প্রিন্ট এর তারিখঃ অগাস্ট ২৫, ২০২৬, ১১:০৫ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুলাই ২৫, ২০২৬, ৩:০৮ পি.এম
প্রায় দুই দশক পর লেখিকা তসলিমা নাসরিনের কলকাতায়
Sufal Sarkar II's Post
অনলাইন
প্রায় দুই দশক পর লেখিকা তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় ফেরাকে ঘিরে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আগামী ১ আগস্ট একটি মৌলবাদবিরোধী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর এই সফরকে অনেকেই ঐতিহাসিক বলে মনে করছেন। এই প্রেক্ষাপটে বিশিষ্ট কবি জয় গোস্বামী এক সাক্ষাৎকারে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, তিনি শুধু অপরাধবোধে ভুগছেন না, বরং নিজেকেই “অপরাধী” বলে মনে করেন। তাঁর এই মন্তব্য ইতিমধ্যেই সাহিত্য মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জয় গোস্বামীর বক্তব্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল তসলিমা নাসরিনের দীর্ঘ নির্বাসন এবং সেই সময় সাহিত্য সমাজের নীরবতা। তিনি বলেন, তসলিমাকে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পর এত বছর ধরে তাঁকে ফিরিয়ে আনার দাবিতে তিনি নিজেও কখনও প্রকাশ্যে কিছু লেখেননি বা উদ্যোগ নেননি। সেই নীরবতার দায় তিনি নিজের কাঁধেই নিতে চান। তাঁর কথায়, “অপরাধবোধ নয়, আমি নিজেই অপরাধী।” এই আত্মসমালোচনার মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে একজন লেখক হিসেবে তাঁর আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া উচিত ছিল।
২০০৭ সালে তসলিমা নাসরিনকে কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল বিতর্ক ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে। সেই সময়ের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে জয় গোস্বামী বলেন, যে শহরকে ভালোবেসে তসলিমা বসবাস করছিলেন এবং স্বাধীনভাবে সাহিত্যচর্চা করছিলেন, সেই শহর থেকেই তাঁকে হঠাৎ বিদায় নিতে হয়েছিল। এমনকি নিজের প্রিয় পোষ্যকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেননি। জয় গোস্বামীর মতে, এই ঘটনা শুধু একজন লেখকের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং বাংলা সাহিত্য ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্যও একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়।
তিনি আরও দাবি করেন, তৎকালীন সময়ে যাঁরা এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই বর্তমানে তসলিমার প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানাচ্ছেন। তবে তাঁর প্রশ্ন, গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে কেন তাঁকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তেমন কোনও উদ্যোগ বা প্রকাশ্য আলোচনা হয়নি? জয় গোস্বামী মনে করেন, যারা আজ তসলিমাকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন, তাঁদের সম্মান জানানো উচিত।
তসলিমা নাসরিনের সাহিত্য ও ব্যক্তিজীবনের মধ্যে গভীর সামঞ্জস্য রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন জয় গোস্বামী। তাঁর মতে, তসলিমা যা লেখেন, তাই নিজের জীবনে ধারণ করেন। তিনি উদাহরণ হিসেবে তসলিমার তরুণ বয়সের কবিতার উল্লেখ করে বলেন, তাঁর লেখায় যে প্রতিবাদ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক রীতিনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান দেখা যায়, বাস্তব জীবনেও তিনি সেই আদর্শেই অবিচল থেকেছেন। জয় গোস্বামীর মতে, এমন সামঞ্জস্য খুব কম লেখকের মধ্যেই দেখা যায়।
এই প্রসঙ্গে তিনি মহাশ্বেতা দেবী, শঙ্খ ঘোষ ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখ করে বলেন, তাঁদের মতোই তসলিমা নাসরিনও নিজের সাহিত্য ও জীবনকে আলাদা করেননি। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন লেখকের সবচেয়ে বড় শক্তি তখনই প্রকাশ পায়, যখন তাঁর লেখনী ও ব্যক্তিজীবন একই আদর্শে পরিচালিত হয়।
তসলিমা নাসরিনের কলকাতা প্রত্যাবর্তন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাহিত্যিক দায়বদ্ধতা এবং সমাজের আত্মসমালোচনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে উঠেছে। জয় গোস্বামীর আত্মসমালোচনামূলক বক্তব্য সেই আলোচনাকে আরও গভীর করেছে। তাঁর এই মন্তব্য স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সমাজের বিশিষ্ট মানুষদের নীরবতাও কখনও কখনও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে তসলিমা নাসরিনের প্রত্যাবর্তন নতুন করে সাহিত্য, গণতন্ত্র এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
Sufal Sarkar II's Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।
সম্পাদক ও প্রকাশক : এম জি কিবরিয়া চৌধুরী
দৈনিক বাংলাদেশ অর্থনীতি ৮৫, নয়াপল্টন (৪র্থ তলা) ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ। মোবাইল: ০১৭১২-৭১৪৪৯৩, ০১৫৩৪-৬৪৬১৪১