দক্ষিণ কোরিয়া-র এই জাঁকজমকপূর্ণ ‘কে-পপ’, ‘কে-ড্রামা’, আর পৃথিবীর ঘরে ঘরে স্যামসাং-এলজি পে পৌঁছে দেওয়া টেক জায়ান্ট-এর পেছনের মূল আর্কিটেক্ট নাম পার্ক চুং-হি। পার্ক চুং-হি ছিলেন একদম অন্য লেভেলের এক স্বৈরশাসক। এই জঘন্য রকম কড়া শাসক কীভাবে পুরো একটা দেউলিয়া দেশকে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তিতে রূপান্তর করলেন?
পার্ক চুং-হি-র দেশ চালানোর কায়দা ছিলো জাস্ট কাজ করো! ১৯৬১ সালে যখন তিনি ক্ষমতা নেন, তখন কোরিয়ার অবস্থা আফগানিস্তানের চেয়েও খারাপ। মাথাপিছু আয় মাত্র ৮২ ডলার! তিনি এসেই বুঝেছিলেন, সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না। তাই পুরো দেশকে উনি সেনা ছাউনির মতো নিয়ম-শৃঙ্খলায় বেঁধে ফেললেন। মজার ব্যাপার হলো,ক্ষমতায় এসেই তিনি দেশের শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত ধনকূপী ও ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো সরকারি খাতের টাকা আত্মসাৎ ও ঘুষ দেওয়ার।
তবে তিনি তাদের জেলে পুরে নষ্ট না করে একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন,
"তোমাদের শাস্তি মাফ করা হবে এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে না, তবে একটি শর্তে, তোমাদের সরকারের নির্দেশিত শিল্পখাতে ইস্পাত, জাহাজ নির্মাণ, ইলেকট্রনিক্সে নিজেদের মূলধন বিনিয়োগ করতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিশ্বমানের পণ্য তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করতে হবে।
সোজা কথা, হয় দেশি টেকনোলজি বানাও, না হয় জেলে পচো....!"
ব্যবসায়ীরা ভয়ে কাজ শুরু করেছিলো এবং এই নীতির ফলেই জন্ম নেয় আজকের বিশ্বখ্যাত কোরিয়ান জায়ান্ট কোম্পানি,স্যামসং, হুন্দাই , এবং এলজি I
হুন্দাই-এর প্রতিষ্ঠাতা চুং জু-ইয়ুং যখন প্রথমবার জাহাজ তৈরির প্ল্যান নিয়ে পার্কের কাছে যান, তখন কোরিয়ায় কোনো আধুনিক জাহাজ তৈরির ড্রাই ডক-ই ছিলো না! কিন্তু পার্কের সোজা কথা, বানাইতে হবে মানে বানাতেই হবে। অজুহাত শুনতে চাই না। ফলাফল, হুন্দাই আজ পৃথিবীর অন্যতম বড় জাহাজ নির্মাতা!
পোস্কো স্টিল মিল তৈরির ঘটনাটা শুনলে আরো অবাক হবেন। কোরিয়ার মতো দরিদ্র দেশের জন্য তখন স্টিল মিল বানানো ছিলো একটা বিশাল ব্যাপার। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক তো হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলো, বলেছিলো, তোমাদের দিয়ে এসব হবে না। পার্ক দমে যাননি। দ্বিতীয় বিশ্বযু"দ্ধের সময় জাপানের কাছ থেকে পাওয়া ক্ষতিপূরণের টাকা তিনি বিলাসিতায় এক আনাও খরচ না করে সোজা স্টিল মিলে ঢাললেন। আর পোস্কোর প্রধান পার্ক তাই-জুনকে স্পষ্ট ভাষায় বলে দিলেন, “এই টাকাটা দেশের মানুষের রক্তের টাকা। এই প্রজেক্ট যদি ফেইল করে, তবে আমাদের ডানদিকে ঘুরে সোজা জাপান সাগরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহ*** করা ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না! কতটা পাগলাটে লেভেলের দেশপ্রেম আর জেদ থাকলে একজন প্রেসিডেন্ট তাঁর অফিসারদের এই বার্তা দিতে পারেন!
অর্থনীতি তো সামলালেন, কিন্তু পার্কের কড়াকড়ি থেকে সাধারণ মানুষের ডেইলি লাইফও বাদ যায়নি!
১৯৭০-এর দিকে তিনি পুরো দেশে এক আজব নিয়ম চালু করলেন...
ছেলেরা বড় চুল রাখতে পারবে না। পুলিশ রাস্তায় কাঁচি নিয়ে ঘুরে বেড়াতো! কাউকে লম্বা চুলে পেলেই মাঝরাস্তায় দাঁড় করিয়ে ধরে চুল কেটে দেওয়া হতো। মেয়েদের স্কার্ট হাঁটুর ৩ ইঞ্চির বেশি ওপরে উঠলেই পুলিশ স্কেল দিয়ে মেপে ফাইন ঠুকে দিতো! তাঁর লজিক ছিলো, উচ্ছৃঙ্খলতা আর অলসতা দিয়ে দেশ বদলায় না। আগে ডিসিপ্লিন শেখো!
আজকে দক্ষিণ কোরিয়ার যে চকচকে এক্সপ্রেসওয়ে বা হাইওয়েগুলো দেখা যায়, সেগুলোর শুরুটাও পার্কের হাত ধরে। যখন তিনি সিউল থেকে বুসান পর্যন্ত হাইওয়ে বানানোর সিদ্ধান্ত নেন, দেশের সব বুদ্ধিজীবী আর বিরোধী দল রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছিল, টাকা নেই, খাবার নেই, এত বড় রাস্তা দিয়ে কী হবে? পার্ক কারও কথা শোনেননি। নিজে সাইটে গিয়ে ধুলোবালি মেখে দাঁড়িয়ে থাকতেন। রাতদিন কাজ করিয়ে রেকর্ড টাইমে হাইওয়ে বানিয়ে ছেড়েছিলেন। আর আজ ওই হাইওয়েই কোরিয়ান অর্থনীতির মূল ব্যাকবোন বা মেরুদণ্ড!
যে লোকটা একটা পুরো জাতির ভাগ্য বদলে দিলেন, তাঁর শেষটা হয়েছিল অত্যন্ত ট্র্যাজিকভাবে।
পার্কের স্বৈরাচারী শাসন, বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া এবং দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ১৯৭৯ সালের দিকে কোরিয়াজুড়ে গণ-আন্দোলন শুরু হয়। পরিস্থিতি সামলাতে পার্ক আরও কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ২৬ অক্টোবর রাতে এক ডিনারে বসে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে পার্কের নিজেরই বিশ্বস্ত গোয়েন্দা প্রধান কিম জায়ে-গিউ তাঁকে পয়েন্ট ব্লাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যা করেন!
যে লোকটা একটা দেশকে টেনে তুলে খাদের কিনারা থেকে স্বর্গে পৌঁছে দিয়েছিলেন, রক্তক্ষয়ী এক চক্রান্তেই শেষ হয় তাঁর অধ্যায়। পার্ক চুং-হি কি একজন মহান শাসক ছিলেন, নাকি একজন নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক? এই বিতর্কের শেষ নেই। মানবাধিকার আর স্বাধীনতার দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে তিনি ছিলেন ভয়ংকর এক ডিক্টেটর। কিন্তু আজকের আধুনিক, ধনী আর শক্তিশালী দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে তাকালে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই পার্কের সেই একরোখা আর কঠোর সিদ্ধান্তগুলো না থাকলে 'দ্য মিরাকল অন দ্য হান রিভার' হয়তো শুধুই একটা রূপকথা হয়ে থাকতো !
লেখা~ Diary of She
Shahidul Islam-Rubel's Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।