প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ১১, ২০২৬, ৭:১০ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুন ৩০, ২০২৬, ১০:২৮ পি.এম
আজ স্মরণ করছি বাংলাদেশের রাজনীতির এক নির্ভীক সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম অভিযুক্ত, নির্লোভ বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর ভূপতি ভূষণ চৌধুরী—আমাদের সকলের প্রিয় মানিক চৌধুরীকে।
স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৮ সালে তিনি স্বাধীনতা পদক পান।
স্মরণ-
নির্লোভ এক বিদ্রোহী কন্ঠস্বর
ভূপতি ভূষণ চৌধুরী(মানিক চৌধুরী)
(১৬ ডিসেম্বর ১৯৩০ - ৩০ জুন, ১৯৮০)
----------------------------------------------------
তাঁর ডাক নাম মানিক চৌধুরী। পুরো নাম ভূপতি ভূষণ চৌধুরী। একজন রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযোদ্ধা।
জন্ম ১৯৩০ সালের ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার হাবিলাসন্দ্বীপ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
পিতার নাম ধীরেন্দ্র লাল চৌধুরী এবং মাতার নাম যশোদা বালা চৌধুরী। শহরের পৈতৃক বাড়িতে তাঁর কেটেছে বাল্য ও শৈশবের দিনগুলি।
ছাত্রজীবনে ইংরেজিতে লেটার মার্ক পেয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজে পড়াশোনা করতে যান, সেখানেই যুক্ত হন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে। দেশভাগের পরে ফিরে আসেন চট্টগ্রামে, শুরু করেন ব্যবসা, কিন্তু রাজনীতিই ছিল তাঁর প্রকৃত জীবনের ধারা।
১৯৪৭ সালে তিনি মওলানা ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এসে মুসলিম লীগের বিপরীতে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। আওয়ামী লীগের গোড়াপত্তন থেকেই ছিলেন সংগঠনের অন্যতম সংগঠক। চট্টগ্রামে এম. এ. আজিজ ও জহুর আহমদ চৌধুরীর সঙ্গে মিলেই দলকে সুসংগঠিত করেন।
১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং সেই সূত্রে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে আসেন।
এ সময়ই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তাঁর পরিচয় হয় এবং ক্রমান্বয়ে বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন ও আস্থাভাজন হয়ে উঠেন। তাঁকে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরি কমিটিতে অর্থ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।
৬২’র আন্দোলন সহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল আন্দোলন, বিশেষ করে ছয় দফা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার জন্য তিনি চট্টগ্রামের রাজনীতিতে অন্যতম মুখ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
১৯৬৬ সালের ২০ মে রাতে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইনে ভূপতি ভূষণ চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয় এবং তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িত করে তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়।
কারাগারে তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। ৬৯’র গণঅভ্যুত্থানে তিনি মুক্তি পান কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তা তাঁকে আবারও গ্রেফতার করে।
১৯৭০’র শেষ দিকে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার কাজে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার এক সপ্তাহ পর তাজউদ্দিন আহমদসহ তাঁকে আবারও ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে তাঁর বিরুদ্ধে একটি মিথ্যে মামলা দায়ের করা হয় এবং সামরিক আইনের আওতায় সাজা দেওয়া হয়।
১৯৭৫ এর আগস্ট থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর তিনি জেলে বন্দি জীবন যাপন করেন। বন্দি থাকা অবস্থায় তৎকালীন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান তাঁকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাঁর দলে যোগদানের প্রস্তাব দেন। কিন্তু সমস্ত প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
১৯৮০ সালের ২৯ জুন জেলে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন এই নির্ভীক রাজনৈতিক সংগ্রামী। তাঁর জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে।
ভূপতি ভূষণ চৌধুরী ছিলেন সেই বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি আদর্শ আর সংগ্রামের পথে কখনো পিছু হটেননি।
আজকের দিনে, আমাদের স্মৃতিতে তিনি রয়ে যান এক অনন্য, নির্ভীক, আত্মত্যাগী দেশপ্রেমিক হিসেবে।
শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় স্মরণ..