"কিউবা একটা পাকা আপেল, যা আমেরিকা গিলে খেতে চায়!"
জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিশ্বনেতাদের সামনে যখন এই কথাটা বলা হয়েছিল, তখন পুরো পশ্চিমা বিশ্ব একদম স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কথাগুলো কার ছিলো জানেন? ফিদেল কাস্ত্রোর।
১৯৫৯ সালে ফুলগেনসিও বাতিস্তাকে উৎখাত করে কিউবায় বিপ্লব সফল করেন ফিদেল কাস্ত্রো। এর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিউবার সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে যান কাস্ত্রো।
নিউ ইয়র্কে পৌঁছানোর পর কাস্ত্রো এবং তাঁর প্রতিনিধি দল ম্যানহাটনের 'হোটেল শেলবোর্ন'-এ ওঠেন। কিন্তু হোটেল কর্তৃপক্ষ তাঁদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং নিরাপত্তার অজুহাতে প্রায় ১০,০০০ ডলার অগ্রিম নগদ ক্যাশ ডিপোজিট দাবি করে।
মার্কিন গণমাধ্যমে গু' জব ছড়ানো করা হয় যে কিউবান প্রতিনিধি দল বিলাসবহুল ওই হোটেলের রুমে জ্যান্ত মুরগি নিয়ে এসেছে, মেঝেতেই সেগুলো কে** রান্না করছে এবং হোটেলের আসবাবপত্র নষ্ট করছে।
এই ধরনের ব্যবহারে ক্ষুব্ধ হয়ে কাস্ত্রো জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব দাগ হামারশোল্ডের সাথে দেখা করেন। কাস্ত্রো সাফ জানিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার যদি তাঁদের উপযুক্ত থাকার জায়গা না দেয়, তবে তাঁরা জাতিসংঘের সামনের 'রোজ গার্ডেন' অথবা সেন্ট্রাল পার্কে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করবেন।
এরপর হোটেল শেলবোর্ন ত্যাগ করে কাস্ত্রো সোজা চলে যান ম্যানহাটনের কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত এবং তৎকালীন সামাজিক বৈষম্যের শিকার এলাকা হার্লেমে। সেখানে গিয়ে তিনি সাধারণ 'হোটেল থেরেসা'-তে অবস্থান নেন। কাস্ত্রোর এই পদক্ষেপ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদ ও সামন্তবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক আ' ঘা' ত।

হার্লেমে কাস্ত্রোর আগমন সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উন্মাদনা সৃষ্টি করে। হাজার হাজার মানুষ তাঁকে দেখতে হোটেল থেরেসার সামনে ভিড় জমায়। ঘটনা এখানেই থেমে থাকেনি; কাস্ত্রোর সাথে দেখা করতে নিউ ইয়র্কের অভিজাত এলাকা ছেড়ে একে একে হার্লেমের সেই সাধারণ হোটেলে হাজির হন বিশ্বনেতারা।
সেভিয়েত ইউনিয়নের সর্বোচ্চ নেতা ক্রুশচেভ নিজে হোটেলে গিয়ে কাস্ত্রোকে জড়িয়ে ধরেন, যা তাদের ঐতিহাসিক কূটনৈতিক জোটের সূচনা করে।
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহেরু কাস্ত্রোর সাথে দীর্ঘ বৈঠক করেন।
মিসরের প্রেসিডেন্ট ও জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম রূপকার নাসের কাস্ত্রোর সাথে সাক্ষাৎ করেন।
মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলনের শীর্ষ নেতা ম্যালকম এক্স কাস্ত্রোর কক্ষে গিয়ে দুই ঘণ্টা ধরে আলোচনা করেন।
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার জাতিসংঘের অধিবেশনে আসা লাতিন আমেরিকার সব রাষ্ট্রের প্রধানদের জন্য একটি রাজকীয় মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন। কিন্তু কিউবার প্রেসিডেন্ট ও বিপ্লবী নেতা কাস্ত্রোকে ইচ্ছাকৃতভাবে সেই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
এর জবাবে কাস্ত্রো হোটেল থেরেসার বলরুমে এক ব্যতিক্রমী মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন। তিনি সেই আয়োজনে কোনো ভিআইপি বা কূটনীতিকদের দাওয়াত না দিয়ে হার্লেমের সাধারণ হোটেলকর্মী, বাবুর্চি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং দিনমজুরদের আমন্ত্রণ জানান। তাদের সাথে এক টেবিলে বসে তিনি খাবার খান, যা গণমাধ্যমে বিশাল খবর হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৬০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ফিদেল কাস্ত্রো জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে ওঠেন। সাধারণত জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী একজন বক্তার জন্য ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় বরাদ্দ থাকে। কিন্তু সামরিক পোশাকে পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে কাস্ত্রো ঘড়ির কাঁটা থামিয়ে দেন।
তিনি টানা ৪ ঘণ্টা ২৯ মিনিট (মোট ২৬৯ মিনিট) ভাষণ দেন, যা আজ পর্যন্ত জাতিসংঘের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ ভাষণের বিশ্বরেকর্ড হিসেবে টিকে রয়েছে।
কাস্ত্রো তাঁর ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক পররাষ্ট্রনীতির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি ১৮২৩ সালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কুইন্সি অ্যাডামসের উত্থাপিত "পাকা ফল তত্ত্ব"-এর কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
ওই তত্ত্বে বলা হয়েছিল, স্প্যানিশ সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কিউবা মহাকর্ষের নিয়মে আপনা-আপনি একদিন যুক্তরাষ্ট্রের কোলে খসে পড়বে।
কাস্ত্রো বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, কিউবা কোনো খসে পড়া ফল নয়, বরং এটি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ, যা কারো শোষণের শিকার হবে না।

কাস্ত্রো বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, কিউবা কোনো পরজীবী ফল না যে আমেরিকার ঝুলিতে গিয়ে পড়বে।
স্পেনের হাত থেকে কিউবাকে মুক্ত করার নামে আমেরিকা আসলে ছদ্মবেশে কিউবার সম্পদ লু* ট করতে চেয়েছিল।বাতিস্তার মতো পাপেট স্বৈরাচারী বসিয়ে কিউবাকে আমেরিকার একটা কলোনি বানিয়ে রাখা হয়েছিল।
কাস্ত্রোর এই এক ভাষণ আমেরিকার শত বছরের প্ল্যানিং ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল।
পরে কাস্ত্রো হাসতে হাসতে বলেছিলেন, "আমেরিকা এখনো সেই পাকা আপেলটার আশায় বসে আছে, কিন্তু এই ফল আর কোনোদিন তাদের কোলে পড়বে না।"
ভাষণের শেষভাগে তিনি বিশ্ব শান্তির আহ্বান জানান এবং সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তিগুলোর কারণে বিশ্ব কীভাবে যু*-এর ঝুঁকিতে পড়ছে তা ব্যাখ্যা করেন।
আমেরিকার সেই "পাকা আপেল থিওরি" কিন্তু আজকেও বন্ধ হয়নি। আজও কোনো না কোনো ছদ্মবেশে পরাশক্তিগুলো স্বাধীন দেশগুলোকে গিলে খাওয়ার ধান্দা করে। কিন্তু কাস্ত্রো সেদিন প্রমাণ করেছিলেন যে, ছোট দেশ হলেও যদি মেরুদণ্ড সোজা থাকে, তবে আমেরিকার মতো পরাশক্তিকেও কাঁপিয়ে দেওয়া সম্ভব। আজ যখন আমরা বিশ্ব রাজনীতিতে বড় বড় দেশের দ্বিচারিতা দেখি, তখন মনে হয় কাস্ত্রোর মতো এমন একজন কড়া লিডারের বড় অভাব, যে টেবিল চাপড়ে সাম্রাজ্যবাদীদের মুখোশ সবার সামনে টেনে ছিঁড়ে ফেলতে
Arham Khan's Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।