প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ১২, ২০২৬, ৪:০৫ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬, ১১:২১ পি.এম
রূপপুরের ধোঁয়াশাঃ নিছক দুর্ঘটনা নাকি ভূ-রাজনীতির অদৃশ্য ছায়া?
অনলাইন বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ৩টা। তারিখটা ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ। চারদিক সুনসান, সারা দেশ যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই পাবনার ঈশ্বরদীতে দেশের সবচেয়ে সুরক্ষিত মেগা প্রকল্প - রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতর থেকে উঠতে শুরু করে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। একে একে পুড়ে ছাই হতে থাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল সব নথিপত্র আর সার্ভারের যন্ত্রাংশ।
অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, পরদিন সকালের খবরের কাগজ বা টেলিভিশনের ব্রেকিং নিউজে কোনো শোরগোল নেই। দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যমগুলো যেন একেবারে মুখে কুলুপ এঁটেছে। এত বড় একটি ঘটনা ঘটে গেল, অথচ চারদিকে পিনপতন নীরবতা! একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এই অস্বাভাবিক নীরবতা বুকের ভেতর একটা শীতল স্রোত বইয়ে দেয়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে অনেকগুলো না-বলা প্রশ্ন - আমরা কি তবে অন্ধকারে?
চেরনোবিলের পদধ্বনি, নাকি অন্য কোনো শঙ্কা? অনেকের মনেই হয়তো প্রথম ধাক্কায় প্রশ্ন জাগছে - রূপপুর কি তবে চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো কোনো বিপর্যয়ের দিকে এগোচ্ছে? স্বস্তির শ্বাস ফেলে বলা যায়, না। আগুনটা রিঅ্যাক্টর কোরে বা রেডিওঅ্যাক্টিভ কোনো জোনে লাগেনি। কিন্তু স্বস্তির এখানেই শেষ। আগুন লেগেছে প্রকল্পের একেবারে স্নায়ুকেন্দ্রে - বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (বায়েক) পাওনিয়ার বেজের সার্ভার রুমে।
একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো কি-পয়েন্ট ইন্সটলেশনে (KPI) এত সহজে আগুন লাগাটা সাধারণ কোনো ত্রুটি নয়। আজ সার্ভার রুমে লেগেছে, কাল যে মূল প্ল্যান্টে লাগবে না - সেই নিশ্চয়তা কে দেবে?
পুড়ে যাওয়া নথিপত্র ও থমকে থাকা ৪৮ ঘণ্টা! চোখ বন্ধ করে দৃশ্যটা একবার ভাবুন। দাউদাউ করে জ্বলছে সার্ভার রুম। ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। পুড়ে গেছে ইন্টারনেট সার্ভার, কম্পিউটার আর সবচেয়ে বড় কথা-প্রকল্পের অতি সংবেদনশীল ব্লু-প্রিন্ট ও নথিপত্র।
অগ্নিকাণ্ডের পর টানা ৪৮ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে এনপিসিবিএল ও বায়েকের কার্যালয়ে ইন্টারনেট নেই। কাস্টমস বিল্ডিং ও ক্যান্টিনে বিদ্যুৎ ও পানির তীব্র হাহাকার। প্রচণ্ড গরমে অন্ধকারে বসে আছেন হাজারো শ্রমিক। পুরো প্রকল্পটি যেন সাময়িকভাবে পঙ্গু হয়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিস বলছে 'বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট'। কিন্তু আসলেই কি তাই? নাকি অন্ধকারে কেউ খুব সুকৌশলে মুছে দিয়ে গেল কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ বা ডেটাবেস?
ভূ-রাজনীতির দাবাখেলা ও প্রতিবেশীর অদৃশ্য হাত! ঘটনাটিকে একটু বৃহত্তর ক্যানভাসে দেখা যাক। রূপপুর প্রকল্প সফলভাবে উৎপাদনে গেলে বাংলাদেশের জ্বালানি নির্ভরতা অনেকাংশে কমে আসবে। আমরা হয়ে উঠবো অনেক বেশি স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু এই অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার নামে, আমাদের জ্বালানি খাতকে যারা সবসময় নিজেদের মুঠোর ভেতর রাখতে চায় - সেই আধিপত্যকামী প্রতিবেশীর দিকে সন্দেহের তীর যাওয়াটা কি খুব অস্বাভাবিক?
একটি দেশের মেগা প্রজেক্টের কাজ পিছিয়ে দেওয়া, সার্ভার ডাউন করে দেওয়া বা একটি ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করার পেছনে আঞ্চলিক কোনো ইন্টেলিজেন্স কাজ করছে কি না, তা গভীরভাবে ভেবে দেখার সময় এসেছে। শর্টসার্কিটের আড়ালে এটি যে একটি সূক্ষ্ম সাইবার-কাইনেটিক (Cyber-kinetic) স্যাবোটেজ নয়, তা বুক ঠুকে বলার উপায় নেই।
এদিক থেকে সবচেয়ে বড় শঙ্কার জায়গা হলো আমাদের কর্তৃপক্ষের আচরণ। প্রকল্প পরিচালক ড. কবির হোসেনের ফোন বাজছে তো বাজছেই, কোনো উত্তর নেই। এসএমএসেরও জবাব নেই। ওপর মহল থেকে আসা 'ড্যামেজ কন্ট্রোল' বা তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার এই সংস্কৃতি আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? জাতীয় সুরক্ষার সঙ্গে জড়িত এত বড় একটি ঘটনাকে আড়াল করে কার স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে?
রূপপুর শুধু একটি কংক্রিটের স্থাপনা নয়, এটি আমাদের আগামীর স্বপ্নের প্রতীক। এর গায়ে লাগা আঁচড় আমাদের সার্বভৌমের অস্তিত্বেই আঘাত হানে। সময় এসেছে এই ধোঁয়াশার পেছনের আসল কারিগরদের
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।
সম্পাদক ও প্রকাশক : এম জি কিবরিয়া চৌধুরী
দৈনিক বাংলাদেশ অর্থনীতি ৮৫, নয়াপল্টন (৪র্থ তলা) ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ। মোবাইল: ০১৭১২-৭১৪৪৯৩, ০১৫৩৪-৬৪৬১৪১
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত