বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে খোলামেলাভাবে জানিয়েছেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূস শাসনক্ষমতা হাতে নেওয়ার পর, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন।
ড. ইউনূস তাকে বলেছিলেন, "তৌহিদ, তুমি একটু দিল্লিতে ড্রপ করো না।" জবাবে তৌহিদ হোসেন বলেছিলেন, "স্যরি স্যার, আমি বিনা আমন্ত্রণে দিল্লি যেতে পারব না।"
তৌহিদ হোসেন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের আন্তরিক চেষ্টা করলেও তা কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। তার ভাষায়, "পরে দেখা গেল, এটা ছিল একেবারেই ব্যর্থ প্রয়াস।"
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র একের পর এক বিবৃতি দিয়ে বাংলাদেশের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছিলেন। তৌহিদ হোসেন জানিয়েছেন, "প্রথমদিকে সেগুলো ওভারলুক করা হতো, কিন্তু পরে কঠোর ভাষায় জবাব দিতে আরম্ভ করি।"
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দূরত্ব সৃষ্টির সুযোগে বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে শুরু করেছিল চীন, পাকিস্তান ও তুরস্ক।
ভারতের বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর তখন বলেন, বাংলাদেশের ব্যাপারে আমেরিকার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু 'অপারেশন সিন্দুর'-এর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেন।
ড. ইউনূস প্রশাসনে তুরস্কপন্থী জামায়াতে ইসলামীর প্রভাব বেড়ে গিয়েছিল। তবে গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ প্রধান উপদেষ্টাকে জানিয়েছিল যে, নির্বাচন হলে বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলক অনেক বেশি। ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রটোকল এবং নিজের মান-মর্যাদাকে তোয়াক্কা না করে লন্ডনে ছুটে যান তারেক রহমানের কাছে।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগেই দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন। ভারতের বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর সমবেদনা জানাতে ছুটে যান ঢাকায়। ততদিনে বিএনপির সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠতা অস্বাভাবিক রকম বেড়ে গিয়েছিল, তবুও চীন সরকার খালেদা জিয়ার সম্মানে দেশ থেকে কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিদায় নেওয়ার আগমুহূর্তে বাংলাদেশের সঙ্গে গোপন চুক্তি স্বাক্ষর করে আমেরিকা ও জাপান। এই চুক্তি স্বাক্ষরের আগে আমেরিকা তো দূরের কথা, জাপান পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি।
তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী পদে বসার পর, নয়া দিল্লি থেকে ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়। তারেক রহমান, তার স্ত্রী ও কন্যাকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমমর্যাদায় আপ্যায়নের কথা বলা হয়। সেই আমন্ত্রণ উপেক্ষা করে তারেক রহমান চীন থেকে ইনভাইটেশন পাওয়ার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেন এবং মালয়েশিয়া হয়ে গত ২৪–২৬ জুন চীন সফর করেন।
ভারতের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, তাকে পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদা দেওয়া হয়। দীনেশ ত্রিবেদী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক সেরে, নয়া দিল্লি ছুটে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন। ভারতীয় মিডিয়া সংবাদ শিরোনাম করে যে, তারেক রহমান ভারত সফরে আসছেন।
এর মধ্যে ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় একটি অনলাইন কনফারেন্সে যোগ দেন, যার ফলশ্রুতিতে তারেক রহমানের ভারত সফর স্থগিত হয়ে গেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার বাংলাদেশ। ভারতের মেডিকেল ট্যুরিজমের প্রায় ৭০ ভাগ রোগী আসে বাংলাদেশ থেকে।
বিশাল ভৌগোলিক দূরত্ব সত্ত্বেও বাংলাদেশের বাজারে ভারতের শেয়ারে যথেষ্ট ভাগ বসাচ্ছে আমেরিকা। মাঝখানে একটি ত্রৈমাসিক হিসাবে দেখা গিয়েছিল, ভারতকে সরিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ট্রেড পার্টনার হয়ে উঠেছে আমেরিকা।
সর্বশেষ ত্রৈমাসিক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ট্রেড পার্টনার চীন, যাদের অংশীদারিত্ব ২১.২১%। বলা চলে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ভারত আবার দ্বিতীয় স্থানে ফিরে এসেছে, ৮.৪৭% বাণিজ্যিক অংশীদার। তবে ভারতের ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে আমেরিকা, যাদের অংশীদারিত্ব ৮.৪৬%, প্রায় ভারতের সমান।
তারেক রহমান যদি ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর চেষ্টা করেন, তাহলে জামায়াতে ইসলামীর জনপ্রিয়তা বেড়ে যাবে। তাছাড়া চীন-পাকিস্তান লবি অথবা আমেরিকা যদি কোনো কারণে তারেক রহমানের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠে, সেক্ষেত্রে বিএনপির পক্ষে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় টিকে থাকা মুশকিল হয়ে উঠবে।
কৃত্তিবাস কাশীরাম's Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।