মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
ভারত সফর: রাষ্ট্রীয় স্বার্থে দরজা খোলা রাখাই কূটনীতির প্রজ্ঞা
ভারত সফর নিয়ে বর্তমান যে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, সেখানে আমার বিনীত মত—ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে আবেগ নয়, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞাই হওয়া উচিত আমাদের পথনির্দেশক।
একজন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান যখন আমন্ত্রণ জানান, তখন সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করা মানেই কোনো বিষয়ে আপস করা নয়। বরং মুখোমুখি বসে নিজের বক্তব্য তুলে ধরা, অপর পক্ষের বক্তব্য শোনা এবং জাতীয় স্বার্থের পক্ষে দর-কষাকষি করাই পরিণত রাষ্ট্রনীতির পরিচয়। তাই সফরটি হলে সেটিকে আত্মসমর্পণ হিসেবে নয়, বাংলাদেশের স্বার্থ তুলে ধরার একটি কূটনৈতিক সুযোগ হিসেবেই দেখা উচিত।
বর্তমান বাস্তবতায় ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে শেখ হাসিনা সরকারের সময়কার নানা ঘটনা, বিশেষ করে তাঁর ভারতে অবস্থান এবং তাঁকে ঘিরে প্রত্যর্পণ-প্রশ্ন, স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জানিয়েছে যে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে একটি অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টিও আলোচনার অংশ।
কিন্তু কূটনীতির দরজা বন্ধ করে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। বরং যে বিষয়ে মতপার্থক্য আছে, সেটিই আলোচনার টেবিলে তুলে ধরা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী ভারতে গিয়ে ভারতের বক্তব্য শুনবেন, বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করবেন এবং প্রয়োজন হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জনগণ ও সংসদকে অবহিত করবেন—এটাই হতে পারে দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনীতির পথ।
আমাদের ইতিহাসও বলে, রাষ্ট্রের স্বার্থে কঠিন সম্পর্কের মধ্যেও সংলাপের প্রয়োজন কখনো শেষ হয় না। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের লাহোরে OIC সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন এবং জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি তখনও অমলিন ছিল; তবুও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে কূটনীতির পথ খোলা রাখা হয়েছিল।
একইভাবে ২০১৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরের সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নির্ধারিত সাক্ষাৎ নিরাপত্তাজনিত কারণে বাতিল হয়েছিল। ঘটনাটি পরবর্তী সময়ে কূটনৈতিক অস্বস্তির জন্ম দিয়েছিল। তবে সেই সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও হরতালের বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
অতএব অতীতের ভুল-সঠিকের হিসাবকে ভবিষ্যতের কূটনীতির একমাত্র ভিত্তি না করে আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত—বাংলাদেশ কী চায় এবং কীভাবে তা অর্জন করা সম্ভব?
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়, আবার অন্ধ বন্ধুত্বেরও নয়। এটি একটি দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্য, নদীর পানি, সীমান্ত নিরাপত্তা, জ্বালানি, যোগাযোগ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের বাস্তবতা। ভারতেরও যেমন জাতীয় স্বার্থ আছে, বাংলাদেশেরও তেমনি সার্বভৌম ও জাতীয় স্বার্থ রয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, সমতা, স্বার্থের ভারসাম্য এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, তাই আমার বিনীত আহ্বান—যদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থে সফরটি উপযোগী মনে হয়, তবে যান। শুনুন, বলুন, আলোচনা করুন; কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থের প্রশ্নে দৃঢ় থাকুন।
কূটনীতিতে কখনো কখনো একটি সফর চুক্তির চেয়েও বড়—কারণ সেখানে রাষ্ট্র রাষ্ট্রের সঙ্গে কথা বলে। আর কথা বলার দরজা খোলা রাখাই প্রজ্ঞার লক্ষণ।
ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই, কিন্তু বন্ধুত্বের ভিত্তি হবে সমতা।
সহযোগিতা চাই, কিন্তু সহযোগিতার ভিত্তি হবে পারস্পরিক স্বার্থ।
আর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে একমাত্র বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে।
শেষ কথাঃ কে কি বললো তা শুনে লাভ নেই। যারা ভারত সফর নিয়ে আজে বাজে কথা বলছেন তাদের হাতে চুল---ধরিয়ে দিলে বলতে পারবেনা সম্মুখ আর পিছন কোনদিকে। ওরা ভারত সফর নিয়ে কথা বলে। মনটা চায়-----! ভারতের সাথে সম্পর্ক খারাপ করে আমরা পারবনা। ভারত যদি নো ফ্লাই জোন করে দেয় তাহলে সমস্যা আমাদের বেশী হবে। বিষয়টি বুঝা উচিৎ।
রেজা আহমদ ফয়সল চৌধুরী
সভাপতি, ইউকে বাংলা প্রেস ক্লাব
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চ্যানেল ইউরোপ বাংলা ইংলিশ আইপি টিভি
ইমেইল channeleuropetv@yahoo.co
\Reza Ahmed Faisol Choudhury's Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন। Ahmed Faisol Choudhury's Post