অনলাইন শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
আইডিএফসি ফার্স্ট ব্যাঙ্কের চণ্ডীগড়ের এক শাখায় হরিয়ানা সরকারের এক দফতরের প্রায় ৫৯০ কোটি টাকা জমা ছিল। চণ্ডীগড় সরকারেরও কয়েক কোটি টাকা জমা ছিল সেখানে। দুই সরকারের মিলিয়ে জমা ছিল ৬৫৭ কোটি টাকা। গত বছরের শেষে ওই টাকার অঙ্কে গরমিল ধরা পড়ে।
আইডিএফসি ফার্স্ট ব্যাঙ্কের চণ্ডীগড়ের এক শাখায় হরিয়ানা সরকারের এক দফতরের প্রায় ৫৯০ কোটি টাকা জমা ছিল। চণ্ডীগড় সরকারেরও কয়েক কোটি টাকা জমা ছিল সেখানে। দুই সরকারের মিলিয়ে জমা ছিল ৬৫৭ কোটি টাকা। গত বছরের শেষে ওই টাকার অঙ্কে গরমিল ধরা পড়ে।
গরমিলের বিষয়টি নজরে আসার পরেই নড়েচড়ে বসে হরিয়ানা সরকার। দু’টি বেসরকারি ব্যাঙ্কে থাকা সমস্ত অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। বিষয়টি পুলিশের পাশাপাশি সেবি-কেও জানান আইডিএফসি ফার্স্ট ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ।
- সিবিআই-এর অভিযোগ, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যাঙ্ক কর্মচারী এবং বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সরকারি তহবিল অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তদন্তকারীদের অভিযোগ, ওই লেনদেনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হয়েছিল।
সিবিআই অভিযোগ করেছে, ঋভব একাধিক সরকারি অ্যাকাউন্ট থেকে ১৮৭.৩৫ কোটি টাকা মূল্যের অন্তত ২৫টি লেনদেনের অনুমোদন দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৫.৪০ কোটি টাকা এবং ১.৫০ কোটি টাকা তাঁর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে গ্রহণ করেছিলেন ঋভব। তাঁর স্ত্রী দিব্যা অরোরা ১৮.৩২ কোটি টাকা পেয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সেই ঘটনার তদন্তে নেমে ওই ব্যাঙ্কের প্রাক্তন ম্যানেজার ঋভবের গতিবিধি নিয়ে সন্দেহপ্রকাশ করেন তদন্তকারীরা। তাঁর বিরুদ্ধে আগেই শহর ছেড়ে না যাওয়ার জন্য লুকআউট নোটিস জারি করা হয়। পরে গ্রেফতারও করা হয় তাঁকে।
এর মধ্যেই ওই মামলায় নাম জড়িয়েছে এক মহিলা নৃত্যশিল্পীর। সিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, চণ্ডীগড়ে একটি অনুষ্ঠানে ওই মহিলা নৃত্যশিল্পীর সঙ্গে প্রথম দেখা হয় ঋভবের। এর পর ২০২৫ সালের ৮ মে জয়পুরের একটি ফার্মহাউস পার্টিতে তাঁদের আবারও সাক্ষাৎ হয়।
- ওই মহিলা নৃত্যশিল্পী তদন্তকারীদের জানান যে, ২০২৫ সালের ৫ জুলাই মুম্বইয়ের সেন্ট রেজিস হোটেলে ঋভবের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল। সেখানে ঋভব তাঁকে প্রেম নিবেদন করেন। যদিও আগে থেকেই বিবাহিত ছিলেন অভিযুক্ত ব্যাঙ্ক ম্যানেজার।
নৃত্যশিল্পী সিবিআইকে জানিয়েছে, ঋভব নিজেকে ‘এসআরআর প্ল্যানিং গুরুস’ নামে সংস্থার এক ‘ইভেন্ট প্ল্যানার’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। পাশাপাশি দাবি করেছিলেন যে তিনি চাল আমদানি-রফতানির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং আইডিএফসি ফার্স্ট ব্যাঙ্কের ম্যানেজার পদেও রয়েছেন। সিবিআইয়ের অভিযোগ, সরকারি অর্থ তছরুপের ঘটনায় যে সব প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হয়েছিল, তার মধ্যে ‘এসআরআর প্ল্যানিং গুরুস’ অন্যতম।
সিবিআইয়ের কাছে দেওয়া বয়ান অনুযায়ী, ঋভব নাকি নৃত্যশিল্পী প্রেমিকাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি তাঁর স্ত্রী দিব্যা অরোরার সঙ্গে আইনি বিচ্ছেদ করে তাঁকে বিয়ে করবেন। বিহারের সিওয়ানের বাসিন্দা ওই তরুণী জানান, ঋভব তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে সব রকম সহায়তা করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন।
তিনি তদন্তকারীদের জানান, ২০২৫ সালের ১৮ জুলাই দিল্লির দ্বারকায় একটি বাড়ির জন্য ‘টোকেন মানি’ বা অগ্রিম হিসেবে ১ লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেন, ওই সম্পত্তির জন্য মোট ৩.১০ কোটি টাকা নগদে পরিশোধ করার কথা ছিল এবং ঋভবই এর সিংহভাগ অর্থ দিয়েছিলেন। তিনি জানান, তিনি নিজে ৪৯ লাখ টাকা দিয়েছিলেন এবং সম্পত্তিটির জন্য আরও ৯০ লাখ টাকা পরিশোধ করার কথা ছিল।
তরুণীর বয়ান অনুযায়ী, চলতি বছরের ২ জানুয়ারি থেকে ওই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন তিনি। নৃত্যশিল্পী সিবিআইকে আরও জানান, ঋভব তাঁকে ২০২৫ সালের অগস্ট থেকে ২০২৬-এর জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতি মাসে কমবেশি ১০ লাখ টাকা করে মোট ৫৬ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। তিনি জানান, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে নাচ বন্ধ করার সিদ্ধান্তের কারণেই তাঁকে ওই অর্থ ঋভব দিয়েছিলেন।
সিবিআইয়ের তদন্তে জানা গিয়েছে, এই সময় ঋভব এবং ওই তরুণী নৃত্যশিল্পী— দু’জনেই বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল হোটেলে সময় কাটিয়েছিলেন। এর মধ্যে চণ্ডীগড় এবং দিল্লির অনেক বিলাসবহুল হোটেলও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ছাড়া তাঁরা নাকি গোয়ার একটি বড় হোটেলেও একসঙ্গে ছিলেন।
তদন্তে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালের অগস্টে তরুণীকে নিয়ে ম্যাকাও এবং তাইল্যান্ড সফরেও গিয়েছিলেন ঋভব। ২০২৫ সালের নভেম্বরে তাঁরা দুবাইয়ের বুর্জ আল আরবেও অবস্থান করেছিলেন। সেখানে ঋভব একটি নতুন ভিলাও দেখিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে, ৫-১০ বছর পর তাঁরা দু’জনে সেখানেই পাকাপাকি ভাবে বসবাস করবেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁরা আবারও দুবাই যান।
তরুণী তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, ঋভবের আয়োজিত মাত্র দু’-তিনটি পার্টিতে তিনি নেচেছিলেন। তবে তিনি এ-ও জানান, চণ্ডীগড়ের জিরকপুরে আয়োজিত আরও বেশ কয়েক বার তাঁর অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন ঋভব। যদিও সে সব অনুষ্ঠানে তাঁর নাচের কোনও প্রয়োজন ছিল না বলে দাবি তরুণীর।
তরুণীর বয়ান অনুযায়ী, এ ধরনের প্রতিটি অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতির জন্য আয়োজকদের ২ লাখ টাকা দিতেন ঋভব। সেই অর্থের অর্ধেক তাঁকে দেওয়া হত। কিন্তু কী হত সেই পার্টিগুলিতে? ওই তরুণী সিবিআইকে জানিয়েছেন, জয়পুর, দিল্লি ও মুম্বইয়ের বিভিন্ন স্থানে পার্টিগুলির আয়োজন করা হত। চণ্ডীগড়ের জিরকপুরের বিলাসবহুল হোটেলেও অনুষ্ঠিত হত সেগুলি। হরিয়ানা সরকারের কয়েক জন কর্তা এবং জালিয়াতি মামলার অন্যান্য অভিযুক্ত ব্যক্তিও এ রকম কয়েকটি পার্টিতে উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করেছেন তরুণী।
তরুণীর বয়ান অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির বাসিন্দা নিতিন আনন্দ নামের এক আয়োজক কিছু অনুষ্ঠানের জন্য পাঁচ-ছ’জন নৃত্যশিল্পীর ব্যবস্থা করতেন। প্রতিটি পার্টির জন্য খরচ করা হত প্রায় ১৫-২০ লাখ টাকা। অনুষ্ঠানের সময় কিছু সরকারি কর্মকর্তা নৃত্যশিল্পীদের উপর নগদ টাকা ছুড়ে দিতেন বলেও দাবি করেছেন তরুণী। জানিয়েছেন, সেই অর্থ নাকি তাঁদের এবং আয়োজকের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হত।
সিবিআই এখন ওই পার্টিগুলিতে উপস্থিত ব্যক্তিদের বিষয়ে এবং সেখানে কী ধরনের কার্যকলাপ চলত, সে সম্পর্কে তরুণী নৃত্যশিল্পীর দেওয়া বয়ান নথিভুক্ত করেছে। তদন্তের অংশ হিসেবে তরুণীর স্মার্টফোনটি বাজেয়াপ্ত করেছেন তদন্তকারীরা। এই মামলায় সরকারি কর্তা এবং ব্যাঙ্ক কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। সরকারি অর্থ কী ভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং কারা এর মাধ্যমে লাভবান হয়েছিলেন, তা নিশ্চিত করতে তদন্তকারীরা আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগ এবং অন্যান্য প্রমাণাদি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।