৫ই আগস্টের পরপরই একজন আমার পোস্টে জানতে চেয়েছিল যে আগামীতে আমি কাকে ভোট দিবো। আমি উত্তর দিয়েছিলাম, "আওয়ামীলীগ যদি নিজেদেরকে শুধরে নিয়ে ফেরত আসে, তাহলে বরাবরের মত্য আওয়ামীলীগকেই ভোট দিবো যদি সুযোগ আসে।"
তখন একদম বিপরীত সময় ছিল। প্রচুর মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এক প্রচন্ড লালবদর শাহবাগী বন্ধু (প্রকৃতপক্ষেই লালবদর সে। ইউনুস রেজিমে একদিনের জন্যও তাকে প্রতিবাদ করতে দেখিনাই কোনকিছুর) আমাকে ইনবক্সে জানাইলো যে আমি নাকি ফ্যাসিবাদের দোসর, তাই আমাকে আনফ্রেন্ড করতে চায়। আমি তাকে বলেছিলাম, আমার লেখালেখি, একটিভিজম আওয়ামীলীগের জন্য না। আমি মহান মুক্তিযুদ্ধকে যারাই কলঙ্কিত করতে যাবে, তাদের বিরুদ্ধেই লিখবো, বলবো। ততদিনে প্রমাণ হয়েছিল যে ইউনুস একজন স্বাধীনতাবিরোধী, তার সরকার মুক্তিযুদ্ধবরোধী। মুক্তিযুদ্ধকে একমাত্র আওয়ামীলীগই ধারণ করে, সেটাও বোঝা হয়ে গেছে ততদিনে।
আমার সেই বন্ধু তখন বলেছিল যে সেও তো চায় যেন জামাত ক্ষমতাবান না হয়। সে তখন আমাকে আনফ্রেন্ড করে নাই। তারপর দিনের পর দিন জামাত-শিবিরকে ক্ষমতাবান করেছে ইউনুসের সরকার, তার বিরোধীতা তাকে করতে দেখি নাই। অবস্থাদৃষ্টে আমারই তাকে আনফ্রেন্ড করার কথা ছিল, কিন্তু আমি তাকে ইনবক্সে গিয়ে জ্বালাচ্ছি না।
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গণভবন ত্যাগের খবর এএফপির তখনকার ঢাকা ব্যুরো চিফ শফিকুল আলমকে দিয়েছিলেন তারই নিয়োগকৃত প্রেস সচিব নাইমুল ইসলাম খান (এটা নিয়ে আমি বিস্তারিত লিখেছিলাম: শেখ হাসিনার পতনের প্রধানতম নাটের গুরু ছিল এই রাজাকারপুত্র। কমেন্টে দিয়ে দিচ্ছি সে লেখা)! এ পর্যন্ত যত রাজাকারপুত্র ও কন্যা দেখেছি অল্প কিছু মানুষের মধ্যে নাইমুল ইসলাম খান তার বাবার রাজাকারগিরি নিয়ে প্রকাশ্যে দূ:খপ্রকাশ করতেন। এছাড়া যারা ছিল, তাদের মধ্যে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর এক পুত্রও তার বাবার কীর্তির কারণে লজ্জিত বোধ করতো শুনেছি। কিন্তু বেশিরভাগই একসময় না একসময় তাদের ডিএনএতে থাকা রাজাকারের বাচ্চাগিরি প্রকাশ করেছে। নাইমুল ইসলাম খানও তার ব্যাতিক্রম নয়। এছাড়া দেখবেন জাবির সরকার ও রাজনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীকে, যার স্বামী একজন রাজাকার ছিল। তিনি কোনদিন মিডিয়াতে আসতেন না, এখন রাজাকার ও পাকিস্তানীদের পক্ষে কথা বলেন মিডিয়াতে।
শফিকুল ইসলাম ছিল জুলাই বিক্ষোভের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড। শফিকই কোন এক লেখায় বলেছিল যে তার সাথে মাহফুজ আলমের সখ্যতা ছিল অনেক আগে থেকে। ইউনুসের এজেন্ডা বাস্তবায়নের মাধ্যম হিসেবে শফিকের তত্ত্বাবধানে ২০২৩ সালের অক্টোবরে গঠিত ছাত্রশক্তির (২০০৭ সালে গঠিত ইউনুসের নাগরিক শক্তির পার্ট হিসেবে) মাহফুজসহ অন্যান্য সকলের সাথে যোগাযোগ রেখে, কোটা আন্দোলনকে ইউএসএইডের সহায়তায় সরকার বিরোধী আন্দোলনে রুপ দেওয়ায়। এই কাজে গার্ডিয়ানের ভুমিকায় ছিল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক (গীতিআরা, তানজিমুদ্দিন, সামিনা লুৎফা, শাহান, মারুফরা)।
যাইহোক, আমার সেই লেখায় আমি জোর দিয়ে বলেছিলাম যে আন্দোলনের পুরো সময় (জুলাই ১ থেকে আগস্ট ৫ পর্যন্ত) নাইমুল ইসলাম খান গণভবন থেকে শফিককে সরকারের প্রতিটা পদক্ষেপের খবর সরবরাহ করতো। শেখ হাসিনার পতনের জন্য এই রাজাকারপুত্র অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত এটা নির্দিধায় বলা যায়।
জাস্ট চিন্তা করেন একটা ব্যাপার। আওয়ামীলীগ যদি কোনদিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফেরত আসে, তাহলে ডাস্টবিনখ্যাত শফিকুল আলমের কি দশা হবে? ইউনুস সরকারের প্রেসটিম নেতৃত্ব দিয়ে, ব্রিফিং করে গণশত্রুতে পরিনত হয়েছে না সে? শফিকের মতো না হলেও, শেখ হাসিনার কর্মকান্ডের একটা বড় অংশের ভাগিদার তো নাইমুল ইসলাম খানও। তাইনা? দেশ জুড়ে আওয়ামীলীগের নেতা, কর্মী, এমনকি সমর্থকদের প্রচুর ভুয়া মামলা দিয়ে জেলে ঢুকিয়েছে, আওয়ামীলীগের না হয়েও শুধুমাত্র কেউ "জয় বাংলা" স্লোগান দিলেই ইউনুসের মবন্বয়ক বাহিনী আক্রমণ করে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই পিটিয়ে মেরে ফেলেছে।
কিন্তু, শেখ হাসিনার প্রধান প্রেস সচিব নাইমুল ইসলাম খান ৫ই আগস্টে শেখ হাসিনাকে ফেলে দিয়ে ফেসবুক ডিয়েক্টিভেট করে বহাল তবিয়তে ঢাকায় অবস্থান করেছে। তার বিরুদ্ধে দূর্নীতির কিছু মামলা হলেও কোন হ/ত্যা মামলা হয়নি, অথচ প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি, শাহরিয়ার কবির, তুরিন আফরোজরা বিরুদ্ধে হ/ত্যা মামলায় দুই বছর ধরে জেলে! শত শত নেতা-কর্মী দেশ থেকে পালিয়ে বিদেশে চলে গেলেও নাইমুল ইসলাম খান ইউনুস সরকারের প্রেস টিমের সাথে, আসিফ নজরুলদের সাথে আড্ডা মেরেছে। কিন্তু আমি আওয়ামীলীগের খুব মানুষকে দেখেছি নাইমুল ইসলাম খানের মীরজাফরগিরি নিয়ে কথা বলতে। তাকে কেন শফিকুলরা গ্রেফতার করলো না, জেলে পুরলো না, কারো এমন প্রশ্ন মাথায় আসে নাই? বলেন না কেন?
আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতাকর্মী-সমর্থকরা সোশ্যাল মিডিয়ায় লালবদরদের দোষ দিয়ে যায়। অথচ আওয়ামীলীগের ভিতরে থেকে যারা (আমার আরো সন্দেহ হয় সালমান এফ রহমান, আনিসুল হক, এবং মোমেনকে, যারা ২০২৩ সালের মে মাসে পিটার হাসের সাথে মিটিং করেছিল এবং তখন পিটার হাস বলেছিল যে আওয়ামীলীগ ২০২৪ সালে সর্বদলীয় নির্বাচন না দিলে সরকার পতন ঘটিয়ে ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করবে) আওয়ামীলীগকে দিনের পর দিন ধ্বংস করেছে (শেখ তাপস, শেখ পরশের বউ, ওবায়দুল কাদের, নানক, শামিম ওসমান প্রমুখ) তাদের ব্যাপারে প্রকাশ্যে না বলাটা তাদের মুর্খামি। ইনটেলেকচুয়াল ইনেবিলিটি।
সত্যি কথা বলতে, ২০২৪ এর জুলাইয়ের ১৬ তারিখ থেকে ৫ই আগস্ট পর্যন্ত সরকারের প্রতিটা পদক্ষেপই ছিল নিজেদের পায়ে কুড়াল মারার মতো। নিজেদের ভুলেই তাদের পতন হয়েছিল। কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠা সরকারকে ফেলে দিতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো, বিদেশী চক্র, এনজিও, সিভিল সোস্যাইটি নাইমুলদের মতো মীরজাফরদের নিয়ে ষড়যন্ত্র করবেই। সেই ষড়যন্ত্র সামাল দিতে পারার মতো রিসোর্স ও বুদ্ধি আওয়ামীলীগ হারিয়ে ফেলেছিল। সালমান এফ রহমানের মতো আন্তর্জাতিক কর্পোরেট ক্রিমিনালদের হাতে ঘিলুর দায়িত্ব গেলে ব্যর্থতা আসাই স্বাভাবিক।
দুই বছর আগের ব্যর্থতার চক্র থেকে এখনো বের হতে পারেনি আওয়ামীলীগ। আন্দোলনের সময় বিরোধীরা মানুষের ইমোশন নিয়ে খেলেছে। সেই ইমোশনকে কাউন্টার দেওয়ার দিকে না গিয়ে উলটো সরকারবিরোধী ইমোশন মানুষের ভিতর বাড়িয়ে দিয়েছিল সরকার। যেমন: আবু সাঈদসহ ছয়জনের হ/ত্যার ঘটনার পর "তারা জামাত-শিবির ছিল" না খুঁজে, "আন্দোলনকারীদের ভুলিয়ে ভালিয়ে আনা হয়েছে, ড্রাগ দেওয়া হয়েছে" না খুঁজে সরকারের দুই একটা মন্ত্রীকে পদত্যাগ করিয়ে, পুলিশের দায়িত্বশীল কয়েকজনকে দ্রুত ডিসিপ্লিনারি একশন নিলে কিছুটা ড্যামেজ কন্ট্রোল হয়তো হতো। আবার নাও হতে পারতো, কারণ তারা সরকারের পতনের উদ্দেশ্যেই আবু সাঈদকে কোরবানি দিয়েছিল বলে আমার বিশ্বাস।
এরকম বোকা কাজ পুরো সময়েই করে গিয়েছিল বলেই সরকারের পতনের পথ সহজ হয়েছিল। আওয়ামীলীগের উপর মানুষের রাগ অনেকটাই কমেছে ইউনুস সরকার ও বর্তমান সরকারের ব্যর্থতার কারণে। আওয়ামীলীগ অনেক।দ্রুতই রিলেভেন্ট হয়ে উঠেছে ইউনুস ও তারেক সরকারের আইনশৃঙ্খলার ভয়ানক অবনতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যর চড়া দাম, গ্যাস বিদ্যুৎ সংকট চরমে উঠে যাওয়া, ইতিহাস বিকৃতি, বৈষম্য তৈরি করা, নেপোটিজম করা, মব সন্ত্রাসে হাওয়া দেওয়া, ইত্যাদি কারণে। এতে আওয়ামীলীগকে মাইলেজ দেওয়ার কোনই যুক্তি নাই।
আওয়ামীলীগকে মাইলেজ দেওয়া যেত যদি আওয়ামীলীগ কিছু দৃশ্যমান উন্নতি করতে পারতো। সেইসময় পারেনাই ঠিক আছে, কিন্তু পরবর্তীতে এই দল আপামর মানুষের আবেগকে তাদের দিকে নিয়ে যেতে তেমন কোন কাজ করে নাই। এসব নিয়ে আওয়ামীলীগকে কাজ করতে হবে। ভিতরে ভিতরে।হয়তো শুদ্ধি অভিযান হয়েছে, কিন্তু সেটা জনগণকে জানতে দেওয়া না হলে আওয়ামীলীগের প্রতি আস্থা আসবে কিভাবে? সেই আস্থার জায়গা তৈরি করতে হবে। কিভাবে করবে সেটা আওয়ামীলীগকে ঠিক করতে হবে।
প্রতিহিংসার রাজনীতি অনলাইনে করে লাভ নাই। কাল ছাত্রলীগের নারী কর্মীদের উপর অত্যাচার নিয়ে সুন্দর একটা এনিমেটেড ভিডিও দেখলাম। একদম শেষে দুইটা ট্যাগলাইন দেখে বিরক্ত হলাম। কথাটা প্রতিহিংসামূলক ছিল। প্রতিহিংসামূলক বা রিভেঞ্জ/ভিন্ডিকটিভ না হয়ে সেটা যদি "ন্যায়বিচার" লেখা হতো এই ভিডিওটা অসম্ভব সুন্দর হতো (ছাত্রলীগের অনেকেই হয়তো বলবেন যে "আমাদের সাথে যা করা হয়েছে তার প্রতিশোধ নিবোই নিবো"। প্রতিশোধ নেওয়ার স্পৃহা প্রকাশ করলে তা বুমেরাং হয় এটাও বোঝা উচিৎ।
প্রতিটা মানুষের মধ্যেই প্রতিশোধপরায়ণতা আছে। অপরাধপ্রবণতা আছে। কিন্তু সেসব সবসময় প্রকাশ করেনা। যদি সকল মানুষের অপরাধপ্রবৃত্তি প্রকাশ পেত তাহলে এই পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে যেত। ঠিক, এই কারণেই আইন আছে, আইনের প্রয়োগ করে আইনের শাসন দরকার হয়। ঠিক তেমনি, মানুষের ভিতরের প্রতিশোধপরায়ণতাও দমন করতে জানতে হয়। আপনি যদি মাইর খেয়েই যান, উলটো দেওয়ার শক্তি সঞ্চয় করতে হবে।
আওয়ামীলীগের হাত ধরে আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি। পাকিস্তানের পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশ হওয়ার পর থেকেই এই দলের নেতৃত্ব বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে স্বাধীনতাকামী মানুষকে আস্থা জুগিয়েছে। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের জয় ছিল সেটার প্রতিফলন। বঙ্গবন্ধুসহ সেইসময়ের সকল নেতৃত্বর কারণে আমরা বর্তমা বাংলাদেশ পেয়েছি। সেই দলকে বারবার বিভিন্নভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে স্বাধীনতাবিরোধীরা। আগেও পারেনাই, এবারও পারবে না। আওয়ামীলীগ রাজনীতিতে ফিরবেই, এই দলকে ফিরতেই হবে। তার জন্য হয়তো রক্তপাত হতে পারে। কিন্তু বিভ্রান্তহীন (মৌলবাদকে, জঙ্গীবাদকে, চরমপন্থাকে উঠতে দিবে না) আওয়ামীলীগ বাংলাদেশে খুব দরকার। বিরোধীদলে থাকুক, কিংবা সরকারে। এই দেশকে সঠিক পথে ফেরানোর জন্য হলেও আওয়ামীলীগ লাগবে।
আওয়ামীলীগের জন্য শুভকামনা।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
Hasan Mahmud Tipu's Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।