সন্তান যখন মানুষ নামে পশু হয়ে যায়
হায়রে সুখের জীবন
শাহিদা ইসলাম
আমাদের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু মেহেদি চৌধুরী
জাপান দূতাবাসের ফাষ্ট সেক্রেটারি ছিলেন। খুব শৌখিন মানুষ ৫০০ সাট, মাসে ত্রিশ টা সাট পড়লেও ৪৭০/ টা রয়ে যেত। ফরেনার দের সাথে চলাফেরা সব সময় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন আর স্মার্ট থাকতে হতো উনাকে। জাপান গেলেই আমাদের জন্য গিফট আনতেন। হঠাৎ যোগাযোগ কমে গেল,আমি বাড়ি করে দূরে চলে এলাম।
অনেক বছর কোন খোঁজ খবর পাই নাই।
হঠাৎ একটা আননুন নাম্বার থেকে ফোন,
ভাই আমি চৌধুরী বলছি, ওহ ভাই বলেন বন্ধুর কন্ঠ শুনে খুব আনন্দ হলাম।
ভাই আপনার বাসার ঠিকানা দেন আসব।
দুইদিন পর ঈদ,আমরা বলাবলি করছি হয়ত আমাদের গিফট দিতে আসবেন।
ভাইয়ের বউ স্কুল টিচার,ছেলে একটা মিডিয়া তে কাজ করে, মেয়ের পড়াশোনা শেষের দিকে জানতাম।
ভাইকে দেখেই বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল
যে মানুষ রাস্তা দিয়ে হাটলে পারফিউমের সুবাস ছড়িয়ে যেত চারিপাশে সেই মানুষের জীর্ণ শীর্ণ অবস্থা, কেন?
দুপুরে খাবার দিলাম,ইলিশ তার প্রিয় মাছ ছিল,
চিংড়ি মালাইকারি আর বেগুনের নানা পদ,উনার পছন্দের খাবার খেতে বসে হাউমাউ করে কেদে ফেললেন।
ভাবী আপনার হাতের রান্নার স্বাদ একই রকম আছে,
আপনারা সবাই এগিয়ে আছেন
আমি পিছিয়ে গেছি
আমার আকাশে আর আলো নেই
গভীর কালো।
খাবার টেবিল গুছিয়ে আমরা দুজন বন্ধুর সাথে বসলাম। দুই বন্ধু বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল।
আমি আর ধৈর্য ধারণ করতে পারছিলাম না,
ভাই, ভাবী বাচ্চারা কেমন আছেন?
গলার স্বর আধো বন্ধ করে বললেন,ভাবী আমি এখন বয়স্কদের আবাসে থাকি।
চেয়ার থেকে উঠে দাঁডালাম আমি
কেন ভাই?
উনি শুরু করলেন, চাকরি থেকে অবসর নেবার পর কয়েক কোটি টাকা হাতে পেলাম,একটা ফ্লাট কিনলাম,জায়গা জমি বাড়িতে ছিল,সেখানে কিছু ইনভেস্ট করলাম।
আমার ছেলে মেয়ে বউ আমাকে পাগল সাবস্ত করল বাড়ি থেকে বিতাড়িত করল।
আমার সমস্ত টাকা তাদের নামে লিখিয়ে নিল জোর পূর্বক।
বউ আমাকে ডিভোর্স দিল।
ছেলে বলল, তুমি আমাদের সাথে থাকতে পারবা না তোমার মাথা ঠিক নাই। আমাদের সামাজিক পরিবেশ দুষিত হচ্ছে। বয়স্কনিবাসে রেখে আসল,মা ছেলে তে বুদ্ধি করে।
ভাই সেখানে থাকা যায় না
খাবার কষ্ট , ,এই রান্না খেয়ে আমি দুর্বল হয়ে যাচ্ছি,ওখানে আর যাব না আপনার বাড়ির স্টোর রুমে আমাকে থাকতে দেন।
যেই মানুষ টি এলে আমি অস্থির হয়ে যেতাম,এত পরিচ্ছন্ন একজন সন্মানিত ব্যক্তি আমার বাড়িতে আসছে কোথায় কিভাবে বসতে দেব।
সেই মানুষের ভাগ্যের নির্মম পরিহাস,
আমার চোখের পানি এত নির্দয় না যে ঝরবে না,
উঠে এলাম। ঝরঝর করে চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগল।
সকাল হলো, ঈদের দিন, আমি ভুলে গিয়েছিলাম উনার একটা পাঞ্জাবি কেনার কথা।
ছেলের নতুন একটা পাঞ্জাবি কেনা ছিল
বের করে দিলাম,উনি খুশি মনে পরে নিলেন
এবং এত খুশি হলেন,আমি লজ্জিত বোধ করলাম,কেন একটা পাঞ্জাবি উনার জন্য কিনলাম না।যেই মানুষ ঈদে সর্বোচ্চ দামী পাঞ্জাবী পরে ঈদের জামাতে যেত,সাধারণ কেউ কোলাকুলি করতে ভয় পেতেন।
যেমন দেখতে সুন্দর,তেমন তার অবস্থান।
খোদা তোমার লীলা বোঝা দায়।
কয়েকদিন আমাদের কাছে রেখেছিলাম, পরে একটি পরিবারের সাথে এক রুমের সাবলেট ঠিক করে দিলাম। খরচ বন্ধুরা মিলে বেয়ার করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
এই বউ সন্তান ছিল তার কলিজার টুকরা, দেশ বিদেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রি তাদের দিয়েছেন।
এই তো জীবন, তাকে ঘরের বাইরে রেখে বউয়ের ঘুম হয় কি?সন্তানরা বাবার আদরে বড় হয়েছে, আজ তারা শ্বশুর বাড়ির আদর পাচ্ছে।
সেই টাকা তাদের কি সুখের ঠিকানা দিতে পেরেছে?
হায়রে ভাগ্যের পরিহাস।
Everyone
Shahida Islam's Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।