নেত্রকোনা জেলার কাটলী গ্রামে ১৯৫১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন মুক্তিযোদ্ধা রোকেয়া কবির। তাঁর মা সৈয়দা বদরুন্নেসা এবং বাবা সৈয়দ মোহাম্মদ খান। ছোটবেলা থেকেই সংগ্রামী মানসিকতায় নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন তিনি।
হঠাৎ করে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েননি রোকেয়া কবির। মাত্র ১৩-১৪ বছর বয়স থেকেই নানা আ/ন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। খেলাঘর ও ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৬২ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় নেত্রকোনায় শিক্ষা আ/ন্দোলনেও অংশ নেন। ঢাকায় কলেজজীবন শুরুর সময় থেকেই পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় সংগঠক হয়ে ওঠেন রোকেয়া।
কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। ওই ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন শেখ হাসিনা। ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন এবং ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানেও সক্রিয় ছিলেন রোকেয়া।
সত্তরের নির্বাচন-পরবর্তী ঘটনাবলী থেকেই রোকেয়ার মতো ছাত্রসংগঠকেরা যু//দ্ধের একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পেয়েছিলেন। ফলে তাঁরা যু//দ্ধের জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। মিছিল, মিটিং ও আ/ন্দোলনের পাশাপাশি প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ নেওয়া এবং ব্ল্যাক আউটের সময় যু//দ্ধ পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, সে বিষয়ে মানুষকে জানানোর কাজও চালিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁরা।
মার্চের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির যৌথ আয়োজনে সশ//স্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু হয়। সেখানে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রশিক্ষণ নিতেন রোকেয়া। তিনি ছিলেন ছাত্রী ব্রিগেডের কমান্ডার।
২৯ মার্চ ঢাকা থেকে নদীপথে কাপাসিয়ায় চলে যান রোকেয়া। সেখান থেকে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে যান আগরতলায়। ঢাকায় ও আগরতলায় মিছিল-মিটিংয়ের সামনের সারিতে থাকায় পত্র-পত্রিকায় প্রায়ই তাঁর ছবি প্রকাশিত হতো। ফলে তাঁকে সবাই চিনে ফেলেছিল। এ কারণে দেশের ভেতরে গিয়ে যু//দ্ধ করার অনুমতি পাননি তিনি। তাই ভারতেই থেকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন রোকেয়া।
মুক্তিযুদ্ধে তাঁর পরিবারেরও ছিল সক্রিয় অংশগ্রহণ। নয় ভাইবোনের মধ্যে ছয়জনই সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। রোকেয়া কবিরের সঙ্গে তাঁর বোন মনিরা, বড় দুই ভাই গোলাম মর্তুজা খান ও লুৎফুর রহমান খান এবং ছোট দুই ভাই নাসের খান ও নোমান আহমেদ খান সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশ নেন।
এক সাক্ষাৎকারে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সক্রিয় ভূমিকার নানা দিক তুলে ধরেন রোকেয়া কবির। ভারতে বিভিন্ন ক্যাম্পে হাসপাতালের জন্য নার্স সংগ্রহ, তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য পাঠানো, মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ করে তাঁদের রাজনৈতিক ওরিয়েন্টেশনের পর প্রথমে প্রশিক্ষণে এবং পরে দেশের ভেতরে গেরি/লা যু//দ্ধে পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন তিনি।
বিভিন্ন ক্যাম্পে শিশু-কিশোরদের জন্য স্কুলের ব্যবস্থাও করেন রোকেয়া। তাঁদের পড়ানোর জন্য ক্যাম্পের মধ্য থেকেই শিক্ষক খুঁজে বের করেন এবং বই সংগ্রহ করেন। এমনকি নিজেও গণিত ও ইংরেজি পড়াতেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কঠিন সময়ের একটি ঘটনাও সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেন তিনি। রোকেয়া জানান, ক্যাম্পে দিনের পর দিন নিরামিষ খেতে হতো। একদিন ৩০০ লোকের জন্য ছয় কেজি খাসির মাংস পাওয়া গেল। সবাই খুব খুশি হয়েছিল। অনেক বুটের ডাল দিয়ে রান্না করা হয়েছিল, যেন সবাই একটু মাংসের গন্ধ পায়। সবাই লাইন ধরে সেই খাবার খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেছিল।
মাতৃভূমি ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমানোর সময়ের একটি ঘটনাও তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। সেই সময় কৃষক-শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষ দেশমাতৃকার স্বার্থে একে অপরকে যেভাবে সহযোগিতা করেছিলেন, তা দেখে অভিভূত হন রোকেয়া।
তিনি জানান, মে মাসের তিন তারিখ সীমান্ত পার হয়ে ভারত যাওয়ার সময় ক্ষেতে কৃষকদের কাজ করতে দেখেছিলেন। দল ধরে মানুষ দেশ ছেড়ে যাওয়ার দৃশ্য তারা অভ্যস্তভাবে দেখছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর সামনে একজন মহিলাকে দেখা যায়, তাঁর হাতে শাখা এবং মাথায় সিঁদুর। তিনিও তাঁদের মতো দেশ ছেড়ে যাচ্ছিলেন। তখন একজন কৃষক এসে ওই মহিলার হাতের শাঁখা ভেঙে দেন এবং পানি এনে সিঁদুর ধুয়ে নিতে বলেন। কারণ রা/জা/কার কিংবা পা/ক সে/নার সামনে পড়লে যেন তাঁকে বিশেষ ধর্/মের বলে চিনতে না পারে, নতুবা তাঁর ওপর নি/র্যা/তন চালানোর আশঙ্কা ছিল।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ২৪ ডিসেম্বর আগরতলা থেকে ঢাকায় ফিরে আসেন রোকেয়া কবির। দেশে ফিরেই আবার সংগঠনে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। পরবর্তীতে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ-বিএনপিএসের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে সমাজ গড়ার কাজ করেছেন রোকেয়া কবির।
ছাত্রজীবনের আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযু//দ্ধের প্রস্তুতি, সশ/স্ত্র প্রশিক্ষণ এবং শেষ পর্যন্ত দেশের বাইরে থেকে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের দায়িত্ব পালন, রোকেয়া কবিরের পথচলা এভাবেই যুক্ত হয়ে আছে বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামের সঙ্গে।
কৃতজ্ঞতা: ডয়েচে ভেলে
সৌজন্যে: বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র