল। অবশ্য আমি বিচ্ছিন্নভাবে তার কিছুটা সঙ্গ পেয়েছিলাম দীর্ঘ সময় জুড়েই। আর সেই সুযোগে আমি খ্যাতনামা নিউ ইয়র্ক টাইমস, হেরাল্ড ট্রিবিউন, ওয়াশিংটন পোস্ট,দ্য গার্ডিয়ান,দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল,দ্য গার্ডিয়ান,দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকাগুলো হাতে নেড়ে দেখতে পেরেছিলাম। আমার বলতে বাধা নেই-এইসব পত্রিকা আমার দেশের আর কোনো সম্পাদকের টেবিলে আমি দেখিনি।
আমাকে যিনি সরাসরি সাংবাদিকতা শিখিয়েছেন (কতটুকু পেরেছেন সেটা তর্কসাপেক্ষ এবং সেটা নিয়ে তার মনে কোনো কষ্ট আছে কীনা নিশ্চিত নয়!) তিনি প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাকালীন বার্তা সম্পাদক গুরুজন মোজাম্মেল হোসেন। আমি নিজে দেখেছি, মতি ভাই প্রথম আলো’য় যে কলাম লিখতেন, সেটিও তিনি এডিট করতেন। আমার সেই গুরুজনের কথাটা দিয়ে তৌফিক ভাইকে নিয়ে আজকের স্মরণ শেষ করবো।“মানে খবর হবে সত্য, সঠিক, নির্ভেজাল। খবরের তথ্যে কোনো ভেজাল দেওয়া যাবে না। এই যে সাংবাদিকতার মূল নীতি—এর প্রতি একেবারে মেরুদণ্ড সোজা করে সারাজীবন দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
বিদায় সেই তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
Borhanul Haque Shamrat's Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।