একটা বই খুঁজছিলাম। হঠাৎ করে চোখ গেলো বইয়ের তাকের একেবারে কোনার দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি পুরোনো বই। আর তখনই ধাঁ করে মনে পড়ে গেলো যে আগামীকাল ১৩ অক্টোবর রশীদ ভাইয়ের (সাহিত্যিক রশীদ হায়দার) প্রয়াণ দিবস। সেটা মনে হতেই রশীদ ভাইয়ের প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধা, মমতা আর ভালোবাসা আমার মনের মধ্যে খেলা করতে থাকলো। আমি কেমন যেন চুপ করে থাকলাম - আসলে নিশ্চুপতাও কখনো কখনো সবচেয়ে বাঙ্ময় হয়ে ওঠে।
আশির দশকে ঢাকায় নিত্য দেখা না হ’লেও মাঝে মাঝে দেখা হত রশীদ ভাইয়ের সঙ্গে - বইমেলায়, বাংলা একাডেমীতে, বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে, নিউমার্কেটে। সব জায়গাতেই আড্ডা জমিয়েছি আমরা, কাপের পর কাপ চা উড়ে গেছে, সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়েছে চারপাশ, আমাদের উচ্চহাসিতে সচকিত হতেন অন্যেরা। চোখের সামনে আমাদের বয়স বাড়লো, চুলে পাক ধরল, চুল পড়ল, গুম্ফ শ্বেতশুভ্র হলো, কিন্তু সম্পর্কে চিড় ধরলো না। আমার বাইরে চলে যাওয়া ও বিদেশে দীর্ঘদিন থাকা সত্ত্বেও নয়। যোগাযোগ হত, একে অন্যের খবর পেতাম, খবর নিতাম।
নানান সময়ে রশীদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর বাড়ীতে। নানান কাজ নিয়ে আসতেন তিনি। কাজ শেষে দেদার কথা হয়েছে, আড্ডা হয়েছে, হাসি-ঠাট্টাও হয়েছে। মাঝে মাঝে প্রয়াত বেগম মেহের কবীরও এসে যোগ দিতেন। তাঁদের কাছে রশীদ ভাই আমার এতো প্রশংসা করতেন যে আমি বড়োই কুণ্ঠিত হয়ে পড়তাম। কিন্তু এমনটাই ছিলেন রশীদ ভাই - অন্যের প্রশংসা করতেন দ্বিধাহীন চিত্তে। বড় দরাজ হৃদয় ছিল তাঁর।
কিন্ত আড্ডা সবচেয়ে জমে উঠতো যখন রীনু’পা আর আমি রশীদ ভাইয়ের অফিসে যেতাম বাংলা একাডেমীতে। মাঝে মাঝে রফিক ভাই (কবি মোহাম্মদ রফিকও আসতেন। একবার মনে আছে, জাপানী কোন এক গল্পের অনুবাদ করেছিলেন রীনু’পা। ছাপা হয়েছিল বাংলা একাডেমী পত্রিকায়। সুতরাং ক’দিন পরে আর একটি অনুবাদ নিয়ে রীনু’পা হাজির রশীদ ভাইয়ের অফিসে। সবটা দেখে-শুনে রশীদ ভাই গম্ভীর মুখে জবাব দিলেন, ‘না, ভাই, জাপানী গল্পের অনুবাদ ছাপাতে অসুবিধে আছে’।
‘কেন?’, চোখ-মুখ তীক্ষ্ম করে জিজ্ঞেস করলেন রীনু’পা। ‘আমার অনুবাদ কি খারাপ হয়েছে’? ‘আরে না, না। সমস্যা সেটা নয়’। ব্যস্ত হয়ে পড়েন রশীদ ভাই রীনু’পাকে শান্ত করতে। তারপর মুখটা খুব গম্ভীর করে বলেন, ‘মানে, ক’দিন আগে এক অনুবাদক দু’জন জাপানী সাহিত্যিকের লেখার অনুবাদ নিয়ে এসে হাজির। জাপানী লেখক একজনের নাম ‘তাকিয়োনা মুতেয়াসি’ আর অন্যজন ‘দিবানিশি হাগামুতা’। আমরা হেসে কুটি কুটি। জানি, পুরোটাই ঠাট্টা, তবু এতো ছদ্ম গাম্ভীর্য্যের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য ভাবে রশীদভাই বললেন যে তাঁর রসবোধে আমরা বিমোহিত।
আশির দশকে রশীদ ভাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আরো নিবিড় হলো। পত্রিকা অফিসে, রেডিও- টেলিভিশনে, সভা-সমিতিতে প্রায়ই দেখা হত। এরশাদ-বিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধলে সে দেখা-সাক্ষাতের সংখ্যা ও মাত্রা বেড়ে গেল। সব কিছুর শেষেই জম-জমাট আড্ডা।রশীদ ভাই পাবনায় হায়দার ভ্রাতৃ-পঞ্চমের বেড়ে ওঠার গল্প শোনাতেন। তাঁদের পাঁচ ভাইয়ের নাকি একটি বেগুনী শার্ট ছিল। এক এক বার এক এক জন পরে বেরুতেন। পাবনা শহরের লোক মনে করতো তাঁদের প্রত্যেক ভাইয়ের একটি বেগুনী শার্ট আছে। তাঁর মুখেই প্রথম শুনেছি যে, শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী টিউটোরিয়া খাতায় সই করতেন ‘মু.চৌ.’ বলে, ইংরেজীতে নিজের নাম লিখতেন ‘Munier’ বলে, প্রচলিত ‘Munir’ বলে নয়।
রশীদ ভাই খুব ভক্ত ছিলেন সংবাদ সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত আমার পাক্ষিক লেখা ‘কড়ি-কড়চার’। প্রায় নিয়ম করে প্রতি বৃহস্পতিবারে তিনি আমাকে ফোন করতেন, প্রশংসা করতেন আমার লেখার, টুকটাক আলাপ করতেন নানান বিষয়ে। সংবাদে আড্ডা দিতাম আমি, হাসনাত ভাই ('সংবাদের' প্রবাদপ্রতিম সাহিত্য সম্পাদক প্রয়াত আবুল হাসনাত), বজলু ভাই ('সংবাদ' সম্পাদক প্রয়াত বজলুর রহমান) আর রশীদ ভাই। আড্ডা হত রেডিওতে কবি প্রয়াত আবু তাহের ভাইয়ের অফিসে আশরাফ ভাই ('শব্দসৈনিক' আশরাফুল আলম) সহ। মাঝে মাঝে ঠাট্টা করতেন রশীদ ভাই এই বলে যে ‘এক রশীদ (রশীদ হায়দার) আমার লেখার ভক্ত, আর অন্য রশীদ (রশীদ করিম) আমার বলার ভক্ত’। আমি হেসে ফেলতাম।
মনে আছে, ২০০৩ কিংবা ২০০৪ এর দিকে একদিন রশীদ ভাই ফোন করলেন নিউইয়র্কে। তাঁর একটি ছোট গল্পের ইংরেজী অনুবাদ করে দিতে হবে বিদেশ থেকে প্রকাশিতব্য একটি গল্প সংকলনের জন্যে। রাজী হলাম। ক’দিনের মধ্যেই মূল গল্পের প্রতিচ্ছবি এসে উপস্থিত। পড়ে খুব ভালো লাগলো। করেও দিলাম অনুবাদ। সে অনুবাদ পেয়ে রশীদ ভাই মুগ্ধ - যাকে পান, তাকেই দেখান। পঞ্চমুখে প্রশংসা করেন আমার লেখার। আমি বড়ই কুণ্ঠিত হলাম যখন তিনি ঐ অনুবাদ পড়তে দিলেন অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে।
এই সব যখন ভাবছিলাম, তখন রশীদ ভাইয়ের প্রতি একটি অপরাধবোধও যেন 'জলের মতো ঘুরে ঘুরে' আমার করোটিতে কইছিলো, 'তুমি কথা দিয়েছিলে'। অপরাধীর চোখ নিয়ে তাকের কোনার বইটির দিকে তাকালাম। কেমন যেন ম্রিয়মান হয়ে বইটি সেখানে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে - রশীদ হায়দারের অনন্য উপন্যাস 'খাঁচায়' - মুক্তিযুদ্ধের সময়ে অবরুদ্ধ ঢাকার পটভূমিতে লেখা।
রশীদ ভাই খুব চেয়েছিলেন আমি যেন উপন্যাসটির ইংরেজী অনুবাদ করি। তাঁকে কথাও দিয়েছিলাম। কিন্তু 'কেউ কথা রাখে নি'র মত আমিও কথা রাখি নি। সেটি আজও একটি 'না রাখা প্রতিশ্রুতির' মত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে। না, কাজটি শুরু করতে হবে, সময়ও তো চলে যাচ্ছে। কাল রশীদ ভাইয়ের প্রয়ান দিবসে এই প্রতিশ্রুতি রক্ষাই হবে তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধাতর্পণ।
Selim Jahan's Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।