ডা. লায়লা পারভীন বানুর জন্ম কুষ্টিয়ার এক সম্ভ্রান্ত প্রগতিশীল মুসলিম পরিবারে। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। তাঁর পিতা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান এবং মাতা আনোয়ারা রহমান। পিতা-মাতার অনুপ্রেরণায় ১৯৬৭ সালে তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন।
কিন্তু ১৯৭১ সাল তাঁর জীবনের গতিপথই বদলে দেয়। যু//দ্ধের ভয়াবহতা, পারিবারিক সংকট এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে শুরু হয় তাঁর কঠিন জীবনসংগ্রাম। যে বয়সে একটি মেয়ের স্বপ্ন দেখার কথা, সে বয়সেই তিনি হাতে তুলে নেন দেশমাতৃকার মুক্তির অঙ্গীকার। পারিপার্শ্বিক নানা দু/র্যোগ মোকাবিলা করে অসীম সাহস বুকে ধারণ করে তিনি যু//দ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।
২৫ মার্চ সারা বাংলায় সশ/স্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলেও রাজশাহী শহর ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু ১৪ এপ্রিল সকালে পা/ক হা/নাদার বা/হিনী নৃ/শংসভাবে হ//ত্যা করে তাঁর বাবা, পুলিশ ইন্সপেক্টর আজিজুর রহমানকে। বাবার সেই নি/র্মম হ//ত্যাকাণ্ড তাঁর জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। সেই ক্ষতই পরিণত হয় প্রতিরো/ধের শক্তিতে।
১৯৭১ সালের জুন মাসের প্রথমদিকে তিনি যু//দ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে চলে যান কলকাতার ঐতিহাসিক ‘গোবরা ক্যাম্পে’। প্রবাসী মুজিবনগর সরকার কর্তৃক অনুমোদিত এই ক্যা/ম্প পরিচালনা করতেন মুক্তিযুদ্ধের আরেক মহীয়সী নারী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। যু//দ্ধ শুরু হওয়ার পর সংগ্রামী নারী যোদ্ধাদের জন্য এই ক্যা/ম্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গোবরা ক্যাম্পে নারীরা অ//স্ত্র চালনা শিখতেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি উদ্যোগে প্রায় ৩০০ তরুণী ও কিশোরী সংগঠক সেখানে অবস্থান করতেন। ক্যাম্পে দেওয়া হতো তিন ধরনের ট্রে/নিং। সিভিল ডিফেন্স, নার্সিং, অ//স্ত্র চালনা ও গে/রিলা আ/ক্রমণ। তবে সে সময় ভারত সরকার নারীদের সরাসরি অ//স্ত্র প্রশিক্ষণের অনুমতি না দেওয়ায় নার্সিং, আত্মরক্ষামূলক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ এবং ফার্স্ট এইড প্রশিক্ষণই শুরু হয়। পাশাপাশি গে/রিলা অ/পারেশনে অংশগ্রহণ, সংবাদ আদান-প্রদান, সাংস্কৃতিক প্রণোদনা, অর্থ, ওষুধ, খাদ্য ও বস্ত্র সংগ্রহ, চিকিৎসা ও সেবাকার্য, খাদ্য ও আশ্রয় প্রদানসহ নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নারীরা মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গোবরা ক্যা/ম্পে স/শস্ত্র প্র/শিক্ষণ নিয়েছিলেন অনেক নারী। জানা যায়, নারী যো/দ্ধাদের জন্য আরও তিনটি ক্যাম্প প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ে। ডা. লায়লা পারভীন বানুও গোবরা ক্যা/ম্পের বিভিন্ন জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন। দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানেই থেকে আহ/ত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করে যান। নিজের পরিবার ও স্বজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু দেশের জন্যই তিনি ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন।
নিজের সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ডা. লায়লা পারভীন বানু বলেছিলেন,
‘১৪ এপ্রিল ১৯৭১ পা/ক বা/হিনীর আ/ক্রমণে আমার বাবাসহ আর একজন ঘটনাস্থলেই মা/রা যান। সন্ধ্যা পর্যন্ত ম/রদে/হ ওখানেই পড়ে থাকে। অফিসের ভেতরে সহকর্মীরা জীবনের ভ/য়ে কেউ এগিয়ে আসতে সা/হস করেনি লা/শ দুটি স/মাহিত করার জন্য। অফিসের বাগানের মধ্যে বাবাসহ অন্যজনের লা//শ দা/ফনের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি কাতর, আকুলতা ও অনুরোধ নিয়ে। কিন্তু কোন ফল হয়নি। নিদারুণ সত্য হলো, সেদিন কেউ এগিয়ে আসেননি। নিরপরাধ বাবার এই নৃ/শংস মৃ//ত্যু আমার ভেতরের রাজনীতি সচেতন মনে প্র/তিশো/ধ ও প্রতিরো/ধের আ/গুন জ্বেলে দেয়। প্রতিজ্ঞা করি দেশকে মুক্ত করার। সেই মুহূর্তেই মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতি নেই।
আমাদের গ্রামের বাড়ি ধর্মদা/হ সীমান্তের খুব কাছে। মাথাভাঙ্গা নদীর পাশে। এই সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য আহ/ত শরণা/র্থী যাতায়াত করে। আমার প্রথম কাজ ছিল এসব শরণা/র্থী শি/বিরে যারা অত্যন্ত অসুস্থ, তাদের চিকিৎসা, খাবার ও পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা। বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে আমাকে। পা/কসে/না দ্বারা ধ/র্ষ/ণের শিকার নারীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ করে তুলি।’
এর মধ্যেই ২ মে পা/কসে/নারা তাঁদের গ্রামে আ/গুন ধরিয়ে দেয়। বাড়ি ফিরে তিনি দেখেন তাঁর দাদার ঝু/ল/ন্ত লাশ। সেই অসহনীয় য/ন্ত্রণা হৃদয়ে ধারণ করে ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে তিনি করিমপুরে চলে যান। নানা সংকট, অব্যবস্থা ও অপ্রতুলতার মধ্যেও বাবা ও দাদাকে হারানোর ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং প্রতিশো/ধের আ/গুনকে শক্তিতে পরিণত করে তিনি দেশ স্বাধীন করার ব্রত গ্রহণ করেন।
একটি পতাকার জন্য ১৯৭১ সালে এ দেশের নারী-পুরুষ, আবালবৃদ্ধবনিতা সম্মিলিতভাবে লড়েছিল। সেই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই অর্জিত হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ডা. লায়লা পারভীন বানু আবারও রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ফিরে নিজের পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। পড়াশোনা শেষ করে সেখানেই লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন এবং পরবর্তীতে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন।
সাভার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মুক্ত পরিবেশ ও নীতি-আদর্শ তাঁকে মুগ্ধ করে। গ্রামের মানুষের সেবা করার মানসিকতা নিয়ে তিনি গণস্বাস্থ্যে যোগ দেন। গণস্বাস্থ্যের পক্ষ থেকে তিনি কয়েকটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও অংশ নেন। ১৯৭৮ সালে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত শীর্ষক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮০ সালে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিদেশে চলে যান। সেখানে দীর্ঘদিন অবস্থান করার পর ১৯৯৪ সালে দেশে ফিরে আসেন।
বাংলাদেশে ফিরে তিনি প্রথমে সিকদার মহিলা মেডিকেলে এনাটমি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি সম্ভবত গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
‘একসময় পিতৃহ/ত্যার বদলা নিতে যু//দ্ধে গিয়েছি, দেশ স্বাধীন হয়েছে আর এখন স্বাধীন বাংলাদেশে স/ন্ত্রা/স ও অ/রাজকতামুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার অঙ্গীকার করেছি।’
সৌজন্যে: বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।