Choyon Khairul :মানুষের জীবনে বহু সুখ, দুঃখের পালাবদল হয়। দারিদ্র্য আসে, অপমান আসে, অসুখ আসে, প্রিয়জনের বিচ্ছেদ আসে। সময় অনেক ক্ষত শুকায়ে দেয়। কিন্তু সন্তানহারা পিতা বা মাতার হৃদয়ের ক্ষত সময়ে শুকায় না। পৃথিবীর কোনও ভাষায় এই শোকের জন্য যথেষ্ট শব্দ নাই।
একজন বৃদ্ধ মানুষ মারা গেলেন। প্রতিবেশীরা তাকে নিয়ে নানা কথা বললো। কেউ বললো, তিনি অত্যন্ত সৎ ও দয়ালু ছিলেন। কেউ বললো, তিনি ছিলেন রাগী, একগুঁয়ে, কঠোর। মানুষের চরিত্র কখনও একরঙা নয়। জীবদ্দশায় তিনি যেমনই হয়ে থাকুন না কেন, তার অন্তরের কোণে এমন একটা ভাঙা ঘর, যেখানে সারা জীবন তার মৃত সন্তানের নাম প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
বহু বছর আগে তার ছেলে দুর্ঘটনায় অকালে প্রাণ হারিয়েছিল, কিম্বা খুন হয়েছিল। সেদিনের পর থেকে পৃথিবী তার কাছে আর আগের মতো ছিল না। তিনি আবার কাজ করেছেন, সংসার চালিয়েছেন, অতিথি আপ্যায়ন করেছেন, বাজার করেছেন, উৎসব পালন করেছেন। বাইরে থেকে সবকিছু চলেছে। কিন্তু তার ভেতরে সময় থেমে গিয়েছিল সন্তান হারানোর দিনটিতে। মানুষ তাকে দেখেছে, বুকের মধ্যে প্রতি পলে যে অনুপস্থিতির ওজন বহন করেছেন, তা কেউ দেখেনি।
একজন বৃদ্ধা মারা গেলেন। পাড়ার অনেকে হয়তো তাকে ভালোবাসতো না। হয়তো তিনি কথায় তীক্ষ্ণ ছিলেন, হয়তো অভিমানে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু কে জানে, বহু বছর আগে তার একমাত্র মেয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি আর আগের মানুষটি ছিলেন না।
যেদিন কোনও মা নিজের সন্তানের কবরের সামনে দাড়ান, সেদিন তার ভেতরের কিছু চিরকালের জন্য মরে যায়। পরে তিনি বেঁচে থাকেন, কিন্তু সে বেঁচে থাকা আর পূর্ণ জীবন নয়; সেটা ভাঙা পাত্রে জল ধরে রাখার চেষ্টা।
মানুষ প্রায়ই অন্যের ব্যবহার দেখে বিচার করে। আমরা জানি না, কত মানুষের কঠোরতার নিচে জমাট বেঁধে আছে অশেষ শোক। যে বৃদ্ধ প্রতিবেশীর সঙ্গে রূঢ় আচরণ করেন, তিনি হয়তো প্রতিদিন রাতে ছেলের পুরোনো একটি জামা স্পর্শ করে ঘুমান। যে বৃদ্ধা অকারণে রেগে যান, তিনি হয়তো আজও মেয়ের জন্মদিনে নিঃশব্দে কাঁদেন।
সন্তান হারানোর প্রাচীন কাহিনিগুলো কখনও পুরোনো হয় না। ফিরদৌসীর শাহনামায় রুস্তম ও সোহরাবের যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত দুই বীরের যুদ্ধ নয়; সেটি এক পিতার এমন এক জয়, যার মূল্য তার নিজের সন্তান।
যুদ্ধশেষে যখন রুস্তম বুঝতে পারেন, যাকে তিনি প্রাণঘাতী আঘাত করেছেন, সে তরুণ তার পুত্র, তখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বীরও অসহায় এক বাবা ছাড়া আর কিছু নন।
হোমারের ইলিয়াড-এ ট্রয়ের বৃদ্ধ রাজা প্রিয়াম, গভীর রাতে শত্রু-শিবিরে গোপনে প্রবেশ করেন। তিনি আর রাজা নন; তিনি শুধু একজন বাবা। অ্যাকিলিসের সামনে নতজানু হয়ে তিনি হেক্টরের নিথর দেহটি ফেরত চান, যাতে ছেলেকে সম্ভ্রমের সাথে কবর দিতে পারেন।
পৃথিবীর ইতিহাসে যত যুদ্ধের কাহিনি লেখা হয়েছে, তার মধ্যে হয়তো এটি সবচেয়ে নীরব দৃশ্য, একজন বৃদ্ধ পিতা, যিনি আর কিছু চান না, শুধু তার সন্তানের শেষ বিদায়টুকু নিজ হাতে সম্পন্ন করতে চান।
ডব্লিউ. ডব্লিউ. জেকবসের The Monkey's Paw-এর বৃদ্ধ দম্পতির কথাও অলৌকিকতার জন্য মনে থাকে না। মনে থাকে সেই অযৌক্তিক অথচ গভীর মানবিক আকাঙ্ক্ষার জন্য, যদি আর একবার তাদের ছেলে দরজায় কড়া নাড়ে, যার জন্য ঘরের একটি চেয়ার আজও খালি।
ইতিহাসেও এরকম শোকের অসংখ্য মুখ আছে। অটো ফ্র্যাঙ্ক/Otto Frank বৃদ্ধ হয়েছিলেন; তার মেয়ে আন ফ্র্যাঙ্ক/Anne Frank আর কখনও ষোলো বছরে পৌঁছাতে পারেননি।
পৃথিবী অ্যানের ডায়েরি পড়ে এক অসাধারণ কিশোরীকে চিনেছে, কিন্তু অটোর জীবনের বাকি অংশ এক নীরব কর্তব্যে পরিণত হয়েছিল, যে মেয়েটি বেঁচে থাকতে পারেনি, তার কণ্ঠস্বরকে বাঁচিয়ে রাখা। নিজেকে তিনি ধীরে ধীরে মেয়ের অসমাপ্ত জীবনের ছায়ায় সমর্পণ করেছিলেন।
সন্তানহারা মানুষদের জীবন দুটি সময়ে ভাগ হয়ে যায়। একটি সময়, যখন সন্তান বেঁচে ছিল। আরেকটি সময়, যখন পৃথিবীর সবকিছু চলছে, কিন্তু সে আর নেই। ক্যালেন্ডারে বছর বদলায়, ঋতু বদলায়, শহর বদলায়, মানুষ বদলায়; শুধু বদলায় না সে অনুপস্থিতির বয়স।
যে ছেলে বাইশে মারা গিয়েছিল, সে আর তেইশে পৌঁছায় না। যে মেয়ে উনিশে চলে গিয়েছিল, সে আর বিশে পা রাখে না। অথচ তার বাবা আশিতে পৌঁছে যান, তার মা পঁচাত্তরে। এক অদ্ভুত অসময়ে তারা বেঁচে থাকেন, যেখানে বাবা-মা বুড়ো হন, কিন্তু সন্তান চিরকাল তরুণ থেকে যায়।
হয়তো এ কারণে অনেক বৃদ্ধ মানুষ কখনও কখনও জানালার দিকে চেয়ে থাকেন। তারা কারও জন্য অপেক্ষা করছেন না, হয়তো করছেনও। মানুষের হৃদয় যুক্তির নিয়ম মানে না।
বহু বছর পরে হঠাৎ কোনো ভিড়ের মধ্যে একটি পরিচিত হাঁটার ভঙ্গি, একটি কণ্ঠস্বর, কিংবা দূর থেকে দেখা একটি মুখ, এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়, "যদি ফিরে পেতাম।"
তারপর আবার সব আগের মতো হয়ে যায়। শুধু তাদের ভেতরে নয়।
বৃদ্ধ বয়সে মানুষের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি জীবন শেষ হলো। কিন্তু সন্তানহারা কোনো পিতা বা মাতার মৃত্যু আরেকটি কথা মনে করিয়ে দেয়, অনেক বছর আগে আরেকটি জীবন শেষ হয়েছিল, আর সেদিন থেকে এই মানুষটি নিজের ভেতরে একটি অসমাপ্ত শোক বহন করে এসেছেন।
এই শোকের কোনো বার্ধক্য নেই। শরীর বুড়ো হয়, স্মৃতি ঝাপসা হয়, নাম ভুলে যায় মানুষ। কিন্তু যে তরুণ নামটি একদিন কবরের পাথরে খোদাই করা হয়েছিল, সেটি আর কখনও বৃদ্ধ হয় না।