বঙ্গবন্ধুর অফিসকক্ষে ছবি তুলতে গিয়ে এমন একটি ছবির ফ্রেম হবে—তা আগ মুহূর্তেও ভাবিনি। যে ছবিটি তুলতে এসেছিলাম, সেটি না তুলে শেষ পর্যন্ত তুলে ফেললাম অন্য এক ছবি।
রাত তখন প্রায় নয়টা। ১৭ মার্চ ১৯৭৫। বঙ্গবন্ধুর শেষ জন্মদিনে শেষ সময়ে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছেন সেনাপ্রধান এবং ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফ। আমরা এসেছিলাম অনেকটা আকস্মিকভাবেই। আবাহনী সভাপতি কামাল ভাই বললেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে আজ আমাদের খুশির খবরটা জানানো উচিত।’
আবাহনী ক্রীড়া চক্র এ বছর ফুটবল, ক্রিকেট ও হকিতে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে ‘ট্রিপল ক্রাউন ট্রফি’ জিতেছে। ট্রফিটা নিয়ে ক্লাব সেক্রেটারি হারুন ভাই, বাদল ভাই, বরকত ভাই আর আমি এসেছি গণভবন। বঙ্গবন্ধু ট্রফিটা হাতে নিয়ে দেখছেন—এমন একটি ছবি ক্যামেরায় তোলাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
সেদিন সন্ধ্যার আগেই বঙ্গবন্ধুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিলাম আমরা—আবাহনীর খেলোয়াড় ও কর্মকর্তারা। ক্লাব সভাপতি শেখ কামাল ভাইয়ের নেতৃত্বে গণভবনে আসা সবাইকে বঙ্গবন্ধু, সবুজ উন্মুক্ত লনে বেশ কিছু সময় দিয়েছিলেন। ক্লাবের সবার সঙ্গে নানা বিষয়েও কথা বলেছিলেন তিনি।
এখন রাত। আমরা আবার গণভবনে এসে দেখি, বঙ্গবন্ধুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে আরও অনেকে এসেছেন। এডিসি লেফটেন্যান্ট রব্বানি জানালেন, বঙ্গবন্ধুর অফিসকক্ষে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে. এম. শফিউল্লাহ এবং ডিপুটি চীফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রয়েছেন।
এডিসি রব্বানি প্রেসিডেন্ট মহাদয়কে আমাদের আসার কথা জানিয়েছেন। অল্প পরেই মিলিটারি সেক্রেটারি কর্নেল জামিল এসে বললেন,
—‘মহামান্য প্রেসিডেন্ট আপনাদের ভেতরে আসতে বলেছেন।’
চায়ের কাপ রেখে আমরা দ্রুত এগিয়ে গেলাম বঙ্গবন্ধুর অফিস কক্ষের দিকে।
বঙ্গবন্ধুর অফিস টেবিলের উল্টো দিকে একটি সাদা সিঙ্গেল সোফায় বসেছিলেন তিনি—সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা। অন্য বড় সোফাটিতে তাঁর উল্টো দিকে বসেছিলেন সেনাপ্রধান জেনারেল কে. এম. শফিউল্লাহ। আর পাশে হাফহাতা শার্ট পরা আরেকজন।
বঙ্গবন্ধুর ডান পাশের লোকটিকে আমি চিনলাম না।
ঘরে ঢুকেই হারুন ভাই, বাদল ভাই আর বরকত ভাই মুহূর্তের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর সামনে গিয়ে ক্রেস্টটি তাঁর হাতে তুলে দিলেন। আমি একটু পিছনে পড়ে গেলাম।
আমি ক্যামেরা নিয়ে পজিশন নেওয়ার আগেই ঘটনাটা ঘটে গেল।
তখনও ভিভিআইপি কাভার করার খুব বেশি অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। তবে এটুকু জানতাম—এ ধরনের মুহূর্ত সাধারণত ধীরস্থিরভাবেই আসে। প্রটোকল অনুযায়ী পরিস্থিতি ও পরিবেশ বুঝে ছবি তুলতে হয়।
পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমিও অন্য ছবি তুলতে শুরু করলাম। বঙ্গবন্ধু আবাহনীর ‘ট্রিপল ক্রাউন’ হাতে নিয়ে দেখছেন।
কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একই ফ্রেমে থাকা অচেনা মানুষটিকে আমি বাদ দিতে পারছিলাম না। তাঁকে ফ্রেমে রাখতেই হলো। তাঁকে ফ্রেমের বাইরে রাখতে ছবি তুলতে হলে আমাকে বঙ্গবন্ধুর উল্টো দিকের পজিশনে যেতে হতো—যেখানে তখন আবাহনীর কর্মকর্তারা দাঁড়িয়ে ছিলেন।
ছবি তোলার পর সেই অচেনা মানুষটির পরিচয় জানতে চাইলাম। লেফটেন্যান্ট রব্বানি জানালেন—বঙ্গবন্ধুর পাশের সোফায় যাঁকে দেখা যাচ্ছে, তিনি জেনারেল জিয়াউর রহমান।
জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তখন আমি চিনতাম না।
বঙ্গবন্ধুর সোফার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন এডিসি লেফটেন্যান্ট রব্বানি এবং কর্নেল জামিল। পরবর্তীতে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর ফোন পেয়ে সাদা পোশাকে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে ছুটে আসার পথে সোবহানবাগ মসজিদের সামনে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত গাড়িচালকসহ নিহত হন।
আমার তোলা এই ফ্রেমটি ছিল একমাত্র ছবি—যেখানে বঙ্গবন্ধুর হাতে আবাহনীর ট্রফি, আর তাঁর ঠিক পাশের সোফা থেকে জেনারেল জিয়াউর রহমান তাকিয়ে আছেন বঙ্গবন্ধুর হাতে থাকা ট্রফিটির দিকে।
আর একটি বিষয় আজও আমার চোখে পড়ে—জেনারেল জিয়াউর রহমানের চোখে সেদিন কোনো চশমা ছিল না।