তৌফিক নেওয়াজ পেশায় একজন আইনজীবী ছিলেন। শারীরিকভাবে অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও স্ত্রীর পাশে দাঁড়ানোর যে গভীর আকুতি তাঁর ভেতরে ছিল, সেই আকুতিই যেন তাঁকে অসুস্থ শরীর নিয়ে আদালতের বারান্দা পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছিল।
আজ আমি কেন এসব কথা লিখছি- এ নিয়ে হয়তো একেকজন একেক রকম মন্তব্য করবেন। কেউ বলবেন, আমি স্বৈরাচারের দোসর। কেউ হয়তো আমার কথার সঙ্গে সহমত পোষণ করবেন। কিন্তু সত্যি বলতে, আজ এসব রাজনৈতিক পরিচয়, স্বৈরাচার কিংবা স্বৈরাচারের দোসর, কোনোটিই আমার কাছে বড় হয়ে উঠছে না। আজ আমাকে লিখতে বাধ্য করছে আমার মাতৃত্ব, আমার স্ত্রীসত্তা এবং সর্বোপরি আমার মানবিকতা।
দীপু মনির সঙ্গে আমার রাজনৈতিক সম্পর্ক কিংবা ২০০৮ সালে তাঁর সংসদ সদস্য হওয়ার পর থেকে কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিছুই নেই। তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় আরও অনেক আগে। তিনি সম্ভবত তখন চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী, আর আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। একটি টেলিভিশন বিতর্কে আমাদের দেখা হয়েছিল। পরবর্তীতে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল এবং এনডিআই এর কর্মশালায় বিএনপির পক্ষ থেকে আমি গিয়েছিলাম, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দীপু মনি এসেছিলেন। কর্মশালায় খাবারের টেবিলে সবার সঙ্গে সবার যেমন দু-একটি কথা হতো, আমাদেরও হয়েছে।
একবার এক কর্মশালায় চাইনিজ রেস্টুরেন্টে আমি তাঁর ছোট ছোট ছেলে-মেয়েকে দেখেছিলাম। তখন তারা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ত। কর্মশালার ব্যস্ততার মধ্যেও দীপু মনি কিছুটা সময় বের করে সন্তানদের যত্ন নিচ্ছিলেন। নিজের আঁচল দিয়ে তাদের মুখ মুছে দিচ্ছিলেন, আদর করে গালে তুলে খাইয়ে দিচ্ছিলেন। একজন মায়ের সেই মমতার দৃশ্যটি আজও আমার মনে আছে।
সেই ছোট্ট বাচ্চাগুলো আজ অনেক বড় হয়েছে। কিন্তু তারা কোনোদিন হয়তো ভাবেনি- এমন একটি দিন আসবে, যখন তাদের বাবা পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেবেন, অথচ সেই শেষ সময়ে তাদের মা পাশে থাকবেন না। একদিকে ঘরে বাবার নিথর দেহ। অন্যদিকে মাকে কীভাবে বাবার কাছে শেষবারের মতো নিয়ে আসা যায়, সেই আকুতি বুকের মধ্যে ধারণ করে সন্তানদের ছুটতে হচ্ছে মায়ের মুক্তির জন্য। কী নির্মম বাস্তবতা!
যে হাতটি ধরে একজন নারী তাঁর সংসার শুরু করেছিলেন, আজ সেই জীবনসঙ্গী পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। অথচ সেই শেষ বিদায়ের মুহূর্তে স্ত্রী হিসেবে তাঁর পাশে থাকতে পারেন নি। হয়তো মৃত্যুর আগে তাঁর কিছু কথা বলার ছিল। হয়তো শেষবারের মতো স্ত্রীর মুখটা দেখতে চেয়েছিলেন, একবার তাঁর হাতটা ধরে থাকতে চেয়েছিলেন। হয়তো প্রিয় মানুষটির সেই একটুখানি সান্নিধ্যই মৃত্যুর আগে তাঁর বুকের ভেতরের কিছুটা কষ্ট, কিছুটা যন্ত্রণা লাঘব করতে পারত। কিন্তু সেই ভাগ্যটা তা হলো না। এই শোক, এই যন্ত্রণা দিপুমনিকে একা বহন করতে হবে-জেলখানার অন্ধকার একটি কক্ষের ভেতরে।
অসুস্থ স্বামীকে রেখে কারাগারে থাকার কষ্টটা আমি উপলব্ধি করতে পারি। কারণ, স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আমিও যখন কারাগারে ছিলাম, তখন আমার স্বামী অসুস্থ ছিলেন। আমার অনুপস্থিতিতে তাঁর অসুস্থতা আরও বেড়ে গিয়েছিল। সেই সময়ের অসহায়ত্ব আর বুকভরা যন্ত্রণা আজও আমি ভুলতে পারিনি। তাই আজকের এই কষ্টকে শুধু বাইরে থেকে দেখা নয়, নিজের জীবন দিয়ে অনুভব করছি।
একজন বাবা পৃথিবী থেকে চলে গেলে সন্তানদের মায়ের প্রয়োজন আরও বেড়ে যায়। সন্তান যত বড়ই হোক, বাবাকে হারানোর মুহূর্তে মায়ের পাশে থাকা, মায়ের হাত ধরে কাঁদা, মায়ের কাছ থেকে সাহস পাওয়া, এসবের কোনো বিকল্প নেই। আর এই জায়গাটিই আমি আমার নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করছি।
আমি নিজেও যখন জেলখানায় ছিলাম, তখন আমার তিনটি ছোট বাচ্চা রেখে সেই দিনগুলো পার করেছি। সেই কষ্টকর মুহূর্তগুলো আজ আবার আমার মানসপটে ভেসে উঠছে। পৃথিবীর অন্য সব সন্তান মায়ের দোয়া নিয়ে পরীক্ষার হলে যায়। অথচ আমার সন্তানরা মায়ের থেকে দোয়া নেওয়া তো দূরের কথা, সেদিন পরীক্ষার হলে যাওয়ার আগে মায়ের মুখটাও দেখতে পারেনি। দীর্ঘদিন আমি জেলখানায় ছিলাম। আমার মুক্তির জন্য আমার সন্তানরা যে কষ্ট করেছে, তা আমি জানি। তারা সংবাদ সম্মেলন পর্যন্ত করেছে। মাকে কাছে পাওয়ার জন্য, মায়ের মুখ দেখার জন্য তাদের যে আকুতি। সেই স্মৃতিগুলো আজ ভীষণভাবে মনে পড়ছে। তাই মানুষ হিসেবে আজ আমি দীপু মনির জন্য কষ্ট পাচ্ছি। এই কষ্ট শুধু একজন রাজনীতিবিদের জন্য নয়। এটি একজন মায়ের কষ্ট, একজন স্ত্রীর কষ্ট, একজন সন্তানের কষ্ট এবং সর্বোপরি একজন মানুষের কষ্ট।
দীপু মনি আজ মাত্র ১২ ঘণ্টার জন্য মুক্তি পেয়েছেন। অথচ এই ১২ ঘণ্টার মধ্যেই তাঁকে স্বামীর মৃত্যুর পর একজন স্ত্রী হিসেবে যে ধর্মীয় ও পারিবারিক দায়িত্বগুলো পালন করার কথা, সেগুলোও ঠিকভাবে পালন করার সুযোগ নেই। ১২ ঘণ্টা পর তাঁকে আবার জেলখানায় ফিরে যেতে হবে। তাঁর দুটো মেয়ে হয়তো মাকে রেখে আসবে। বাবাকে হারানোর শোকে তারা নিজেরাও ভেঙে পড়েছে। অথচ সেই কঠিন সময়ে মায়ের কাছেও তারা থাকতে পারবে না। একজন মা তাঁর সন্তানদের পাশে থাকতে পারবেন না, সন্তানরা মায়ের পাশে থাকতে পারবে না এই বাস্তবতাটা ভাবতেই বুকটা ভার হয়ে আসে।
আজকের এই অনুভূতি কোনো দলীয় সংকীর্ণতার প্রকাশ নয়। আমার বিবেকের এই তাগিদকে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা কোনো আইন আটকে রাখতে পারেনি।
মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হিসেবে আমাদের অনেক পাল্টাপাল্টি বক্তব্য হয়েছে। সংসদে আমরা একে অপরের কঠোর সমালোচনা করেছি। আপনাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং আমার দলের ওপর হওয়া অসহনীয় অত্যাচারের বিষয় নিয়েও আমি অনেক কথা বলেছি। রাজনৈতিকভাবে আমরা ছিলাম দুই বিপরীত মেরুর মানুষ। কিন্তু রাজনীতির বাইরে আমরা সবাই মানুষ। আর হৃদয়ের মানবিকতার জায়গাটি এখনো নষ্ট হয়ে যায়নি। আজ সেই মানবিকতার জায়গা থেকেই আপনাকে সমবেদনা জানাচ্ছি।
আপনার সেই ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের আমি একসময় রেস্টুরেন্টে দেখেছিলাম। আজ তারা বড় হয়েছে। তারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছে, বাবা হারানোর এই শূন্যতা কতটা গভীর। তাদের জীবনের এই কঠিন সময়ে তারা যেন শক্ত থাকতে পারে এই প্রার্থনা করি।
আমার নিজের সন্তানরাও বাবা-মায়ের রাজনৈতিক জীবনের কারণে অনেক কষ্ট ও বঞ্চনার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে। তাই একজন মা হিসেবে, একজন স্ত্রী হিসেবে, একজন মানুষ হিসেবে আজকের এই শূন্যতা ও কষ্ট আমি হাড়ে হাড়ে অনুভব করতে পারছি।
তৌফিক নেওয়াজের আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। আল্লাহ তাঁকে জান্নাত নসিব করুন। আর দীপু মনি ও তাঁর সন্তানদের এই অসহনীয় শোক ও কঠিন সময় পার করার শক্তি দিন।
সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া
সাবেক সংসদ সদস্য
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।