সেনাপ্রধান আসলেই আর্মি ইসলামাইজেশন করতে চায় কি না— এই প্রশ্নের উত্তর পাইতে হইলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ৪৯ বছর আগের এক রাতে।
জলপাই রঙের এক আর্মি জিপ দিলকুশা মাজার হয়ে শো শো আওয়াজে বঙ্গভবনে ঢুকবে। তারপর সদ্য ঘোষিত বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল খালেদ মোশাররফ নামবে সেই জিপ থেকে। যিনি বঙ্গবন্ধু খুন হওয়ার পর মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম সেনা অভ্যুত্থানের নায়ক।
তারপর দেখব বঙ্গভবনের দরবার হলে রাতভর চলবে দরকষাকষি। কার হাতে কতটুকু ক্ষমতা— খালেদ তখন এই হিসাব কষছেন নৌ আর বিমানবাহিনী প্রধানের সাথে।
একই রাতে নারায়ণগঞ্জ থেকে একটা সাদা জিপ আসবে। ঢাকার দিকে। ধীরে ধীরে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে ঢুকবে। তারপর ক্রাচে ভর দিয়ে একজন কর্নেল বের হবে। যার নাম— কর্নেল তাহের। সেই সময়ের জাসদ নেতা।
৭ নভেম্বর, ১৯৭৫ সালের এক রাতে আমরা দেখব— সেনাপ্রধান খালেদ মোশাররফ খুন হয়ে যাবে। নিজের সৈনিক আর জুনিয়র অফিসারদের হাতে। মাত্র চার দিনের সেনাপ্রধান।
৭ নভেম্বর নিয়ে ইতিহাসে তিনটা বয়ান আছে।
বিএনপি এটাকে বলে— সিপাহি বিপ্লব। আওয়ামী লীগ বলে— সেনা অফিসার হত্যা দিবস। আর জাসদ বলে— সিপাহি-জনতা বিপ্লব।
বয়ান যেটাই হোক। খালেদ মোশাররফ খুন হওয়ার পেছনে একটা শব্দ ছিল: ভারত।
১৯৭১ সাল থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে দুইটা ধারা। একটা সেকুলার, ভারতপন্থী বলে অভিযুক্ত। আরেকটা প্রো-ইসলামিস্ট, পাকিস্তানপন্থী বলে অভিযুক্ত।
খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধান হওয়ার পর গুজব ছড়ায়। লিফলেট বাইর হয়। বলা হয়— খালেদ আবার দেশকে মুজিবের মতো ভারতের হাতে তুলে দিবে। ইতিহাসের নির্মম পরিহাস— ঠিক সেই সময় খালেদ মোশাররফের মা আর ভাই একটা মিছিল বাইর করে। মুজিব হত্যার বিচার চেয়ে। খালেদের অজান্তেই।
তাহের আর জাসদ এই দৃশ্যটাকে ক্যাশ করে। সৈনিকদের বুঝায়— দেখো, খালেদ মুজিবের লোক। ভারতের লোক।
সেই রাতে সিপাহি বিদ্রোহ হয়। খালেদ মোশাররফ নিহত হয়। মেজর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে ক্যান্টনমেন্ট শান্ত করেন।
এবার আসি ৫ আগস্ট, ২০২৪-এ। ৪৯ বছর পর আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতাচ্যুত হইল। রেখে গেল এক সেনাপ্রধানকে— জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। যিনি শেখ হাসিনার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। তার শাশুড়ি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর চাচাতো বোন। যিনি শেখ হাসিনাকে সেফ এক্সিট দিয়ে ভারতে পাঠায় দিছে।
৫ আগস্টের পর ছবিটা চেনা লাগতেছে?
সেনাবাহিনীর ভেতরের প্রো-ইসলামিস্ট ধারা সংশয়ে পড়ে। গুঞ্জন ওঠে— ওয়াকার আবার আওয়ামী লীগকে ফিরায় আনবে। এই গুঞ্জন সিভিল সোসাইটি থেকেও আসে। পিনাকীর মতো ইউটিউবারদের কাছ থেকে।
২০২৫-এ মিডিয়ায় দাবি ওঠে— এক প্রো-ইসলামিস্ট অফিসার, লে. জেনারেল ফয়জুর রহমান, নাকি ওয়াকারকে সরিয়ে দেওয়ার তৎপরতা চালাচ্ছে। গুঞ্জন থামে না বরং বাড়ত্বেই থাক। সেনাবাহিনীর ভেতরে দুই ধারার টানাপোড়েন চলতে থাকে। পরিস্থিতি সেই ৪৯ বছর আগের রাতের দিকে যাচ্ছিল। ভারত-ট্যাগ। ভেতরের সংশয়। জুনিয়রদের অসন্তোষ। একই প্যাটার্ন।
বর্তমান সেনাপ্রধান ৪৯ বছর আগের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিলেন।
আমরা দেখলাম—
তিনি হজে গেলেন। মে ২০২৬। দাড়ি রাখলেন। জুন ২০২৬-এ নতুন ব্যাটালিয়ন উঠল— ২য় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন। এর চারটা কোম্পানির নাম রাখা হ্চইল চার খলিফার নামে— হযরত আবু বকর, উমর, উসমান, আলী (রা:)। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে এইটা প্রথম।
তারপর ৩ আগস্ট ২০২৬-এ উদ্বোধন করলেন Army International Islamic Institute। কয়েকটা ভাষণে বললেন— সেনাবাহিনীকে ইসলামি মূল্যবোধ ধারণ করতে হবে। সর্বশেষ ভাষণে বললেন, বাংলাদেশকে বেদায়াতমুক্ত করতে হবে।
১৯৭৫ সালে যে সেনাপ্রধানকে "ভারতের লোক" ট্যাগ খেয়ে জীবন দিতে হয়েছিল—
২০২৬ সালে সেই একই ট্যাগের সামনে দাঁড়ানো আরেক সেনাপ্রধান দাড়ি রাখছেন। খলিফাদের নামে কোম্পানি করছেন। বাংলাদেশকে বেদায়াতমুক্ত করার ঘোষণা দিচ্ছেন।
একজন আইনজীবী এবং লেখক হিসেবে আমি বলব— ইতিহাসের প্যাটার্ন কাকতালীয় হয় না। ইতিহাসের এই দুই ডট মিলাইলে বোঝা যায়— বর্তমান সেনাপ্রধান যতটা না মন থেকে আর্মি ইসলামাইজেশন করতেছেন, তার চেয়ে বেশি করতেছেন নিজের জান বাঁচাতে। ভেতরের অভ্যুত্থান ঠেকাতে।
খালেদ মোশাররফ ভারত-ট্যাগ সামলাইতে পারেন নাই। ওয়াকার সেই ভুল করতে চান না। আর্মি ইসলামাইজেশন এখানে বিশ্বাস না। এটা সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি।
----------------------------যারা ফিকশন পড়তে ভালোবাসেন, তাদের জন্য কমেন্টে বাংলা সাহিত্যের প্রথম লিগাল থ্রিলার “অসমাপ্ত জেরা”-র ১ম পর্বের লিংক দেওয়া হইল।-------------------------------------------
— ফেরদৌস হোসেন
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
বিজনেস, ডেটা প্রাইভেসি, ও এআই ল'য়ার।
Ferdows Hossen's Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।
-----------------------------------------------------------------------
যারা ফিকশন পড়তে ভালোবাসেন, তাদের জন্য কমেন্টে বাংলা সাহিত্যের প্রথম লিগাল থ্রিলার “অসমাপ্ত জেরা”-র ১ম পর্বের লিংক দেওয়া হইল।