প্রিন্ট এর তারিখঃ অগাস্ট ২৫, ২০২৬, ১০:৫৯ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুলাই ১৭, ২০২৬, ৯:৪৫ পি.এম
ভারতের ইতিহাসের বৃহত্তম গুপ্তচর চক্র : অত্যন্ত বিশ্বস্ত সরকারি কর্মচারী
১৯৮৫ সালের সেই কনকনে শীতের রাতে দিল্লির রাইসিনা হিলস যেন এক অদ্ভুত থমথমে নিস্তব্ধতায় ডুবে গিয়েছিল। নর্থ ব্লকের পুরোনো ফাইলগুলোর গন্ধ আর বারুদের ধোঁয়ার মতো এক কুয়াশা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিল প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়কে। দীর্ঘ দিন ধরে ভারতের অন্দরমহলে এক অদৃশ্য উইপোকা কুরে কুরে খাচ্ছিল দেশের সবচেয়ে সুরক্ষিত গোপন তথ্যগুলোকে, যা সাধারণ মানুষের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য। প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী যখন নিজের চেম্বারে বসে গোয়েন্দা রিপোর্টগুলো পড়ছিলেন, তখন তাঁর কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর হচ্ছিল। ভারতের প্রতিরক্ষা আর অর্থনীতির নাড়ি নক্ষত্র তখন লণ্ডন আর প্যারিসের হাতে চলে গিয়েছিল নিভৃতে।
ঠিক সেই মুহূর্তে চাতক পাখির মতো ওত পেতে ছিলেন এক ব্যক্তি, যাঁর পোশাকি নাম কুমার নারায়ণ। তিনি কোনো প্রথাগত গুপ্তচর ছিলেন না, বরং এক বোম্বে ভিত্তিক টেক্সটাইল কোম্পানির লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর আসল নাম ছিল চিতুর ভেঙ্কট নারায়ণ এবং তাঁর উত্থানের কাহিনী যেকোনো ডার্ক থ্রিলারকে অনায়াসে হার মানাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাগপুরের আর্মি পোস্টাল সার্ভিসে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছিল কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ চিঠির অন্দরে লুকানো থাকে এক একটি দেশের ভাগ্য। দিল্লির সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েটের আশেপাশে তাঁর আনাগোনা ছিল অনেকটা নিঃশব্দ এক শিকারি বাজের মতো যে সুযোগ পেলেই থাবা মারে।
কুমার নারায়ণের রণকৌশল ছিল অত্যন্ত সহজ কিন্তু ভয়ংকর রকমের সুনিপুণ যা কোনো রাডারও ধরতে পারত না। তিনি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের পিয়ন থেকে শুরু করে টাইপিস্ট আর সচিবদের হাত করেছিলেন বিদেশি মদ আর সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে। প্রতিদিন সন্ধের পর দিল্লির এক অন্ধকার অফিসের জানলা দিয়ে দেখা যেত এক অদ্ভুত নীলচে আলো আর শোনা যেত ফটোকপি মেশিনের একঘেয়ে শব্দ। দিনের আলোয় যা প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে থাকত, রাতের অন্ধকারে তারই ডুপ্লিকেট কপি চলে যেত কুমার নারায়ণের সেই গোপন ডেরায়। সেই সব নথিপত্র পরে পাচার হয়ে যেত ফরাসি দূতাবাস কিংবা অন্য কোনো শক্তিশালী পশ্চিমী দেশের হাতে।
দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে এই ঘুণপোকা ভারতের শ্রেষ্ঠতম নিরাপত্তা দেওয়ালকে ফোকলা করে দিয়েছিল কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই। ১৯৮৫ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি যখন মহানগর হাকিম পি. কে. ধামের সামনে কুমার নারায়ণ নিজের অপরাধ কবুল করলেন, তখন গোটা দেশ স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। তিনি স্বীকার করেছিলেন যে ভারতের রাজনীতি, প্রতিরক্ষা আর অর্থনীতির প্রতিটি গোপন ফাইল তিনি গত আড়াই দশক ধরে বিদেশিদের হাতে তুলে দিয়েছেন। তাঁর এই স্বীকারোক্তি ছিল যেন ভারতের ৩৬ বছরের অর্জিত স্বাধীনতার ওপর এক মস্ত বড় চপেটাঘাত। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যখন এই রহস্যের জট ছাড়াতে শুরু করল, তখন বেরিয়ে এল ভারতের ইতিহাসের বৃহত্তম গুপ্তচর চক্র।
এই বিশাল কেলেঙ্কারিতে একে একে ১৫ জন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হলো যাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন অত্যন্ত বিশ্বস্ত সরকারি কর্মচারী। কুমার নারায়ণ প্রায় ১০ লক্ষ ডলার বা তৎকালীন ভারতীয় মুদ্রায় কয়েক কোটি টাকা উপার্জন করেছিলেন এই বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে। তাঁর এই টাকার পাহাড় গড়ে উঠেছিল ভারতমাতার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের বলিদান আর রক্ত জল করা পরিশ্রমের বিনিময়ে। তাঁর স্ত্রী গীতা নারায়ণ আড়ালে থেকে এই সমস্ত অর্থনৈতিক লেনদেন সামলাতেন যার ফলে দম্পতি দিল্লির অভিজাত এলাকায় একের পর এক সম্পত্তি কিনে ফেলেছিলেন। কিন্তু সেই বিলাসিতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর একাকীত্ব আর এক অন্ধকার জগতের পৈশাচিক হাতছানি।
প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী যখন এই ষড়যন্ত্রের মূল শেকড়ে পৌঁছলেন, তখন তিনি এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করেননি সিদ্ধান্ত নিতে। ফরাসি রাষ্ট্রদূত সার্জ বোইদেভাইক্সকে কড়া ভাষায় তলব করা হলো এবং ২রা মার্চের মধ্যে তাঁকে দেশ ছাড়ার চরম হুঁশিয়ারি দেওয়া হলো। ফরাসি ডেপুটি মিলিটারি অ্যাটাশে লেফটেন্যান্ট কর্নেল অ্যালাইন বলিকে সাথে সাথে বহিষ্কার করা হলো কারণ তিনিই ছিলেন এই গোপন নথির প্রধান সংগ্রাহক। ভারত বুঝিয়ে দিয়েছিল যে কোনো আন্তর্জাতিক চাপ বা কূটনীতি ভারতের সার্বভৌমত্ব নিয়ে ছেলেখেলা করতে পারবে না। এই পদক্ষেপটি ছিল আধুনিক ভারতের এক লড়াকু এবং নির্ভীক পররাষ্ট্রনীতির এক উজ্জ্বল এবং ঐতিহাসিক উদাহরণ।
এই ঘটনা ভারতকে এক নতুন শিক্ষা দিয়েছিল যার ফলে পরবর্তীতে 'র' (R&AW) এবং আইবি-র মতো সংস্থাগুলো তাদের কাজ করার ধরণ বদলে ফেলেছিল। মহাকাশে থাকা এনটিআরও-র মতো সংস্থাগুলো আজ যে অটল নজরদারি চালায়, তার প্রয়োজনীয়তা সম্ভবত সেই অন্ধকার দিনগুলোতেই অনুভূত হয়েছিল। কুমার নারায়ণ ২০০০ সালে মারা গেলেও তাঁর রেখে যাওয়া ক্ষতগুলো ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চিরকাল সতর্ক করে দিয়ে গিয়েছে। প্রতিটি ভারতবাসীর কাছে এই কাহিনী আজও দেশপ্রেম আর সতর্কতার এক অনন্য এবং রুদ্ধশ্বাস দলিল হয়ে টিকে আছে। ভারত আজ অজেয় কারণ সে বিশ্বাসঘাতকদের চিহ্নিত করে তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে জানে পরম বিক্রমে।
পেজটি ভালো লাগলে লাইক ও ফলো করে আমাদের উৎসাহ জোগাবেন, আর বন্ধুদের মেনশন/শেয়ার করে অন্যদের দেখার সুযোগ করে দেবেন।
বিধিকরণ সতর্কতা: ©Bangla Tweet — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত এই লেখার কোনো অংশ অনুমতি ছাড়া কপি বা পুনঃপ্রকাশ করা নিষিদ্ধ। ব্যবহার করতে চাইলে পেজের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে—অন্যথায় তা কপিরাইট লঙ্ঘন হিসেবে ধরা হবে।
১. L.A. Times Archives : "India Spy Sold Secrets for 25 Years : Says He Gave Data to France, 2nd Western Nation for $1 Million"
২. The Indian Express : "Coomar Narain: A spy and how his stepson came out of the cold"
৩. Scroll.in : "Biography: How Coomar Narain made a career of leaking confidential bureaucratic documents"
৪. Frontline (The Hindu) : "Coomar Narain: Why did a corporate lobbyist betray his country?"
Bangla Tweet's Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।
সম্পাদক ও প্রকাশক : এম জি কিবরিয়া চৌধুরী
দৈনিক বাংলাদেশ অর্থনীতি ৮৫, নয়াপল্টন (৪র্থ তলা) ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ। মোবাইল: ০১৭১২-৭১৪৪৯৩, ০১৫৩৪-৬৪৬১৪১
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত