সালাহউদ্দিন আহমেদকে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং তাদের ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা এত অপছন্দ করেন কেন? তাঁদের এত রাগ, অনুরাগ কিংবা বিষাদের কারণই বা কী?
আমার নিজস্ব বিশ্লেষণে এর কয়েকটি কারণ দেখতে পাই।
প্রথমত, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জিয়াউর রহমান একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি একজন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধা। স্বাভাবিক কারণেই সালাহউদ্দিন আহমেদসহ আমরা, যারা বিএনপি করি, তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অন্তরে ধারণ করেই বিএনপি করি।
অথচ যারা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী শক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অন্তরে ধারণ ও লালন করে না, স্বাভাবিক কারণেই তারা ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের অক্ষরে লেখা ১৯৭২ সালের সংবিধানকে পুরোপুরি ফেলে দিতে চায়। কিন্তু আমরা ১৯৭২ সালের সংবিধানকে ধারণ করেই পতিত স্বৈরাচার তার পনেরো বছরের অবৈধ ক্ষমতায়নকে পাকাপোক্ত করার জন্য সংবিধানে যেসব অপ্রয়োজনীয় সংযোজন, বিয়োজন ও সংশোধন করেছিল, সেগুলোর বিরোধিতা করি। ক্ষমতাসীন দলের অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী গোষ্ঠীকে স্বৈরাচারী করে তোলার ক্ষেত্রে সংবিধানকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, সালাহউদ্দিন আহমেদ সেই অনুচ্ছেদগুলো সংশোধন ও পরিবর্তনের কথা বলেন।
১৯৭২ সালের সংবিধান যেহেতু জামায়াত ও এনসিপি মানে না এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাসংগ্রামকে স্বীকৃতি দেয় না, তাই তারা পূর্ববর্তী পুরো সংবিধান বাতিল করে নতুন করে সংবিধান প্রণয়ন করতে চায়। সালাহউদ্দিন আহমেদের সংবিধান সম্পর্কে প্রজ্ঞা, জ্ঞান, গরিমা ও বিচক্ষণতাই তাঁদের সেই বিরোধিতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দ্বিতীয়ত, যেহেতু তাঁরা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করেন এবং জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানকে মুক্তিযুদ্ধের পরিপূরক কিংবা ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসেবে উপস্থাপন করেন, তাই তাঁদের সঙ্গে ১৯৭২ সালের সংবিধান ও তার মূল দর্শন নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। সেই জায়গা থেকেই সালাহউদ্দিন আহমেদের অবস্থানের সঙ্গে তাঁদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে।
তৃতীয়ত, সংবিধান জানতে হলে তাকে পড়তে হয়, বুঝতে হয়, সময় দিতে হয় এবং মস্তিষ্কে ধারণ করতে হয়। রাষ্ট্রের মৌলিক আইন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান, স্মরণশক্তি, বক্তব্য উপস্থাপনের ধরন ও সাংবিধানিক বিষয়ে ধারাবাহিক বিশ্লেষণ—এসব ক্ষেত্রে সালাহউদ্দিন আহমেদের সক্ষমতা তাঁর বক্তব্যকে আলাদা মাত্রা দেয়। যারা এসব বিষয়ে আগ্রহী নন কিংবা সংবিধানের আলোচনায় পর্যাপ্ত সময় দিতে চান না, তাঁদের কাছে এমন উপস্থাপনা স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তিকর মনে হতে পারে।
আরও একটি বিষয় আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জামায়াত, এনসিপি এবং তাঁদের ঘরানার বুদ্ধিজীবী ও কিছু তরুণ নেতার বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমেদের নাম প্রায়ই কটাক্ষ, ব্যঙ্গ বা অপ্রয়োজনীয় উপমার সঙ্গে উচ্চারিত হতে দেখা যায়। এমনকি প্রসঙ্গ থাকুক বা না থাকুক, আলোচনায় তাঁর নাম টেনে আনার প্রবণতাও লক্ষ করা যায়।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ জামায়াতের উচ্চপর্যায়ের নেতৃবৃন্দ যে ভাষায় বক্তব্য রাখেন, অনেকেই ঠিক সেই ভাষাতেই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন। যেমন—রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. দিলারা, সাদিক কাইয়ুম, হাসনাত, সারজিসসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিবিরের নেতৃবৃন্দ।
তাহলে সালাহউদ্দিন আহমেদের করণীয় কী? কথায় আছে, ‘বিড়ালের ওপর রাগ করে মাটিতে ভাত খেয়ো না।’ আবার বলা হয়, ‘স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ায় উপোস করো না, আর নিন্দুকের কথায় লেখাপড়া ছেড়ো না।’
সুতরাং, ব্যক্তিগত কটাক্ষ কিংবা রাজনৈতিক সমালোচনায় বিচলিত না হয়ে তাঁর উচিত নিজের অধ্যয়ন, সাংবিধানিক জ্ঞান, যুক্তিনির্ভর বক্তব্য এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। কারণ, সমালোচনার জবাব সব সময় উচ্চকণ্ঠেই দিতে হয় না; কখনো কখনো জ্ঞান, যুক্তি, অধ্যবসায় ও কাজই সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর হয়ে ওঠে।