১৯৫০-এর দশকে এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত পাল্টাচ্ছিল। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের লক্ষ্য নিয়ে তৎকালীন চীনের কমিউনিস্ট নেতৃত্ব নানামুখী কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান রাজনৈতিক নেতারা বেইজিং সফর শুরু করেন। তরুণ ও দূরদর্শী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানও এই ধারার বাইরে ছিলেন না।
ঐতিহাসিক সূত্রগুলো নির্দেশ করে যে, বঙ্গবন্ধু ১৯৫২ সালে প্রথমবার এবং পরবর্তীতে ১৯৫৭ সালে পুনরায় গণপ্রজাতন্ত্রী চীন (People's Republic of China) পরিদর্শন করেন। বিশেষ করে ১৯৫৭ সালের অক্টোবর মাসের সেই সফরে বেইজিংয়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান এবং হেড অব স্টেট মাও সে তুঙের সঙ্গে তাঁর একটি ঐতিহাসিক সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় ঘটে। বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব লেখনী ও সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসচর্চায় এই ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্থান পেয়েছে।
শেখ মুজিবুর রহমানের সফরের বিবরণ ও তাঁর পর্যবেক্ষণ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল একজন রাজনৈতিক ভ্রমণকারী ছিলেন না, ছিলেন এক তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক। তাঁর চীন ভ্রমণের সেই অভিজ্ঞতা ও চীনা শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ও সৌজন্য সাক্ষাতের বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে তাঁর ডায়েরি এবং পরবর্তীতে প্রকাশিত অনন্য গ্রন্থ "আমার দেখা নয়াচীন"-এ।
এই ভ্রমণগুলোতে তিনি অত্যন্ত কাছ থেকে চীনের রূপান্তর দেখছিলেন। বিপ্লব-পরবর্তী চীনের রাজনৈতিক কাঠামো, যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থা থেকে তাদের আর্থ-সামাজিক ঘুরে দাঁড়ানোর প্রয়াস, স্থানীয় প্রশাসনের কার্যপদ্ধতি এবং সাংস্কৃতিক জাগরণ—সবকিছুই তিনি গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেন। তাঁর এই তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক পর্যবেক্ষণগুলো সমকালীন এশীয় রাজনীতির ইতিহাস গবেষকদের জন্য আজ এক অমূল্য প্রাথমিক উৎস (Primary Source) হিসেবে কাজ করছে।
মাও সে তুঙের সঙ্গে সাক্ষাৎ: তথ্যসূত্র ও তার পরিধি
সরকারি নথিপত্র এবং রাজনৈতিক জীবনী গ্রন্থগুলোতে ১৯৫৭ সালের অক্টোবরে মাও সে তুঙের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের সৌজন্য বিনিময়ের বিবরণটি জোরালোভাবে উঠে এসেছে। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ ও বাংলাদেশের ইতিহাস সংকলনগুলো এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটিকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে।
তবে একটি নিখুঁত একাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা প্রয়োজন, এই সাক্ষাতের বিবরণটি মূলত দেশীয় ও আঞ্চলিক উৎসের ওপর নির্ভরশীল। সরাসরি চীনা রাষ্ট্রীয় আর্কাইভ, মাও সে তুঙের নিজস্ব প্রোটোকল রেকর্ড কিংবা বেইজিংয়ের আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক দলিলপত্রের মতো প্রাথমিক উৎসগুলো থেকে এখনো এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ বা উচ্চ-রেজোলিউশনের মূল ছবি ব্যাপকভাবে উন্মোচিত হয়নি। ফলে বর্তমানের অনলাইন বাংলা উৎস ও জীবনীভিত্তিক সংকলনগুলোকে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ‘থার্ড-পার্টি ন্যারেটিভ’ বা মাধ্যমিক উৎস হিসেবে বিবেচনা করা চলে, যা এই ঘটনাটির সত্যতাকে প্রতিষ্ঠিত করে।
এই কূটনৈতিক সাক্ষাতের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব
তৎকালীন বৈশ্বিক কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে একজন উদীয়মান পাকিস্তানি (তথা পূর্ব পাকিস্তানের) তরুণ নেতার চীন সফর এবং স্বয়ং মাও সে তুঙের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না। এটি প্রমাণ করে যে, ১৯৫০-এর দশকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের মার্কিনঘেঁষা নীতি থাকা সত্ত্বেও, পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারাটি চীনের সঙ্গে একটি স্বাধীন ও সমমর্যাদাপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে কতটা আগ্রহী ছিল। এই অঞ্চলের একটি স্বাধীন কণ্ঠস্বর হিসেবে বঙ্গবন্ধুর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রাথমিক ভিত্তি হয়তো তখনই তৈরি হতে শুরু করেছিল।
Mahmudul Hasan Jahid's Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।