সিনেমা বানাতে টাকা লাগে। এই কথাটা সবাই জানেন। কিন্তু সেই টাকা যদি দেশের জনগণের পকেট মেরে আনা হয়? ব্যাংক লুট করে আনা হয়? সেই টাকায় যদি অস্কারের লাল গালিচা লাল করা হয়। সেটা কি খুব গৌরবের ?
শুনতে সিনেমার স্ক্রিপ্ট মনে হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ইতিহাসে এটি ঘটেছিল মালয়েশিয়ার 1MDB 1Malaysia Development Berhad কেলেঙ্কারিতে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো কি জানেন? হলিউডের সেই কুখ্যাত ঘটনার ঠিক এক নিখুঁত দেশীয় সংস্করণ আমরা দেখেছি জনতা ব্যাংক ও জাজ মাল্টিমিডিয়ার কেসে!
আসুন আজ জেনে নিই প্রক্সি ফিন্যান্সিং ও মানিলন্ডারিংয়ের বিশ্ববিখ্যাত ১এমডিবি মডেল কীভাবে কাজ করেছিল। কীভাবে শেষ পর্যন্ত সব মুখোশ খুলে গিয়েছিল।
কে এই জো লো Jho Low? কীভাবে ইনভেস্ট করেছিলেন?
জো লো নামের এক মালয়েশিয়ান তরুণ ছিলেন তৎকালীন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নজিব রাজাকের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন গোপন প্রক্সি অপারেটর। ২০০৯ সালে মালয়েশিয়ার সাধারণ মানুষের উন্নয়নের জন্য ১এমডিবি নামের একটি সরকারি তহবিল তৈরি করা হয়। কিন্তু জো লো ও তার চক্র সেখান থেকে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বা ৪৫০ কোটি ডলার বিভিন্ন ভুয়া অফশোর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরিয়ে ফেলে।
এই বিপুল পরিমাণ নগদ অবৈধ ক্যাশ টাকাকে বৈধ করার জন্য জো লো বেছে নেন হলিউডের গ্ল্যামার জগতকে। কারণ সিনেমা শিল্পে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা বিনিয়োগ করা যায়। খরচের নানা জটিল হিসাব দেখিয়ে টাকা সাদা করা সহজ হয়।
জো লো মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সৎছেলে রিজা আজিজকে সামনে রেখে গড়ে তোলেন Red Granite Pictures নামে একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। এই প্রক্সি কোম্পানির মাধ্যমেই লুণ্ঠিত অর্থ ঢালা শুরু হয় হলিউডে।
রেড গ্রানাইট পিকচার্স তিনটি প্রধান বড় বাজেটের সিনেমা প্রযোজনা করেছিল।
The Wolf of Wall Street (2013) ছিল লুণ্ঠিত টাকায় তৈরি সবচেয়ে বড় হিট ছবি! এছাড়াও
Dumb and Dumber To (2014)
Daddy's Home (2015) সিনেমাগুলি তৈরি হয়।
সবচেয়ে কাকতালীয় কি জানেন? নাকি এটাকে চরম ব্যঙ্গ বলব? জো লো যে টাকা দিয়ে The Wolf of Wall Street বানিয়েছিলেন সেই সিনেমাটির গল্প কী ছিল জানেন? স্টক মার্কেটের বিনিয়োগকারীদের সাথে প্রতারণা করে কীভাবে কোটি কোটি ডলার লুট করে বিলাসবহুল জীবন কাটানো যায়! সেই সত্য ঘটনাভিত্তিক গল্প! অর্থাৎ, জালিয়াতির টাকায় তৈরি হয়েছিল জালিয়াতির ওপর বানানো সিনেমা!
লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও ও অন্য তারকাদের সম্পর্ক ছিলো এখানেও।
জো লো নিজেকে হলিউডে রাতারাতি ট্রিলিয়নিয়ার হিসেবে জাহির করেন। তারকাদের নিজের প্রক্সি জালে জড়াতে ও প্রভাব বিস্তার করতে তিনি পানির মতো টাকা খরচ করেন।
লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওকে জো লো অস্কারজয়ী বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসোর তোলা ৩.২ মিলিয়ন ডলারের একটি চিত্রকর্ম এবং মার্লন ব্র্যান্ডোর জেতা একটি অস্কার ট্রফি উপহার দেন। শুধু তাই না ডিক্যাপ্রিওকে লাস ভেগাসের ক্যাসিনোয় নামিদামি জুয়ায় সাথে রাখা হতো।
মিরান্ডা কেরও ছিলেন। ভিক্টোরিয়া সিক্রেটের বিখ্যাত সুপারমডেল মিরান্ডা কেরকে প্রেমিকা বানানোর চেষ্টায় জো লো তাকে ৮.১ মিলিয়ন বা ৮১ লাখ।ডলারের অমূল্য হীরা ও জুয়েলারি উপহার দেন।
এরা ছাড়াও পপ স্টার রিয়ানা, প্যারিস হিলটন ও জেমি ফক্সের মতো তারকাদের নিজের বিশাল ইয়ট বা নাইটক্লাব পার্টিতে কোটি কোটি টাকার মদ ও উপহার দিয়ে সাথে রাখতেন।
কীভাবে তদন্ত শুরু হলো এবং মার্কিন DOJ এর অ্যাকশন এবার তা জানা যাক।
প্রক্সিরা যত ধূর্তই হোক ডিজিটাল ও ব্যাংকিং ফুটপ্রিন্ট কখনো মোছা যায় না।
২০১৫ সালে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও দ্য সারওয়াক রিপোর্ট প্রথম এই বিশাল চুরির তথ্য ফাঁস করে। এর পর যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস DOJ ইতিহাসে তাদের সবচেয়ে বড় মানিলন্ডারিং তদন্ত শুরু করে।
শুরু হয় বাজেয়াপ্তকরণ। DOJ রেড গ্রানাইট পিকচার্সের সব সিনেমা থেকে আসা শত কোটি টাকার লভ্যাংশ বাজেয়াপ্ত করে।
তারকাদের উপহার ফেরত নেয়া হয়। মার্কিন সরকার ডিক্যাপ্রিও ও মিরান্ডা কেরকে তলব করে। ডিক্যাপ্রিও পিকাসোর পেইন্টিং ও ট্রফি ফেরত দেন। আর মিরান্ডা কের তার সব হীরার গহনা মার্কিন ফোরেন্সিক দলের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন।
রেড গ্রানাইটের জরিমানা হয়।জো লোর প্রক্সি কোম্পানি রেড গ্রানাইট ৬০ মিলিয়ন ডলার জরিমানা দিয়ে আমেরিকার আদালতে কেস সেটেল করতে বাধ্য হয়।
এখন কী অবস্থা এই কেসের তা নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে।
মালয়েশিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নজিব রাজাক ক্ষমতা হারিয়েছেন এটা তো জানেন। ১২ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে জেলে আছেন।
মূল মাস্টারমাইন্ড জো লো আন্তর্জাতিক ফেরারি আসামি। ইন্টারপোল তার পেছনে রেড নোটিশ জারি করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার শত শত কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।
ধারণা করা হয় তিনি বর্তমানে চীনে আত্মগোপন করে আছেন। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার নামে থাকা ফৌজদারি মামলা থেকে ক্ষমা পাওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। যা মালয়েশিয়া সরকার কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
এবার আসি ১এমডিবি বনাম আমাদের জনতা ব্যাংক ও জাজ মাল্টিমিডিয়া তুলনায়।
এখন যদি মালয়েশিয়ার এই ১এমডিবি কেসের সাথে আমাদের দেশের জনতা ব্যাংক ও জাজ মাল্টিমিডিয়ার কেসটি মেলান তাহলে
জো লোর জায়গায় আমাদের দেশে ছিলেন প্রক্সি আজিজ এবং অবশ্যই তার পেছনের গডফাদাররা।
১এমডিবি তহবিলের জায়গায় আমাদের দেশে ব্যবহৃত হয়েছে জনতা ব্যাংকের প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার গচ্ছিত আমানত।
রেড গ্রানাইট পিকচার্স।এর জায়গায় আমাদের দেশে এসেছে জাজ মাল্টিমিডিয়া।
আর হলিউড তারকাদের বিলাসবহুল উপহার দেওয়ার জায়গায় আমাদের দেশে মিডিয়ার প্রক্সিদের দেওয়া হয়েছে ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি বিদেশ ভ্রমণ আর রূপালী জগতের লাইমলাইট।
এখান শিক্ষাটা আমরা কোথায় পাচ্ছি? জো লো ভেবেছিলেন মার্কিন ডলার, হলিউডের গ্ল্যামার আর প্রক্সি কোম্পানির আড়ালে আসল সত্য লুকিয়ে ফেলা যাবে। কিন্তু বিচার ও ফোরেন্সিক অডিট ঠিকই পুরো সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
আমাদের দেশে গুম খু/ন গণ হ/ ত্যা না শুধু মাত্র যদি দূর্নীতি আর মানি লন্ডারিংয়ের সঠিক তদন্ত হয় তাহলেই অনেক রাঘববোয়াল বাকী জীবন জেলে কাটাবেন।
কিন্তু তারা তো মনে করছেন জনতার টাকা মেরে সিনেমা বানিয়ে প্রক্সি কোম্পানিতে উপহার ঢেলে নায়িকাদের দামী দামী গিফট দিয়ে বিদেশে বিলাসবহুল জীবন কাটাবেন।আর রিটায়ার্ড লাইফে চলে গিয়ে আইনি দায় থেকে পার পেয়ে যাবেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধের ইতিহাস বলছে সঠিক নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার হলে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে ঠিক একই পতন ও বাজেয়াপ্তের ভবিষ্যৎ!
Bipasha Chakraborty's Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।