, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের বিরুদ্ধে মাহিয়া মাহি:আমি একা নইঅনেক নারী ভুক্তভোগী’ ফরিদপুরে বাসচাপায় নিহত ৫, আহত অন্তত ১৫ বাংলাদেশিদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বন্ধের কারণ জানাল যুক্তরাষ্ট্র ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিরোধ না করলে দেশ পাকিস্তান থাকত : স্পিকার মিয়ানমার হয়ে বঙ্গোপসাগর করিডর:কৌশলভারত মহাসাগর নামতে চায় চীন শেখ হাসিনা,কেআসিফ নজরুল:এখনই দেশে ফিরে আসুন’ বিশ্বময় আজ বিশ্বকাপে মেসি ও আর্জেন্টিনা হারিয়ে যাওয়া সম্মান চান সরকারের কাছে পরীমনি একাধিক ছেলের সঙ্গে সম্পর্ককে কেন্দ্র করেহত্যা:বাবা ও মা আসামি নবম পে স্কেল বাস্তবায়নে এক লাখকোটি টাকা দরকার :অর্থের উৎস চাইছে আইএমএফ

মিয়ানমার হয়ে বঙ্গোপসাগর করিডর:কৌশলভারত মহাসাগর নামতে চায় চীন

  • প্রকাশের সময় : ৩ ঘন্টা আগে
  • ৩ পড়া হয়েছে

আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬, ১৩: ০০ 

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংছবি: রয়টার্স

মিয়ানমারের রাখাইন উপকূলে কিয়াউকফিউ নামের ছোট্ট একটি বন্দর। বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলেও এ বন্দর ঘিরেই এখন দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় ভূরাজনৈতিক খেলা চলছে। চীনের কাছে এটি শুধু একটি বন্দর নয়; ভারত মহাসাগরে পৌঁছানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দরজা। আর সে দরজার নাম চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর (সিএমইসি)।

একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে একক আধিপত্য বজায় রাখার লড়াইয়ে ‘কানেক্টিভিটি’ বা যোগাযোগ অবকাঠামো এখন সবচেয়ে বড় কৌশলগত হাতিয়ার। এ দৌড়ে চীনের সবচেয়ে বড় ও উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ হলো ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)। আর এ প্রকল্পের অন্যতম প্রধান ও ভৌগোলিক দিক থেকে সবচেয়ে সংবেদনশীল স্তম্ভ হলো সিএমইসি।

চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে ভারত মহাসাগরের বঙ্গোপসাগর উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত এ করিডর কেবল একটি বাণিজ্যিক রুট নয়, এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার এক মহা পরিকল্পনা।

ভৌগোলিক দিক থেকে সিএমইসির নকশা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং কৌশলগতভাবে বিন্যস্ত। এটি চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ল্যান্ডলকড প্রদেশ ইউনানের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হয়েছে। এরপর মিয়ানমারের সীমান্ত শহর মুসে হয়ে দেশটির অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র মান্দালয়ে প্রবেশ করেছে।

মান্দালয় থেকে এ করিডর প্রধানত দুটি শাখায় বিভক্ত হয়েছে—একটি শাখা গেছে মিয়ানমারের সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক শহর ইয়াঙ্গুনে আর প্রধান কৌশলগত শাখাটি দক্ষিণ-পশ্চিমে অগ্রসর হয়ে রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরে গিয়ে ঠেকেছে।

এ করিডরের মূল উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে—

বহুমাত্রিক পরিবহনব্যবস্থা: উচ্চগতির রেলপথ (যেমন প্রস্তাবিত মুসে-মান্দালয় রেল প্রকল্প) ও আধুনিক মহাসড়ক, যা চীনের ইউনানকে সরাসরি মিয়ানমারের উপকূলের সঙ্গে যুক্ত করবে।

তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এ করিডরের সবচেয়ে বড় বাধা। রাখাইন রাজ্যসহ করিডরটি যেসব অঞ্চলের ওপর দিয়ে গেছে, তার বড় অংশজুড়েই দেশটির জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও জান্তা বাহিনীর মধ্যে তীব্র গৃহযুদ্ধ চলছে।

জ্বালানি পাইপলাইন: কিয়াউকফিউ বন্দর থেকে চীনের ইউনান পর্যন্ত সমান্তরালভাবে দুটি পাইপলাইন (একটি অপরিশোধিত তেল ও একটি প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য) ইতিমধ্যে সচল রয়েছে, যা চীনের মূল ভূখণ্ডে জ্বালানি সরবরাহের পথ সহজ করেছে।

বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল: কিয়াউকফিউ ও সীমান্ত এলাকাগুলোয় শিল্প পার্ক ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন, যেখানে চীনা অর্থায়নে ভারী শিল্প ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে।

চীনের ‘মালাক্কা সংকট’ ও কৌশলগত গুরুত্ব

চীনের জন্য এ করিডরের গুরুত্ব অপরিসীম, যা বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের ‘মালাক্কা সংকটের’ এক টেকসই ভূরাজনৈতিক সমাধান। বর্তমানে চীনের বেশির ভাগ জ্বালানি আমদানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পন্ন হয় দক্ষিণ চীন সাগর ও সংকীর্ণ মালাক্কা প্রণালি হয়ে। যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের সঙ্গে কোনো আন্তর্জাতিক সংঘাত বা উত্তেজনা তৈরি হলে মালাক্কা প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ার তীব্র ঝুঁকিতে থাকে চীন।

সিএমইসি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে চীন সরাসরি ভারত মহাসাগরে প্রবেশের একটি বিকল্প ও নিরাপদ পথ পাবে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে আসা তেলবাহী জাহাজগুলোকে আর মালাক্কা প্রণালি পার হতে হবে না; সেগুলো সরাসরি মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দরে খালাস হয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউনান প্রদেশের কুনমিংয়ে চলে যাবে। এতে যেমন সময় ও পরিবহন খরচ বাঁচবে, তেমনই কমবে নিরাপত্তাঝুঁকি। পাশাপাশি চীনের তুলনামূলক অনুন্নত পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর অর্থনৈতিক বিকাশে এ করিডর মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করবে।

জান্তা সরকারের লাইফলাইন

অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে নানা চাপের মুখে থাকা মিয়ানমারের জান্তা সরকারের জন্য সিএমইসি একটি বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক লাইফলাইন। এ প্রকল্পের মাধ্যমে মিয়ানমারে শত শত কোটি ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ আসতে যাচ্ছে, যা দেশটির ভঙ্গুর অবকাঠামো, বিদ্যুৎ খাত ও পরিবহন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে পারে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কিয়াউকফিউ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে বড় অঙ্কের রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে দেশটির।

বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে চীনের এই একক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইন্দো-প্যাসিফিক মিত্ররা (কোয়াড জোট) গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বেইজিংয়ের এ প্রভাব রুখতে পশ্চিমারা এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে।

তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এ করিডরের সবচেয়ে বড় বাধা। রাখাইন রাজ্যসহ করিডরটি যেসব অঞ্চলের ওপর দিয়ে গেছে, তার বড় অংশজুড়েই দেশটির জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও জান্তা বাহিনীর মধ্যে তীব্র গৃহযুদ্ধ চলছে। এ অস্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রকল্পের কাজের গতিকে ধীর করে দিয়েছে এবং চীনা বিনিয়োগের নিরাপত্তাকে বড় ঝুঁকিতে ফেলেছে।

এ ছাড়া মিয়ানমারের ভেতর এ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে ‘ঋণের ফাঁদ’–এর আশঙ্কা ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের খতিয়ান নিয়ে নাগরিক সমাজে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।

ত্রিপক্ষীয় করিডরের নতুন সমীকরণ

সাম্প্রতিক সময়ে এ অর্থনৈতিক করিডরে যুক্ত হয়েছে এক নতুন ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রা, যা বাংলাদেশের জন্য সরাসরি প্রাসঙ্গিক। গত জুন মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিংয়ে প্রথম সরকারি সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সে বৈঠকে চীনের পক্ষ থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত এ করিডর সম্প্রসারণ বা একটি নতুন ত্রিপক্ষীয় ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর’ (সিএমবিইসি) গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এ প্রস্তাবের পর বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত সতর্ক ও কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ এ প্রস্তাব মূল্যায়ন করছে এবং এখনো কোনো চূড়ান্ত অবস্থান নেয়নি। এ প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো, মিয়ানমার ও চীনের করিডরের সঙ্গে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকে যুক্ত করে একটি বৃহৎ আঞ্চলিক বাণিজ্যিক হাব গড়ে তোলা এবং বহুমাধ্যমভিত্তিক পরিবহনব্যবস্থা জোরদার করা।

বাংলাদেশ যদি এ করিডরে যুক্ত হয়, তবে চীনের ইউনান প্রদেশ ও মিয়ানমারের বাজারে সরাসরি সড়ক ও রেল যোগাযোগের মাধ্যমে প্রবেশাধিকার মিলতে পারে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধিতে ও ট্রানজিট সুবিধায় বড় ভূমিকা রাখবে। তবে মিয়ানমারের বর্তমান অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও রোহিঙ্গা সংকটের মতো অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় ইস্যুগুলো এ করিডরে বাংলাদেশের অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

মিয়ানমারের রাখাইন উপকূলের কিয়াউকফিউ বন্দর চীনের বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেফাইল ছবি: রয়টার্স

বড় শক্তির লড়াই

চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর কেবল দুই বা তিন দেশের অর্থনৈতিক চুক্তি নয়, এটি ভারত মহাসাগর অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তনের এক বড় অনুঘটক হয়ে উঠতে পারে।

এ করিডর এবং বিশেষ করে কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরে চীনের শক্তিশালী উপস্থিতি ভারতকে কৌশলগতভাবে উদ্বেগে ফেলেছে। ভারত এটিকে তার ঘরের কাছে চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ বা ভারতকে ঘিরে ফেলার কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে। এর জবাবে ভারতও মিয়ানমারে ‘কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট’ প্রকল্পের মতো নিজস্ব অবকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে চীনের এই একক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইন্দো-প্যাসিফিক মিত্ররা (কোয়াড জোট) গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বেইজিংয়ের এ প্রভাব রুখতে পশ্চিমারা এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে।

করিডরের বর্তমান চিত্র

বর্তমানে মিয়ানমারের চরম অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার কারণে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ বড় ধরনের স্থবিরতার মুখে পড়েছে। করিডরের কেন্দ্রবিন্দু—কুনমিং থেকে রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইন ও বাণিজ্যপথের একটি বড় অংশ এখন জান্তা সরকারের হাতছাড়া হয়ে আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

বেইজিং নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় দফায় দফায় যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করলেও মাঠপর্যায়ের অস্থিতিশীলতা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থানান্তরের মতো নিরাপত্তা–সংকটের কারণে এই মুহূর্তে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে বড় আকারের নিরাপদ বাণিজ্য পরিচালনা করা চীনের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আছে জটিল কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ

চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক ভূগোলে এক বড় ধরনের রূপান্তর ঘটাচ্ছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক ভূকম্পন সত্ত্বেও চীন এ প্রকল্পের বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশের জন্য এ করিডর যেমন নতুন বাণিজ্যের দুয়ার খুলে দিতে পারে, ঠিক তেমনই এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জটিল কূটনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশ। বেইজিংয়ের এ প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় করিডর আগামী দিনে ভারত মহাসাগর অঞ্চলের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট ও বিবিসি

জনপ্রিয়

সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের বিরুদ্ধে মাহিয়া মাহি:আমি একা নইঅনেক নারী ভুক্তভোগী’

মিয়ানমার হয়ে বঙ্গোপসাগর করিডর:কৌশলভারত মহাসাগর নামতে চায় চীন

প্রকাশের সময় : ৩ ঘন্টা আগে

আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬, ১৩: ০০ 

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংছবি: রয়টার্স

মিয়ানমারের রাখাইন উপকূলে কিয়াউকফিউ নামের ছোট্ট একটি বন্দর। বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলেও এ বন্দর ঘিরেই এখন দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় ভূরাজনৈতিক খেলা চলছে। চীনের কাছে এটি শুধু একটি বন্দর নয়; ভারত মহাসাগরে পৌঁছানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দরজা। আর সে দরজার নাম চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর (সিএমইসি)।

একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে একক আধিপত্য বজায় রাখার লড়াইয়ে ‘কানেক্টিভিটি’ বা যোগাযোগ অবকাঠামো এখন সবচেয়ে বড় কৌশলগত হাতিয়ার। এ দৌড়ে চীনের সবচেয়ে বড় ও উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ হলো ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)। আর এ প্রকল্পের অন্যতম প্রধান ও ভৌগোলিক দিক থেকে সবচেয়ে সংবেদনশীল স্তম্ভ হলো সিএমইসি।

চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে ভারত মহাসাগরের বঙ্গোপসাগর উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত এ করিডর কেবল একটি বাণিজ্যিক রুট নয়, এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার এক মহা পরিকল্পনা।

ভৌগোলিক দিক থেকে সিএমইসির নকশা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং কৌশলগতভাবে বিন্যস্ত। এটি চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ল্যান্ডলকড প্রদেশ ইউনানের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হয়েছে। এরপর মিয়ানমারের সীমান্ত শহর মুসে হয়ে দেশটির অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র মান্দালয়ে প্রবেশ করেছে।

মান্দালয় থেকে এ করিডর প্রধানত দুটি শাখায় বিভক্ত হয়েছে—একটি শাখা গেছে মিয়ানমারের সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক শহর ইয়াঙ্গুনে আর প্রধান কৌশলগত শাখাটি দক্ষিণ-পশ্চিমে অগ্রসর হয়ে রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরে গিয়ে ঠেকেছে।

এ করিডরের মূল উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে—

বহুমাত্রিক পরিবহনব্যবস্থা: উচ্চগতির রেলপথ (যেমন প্রস্তাবিত মুসে-মান্দালয় রেল প্রকল্প) ও আধুনিক মহাসড়ক, যা চীনের ইউনানকে সরাসরি মিয়ানমারের উপকূলের সঙ্গে যুক্ত করবে।

তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এ করিডরের সবচেয়ে বড় বাধা। রাখাইন রাজ্যসহ করিডরটি যেসব অঞ্চলের ওপর দিয়ে গেছে, তার বড় অংশজুড়েই দেশটির জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও জান্তা বাহিনীর মধ্যে তীব্র গৃহযুদ্ধ চলছে।

জ্বালানি পাইপলাইন: কিয়াউকফিউ বন্দর থেকে চীনের ইউনান পর্যন্ত সমান্তরালভাবে দুটি পাইপলাইন (একটি অপরিশোধিত তেল ও একটি প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য) ইতিমধ্যে সচল রয়েছে, যা চীনের মূল ভূখণ্ডে জ্বালানি সরবরাহের পথ সহজ করেছে।

বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল: কিয়াউকফিউ ও সীমান্ত এলাকাগুলোয় শিল্প পার্ক ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন, যেখানে চীনা অর্থায়নে ভারী শিল্প ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে।

চীনের ‘মালাক্কা সংকট’ ও কৌশলগত গুরুত্ব

চীনের জন্য এ করিডরের গুরুত্ব অপরিসীম, যা বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের ‘মালাক্কা সংকটের’ এক টেকসই ভূরাজনৈতিক সমাধান। বর্তমানে চীনের বেশির ভাগ জ্বালানি আমদানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পন্ন হয় দক্ষিণ চীন সাগর ও সংকীর্ণ মালাক্কা প্রণালি হয়ে। যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের সঙ্গে কোনো আন্তর্জাতিক সংঘাত বা উত্তেজনা তৈরি হলে মালাক্কা প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ার তীব্র ঝুঁকিতে থাকে চীন।

সিএমইসি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে চীন সরাসরি ভারত মহাসাগরে প্রবেশের একটি বিকল্প ও নিরাপদ পথ পাবে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে আসা তেলবাহী জাহাজগুলোকে আর মালাক্কা প্রণালি পার হতে হবে না; সেগুলো সরাসরি মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দরে খালাস হয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউনান প্রদেশের কুনমিংয়ে চলে যাবে। এতে যেমন সময় ও পরিবহন খরচ বাঁচবে, তেমনই কমবে নিরাপত্তাঝুঁকি। পাশাপাশি চীনের তুলনামূলক অনুন্নত পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর অর্থনৈতিক বিকাশে এ করিডর মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করবে।

জান্তা সরকারের লাইফলাইন

অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে নানা চাপের মুখে থাকা মিয়ানমারের জান্তা সরকারের জন্য সিএমইসি একটি বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক লাইফলাইন। এ প্রকল্পের মাধ্যমে মিয়ানমারে শত শত কোটি ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ আসতে যাচ্ছে, যা দেশটির ভঙ্গুর অবকাঠামো, বিদ্যুৎ খাত ও পরিবহন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে পারে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কিয়াউকফিউ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে বড় অঙ্কের রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে দেশটির।

বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে চীনের এই একক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইন্দো-প্যাসিফিক মিত্ররা (কোয়াড জোট) গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বেইজিংয়ের এ প্রভাব রুখতে পশ্চিমারা এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে।

তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এ করিডরের সবচেয়ে বড় বাধা। রাখাইন রাজ্যসহ করিডরটি যেসব অঞ্চলের ওপর দিয়ে গেছে, তার বড় অংশজুড়েই দেশটির জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও জান্তা বাহিনীর মধ্যে তীব্র গৃহযুদ্ধ চলছে। এ অস্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রকল্পের কাজের গতিকে ধীর করে দিয়েছে এবং চীনা বিনিয়োগের নিরাপত্তাকে বড় ঝুঁকিতে ফেলেছে।

এ ছাড়া মিয়ানমারের ভেতর এ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে ‘ঋণের ফাঁদ’–এর আশঙ্কা ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের খতিয়ান নিয়ে নাগরিক সমাজে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।

ত্রিপক্ষীয় করিডরের নতুন সমীকরণ

সাম্প্রতিক সময়ে এ অর্থনৈতিক করিডরে যুক্ত হয়েছে এক নতুন ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রা, যা বাংলাদেশের জন্য সরাসরি প্রাসঙ্গিক। গত জুন মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিংয়ে প্রথম সরকারি সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সে বৈঠকে চীনের পক্ষ থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত এ করিডর সম্প্রসারণ বা একটি নতুন ত্রিপক্ষীয় ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর’ (সিএমবিইসি) গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এ প্রস্তাবের পর বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত সতর্ক ও কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ এ প্রস্তাব মূল্যায়ন করছে এবং এখনো কোনো চূড়ান্ত অবস্থান নেয়নি। এ প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো, মিয়ানমার ও চীনের করিডরের সঙ্গে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকে যুক্ত করে একটি বৃহৎ আঞ্চলিক বাণিজ্যিক হাব গড়ে তোলা এবং বহুমাধ্যমভিত্তিক পরিবহনব্যবস্থা জোরদার করা।

বাংলাদেশ যদি এ করিডরে যুক্ত হয়, তবে চীনের ইউনান প্রদেশ ও মিয়ানমারের বাজারে সরাসরি সড়ক ও রেল যোগাযোগের মাধ্যমে প্রবেশাধিকার মিলতে পারে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধিতে ও ট্রানজিট সুবিধায় বড় ভূমিকা রাখবে। তবে মিয়ানমারের বর্তমান অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও রোহিঙ্গা সংকটের মতো অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় ইস্যুগুলো এ করিডরে বাংলাদেশের অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

মিয়ানমারের রাখাইন উপকূলের কিয়াউকফিউ বন্দর চীনের বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেফাইল ছবি: রয়টার্স

বড় শক্তির লড়াই

চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর কেবল দুই বা তিন দেশের অর্থনৈতিক চুক্তি নয়, এটি ভারত মহাসাগর অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তনের এক বড় অনুঘটক হয়ে উঠতে পারে।

এ করিডর এবং বিশেষ করে কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরে চীনের শক্তিশালী উপস্থিতি ভারতকে কৌশলগতভাবে উদ্বেগে ফেলেছে। ভারত এটিকে তার ঘরের কাছে চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ বা ভারতকে ঘিরে ফেলার কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে। এর জবাবে ভারতও মিয়ানমারে ‘কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট’ প্রকল্পের মতো নিজস্ব অবকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে চীনের এই একক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইন্দো-প্যাসিফিক মিত্ররা (কোয়াড জোট) গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বেইজিংয়ের এ প্রভাব রুখতে পশ্চিমারা এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে।

করিডরের বর্তমান চিত্র

বর্তমানে মিয়ানমারের চরম অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার কারণে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ বড় ধরনের স্থবিরতার মুখে পড়েছে। করিডরের কেন্দ্রবিন্দু—কুনমিং থেকে রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইন ও বাণিজ্যপথের একটি বড় অংশ এখন জান্তা সরকারের হাতছাড়া হয়ে আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

বেইজিং নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় দফায় দফায় যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করলেও মাঠপর্যায়ের অস্থিতিশীলতা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থানান্তরের মতো নিরাপত্তা–সংকটের কারণে এই মুহূর্তে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে বড় আকারের নিরাপদ বাণিজ্য পরিচালনা করা চীনের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আছে জটিল কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ

চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক ভূগোলে এক বড় ধরনের রূপান্তর ঘটাচ্ছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক ভূকম্পন সত্ত্বেও চীন এ প্রকল্পের বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশের জন্য এ করিডর যেমন নতুন বাণিজ্যের দুয়ার খুলে দিতে পারে, ঠিক তেমনই এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জটিল কূটনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশ। বেইজিংয়ের এ প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় করিডর আগামী দিনে ভারত মহাসাগর অঞ্চলের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট ও বিবিসি