
আলি শরিয়তির নীতিকথা ও সমালোচনা-
“ডাকসুতে কোন মহিউদ্দিন এবং ব্যাংকের অন্যান্য পরিচালক”
অনেকেই বলবেন দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সমালোচনা করে দলকে বিভাজিত করা হচ্ছে কেন? তাদের উদ্দেশে বলে রাখি- সমালোচনার দুই ধরণ। এক ধরনের সমালোচনা হলো যা সমস্যাকে উসকে দেয় এবং সমস্যাকে অ-সমাধানযোগ্য করে তোলে। আরেক রকমের সমালোচনা হলো- সমস্যা সমাধানের পথ দেখায়। আজকের সমালোচনামূলক লেখাটি অনেক সমস্যা সমাধানের পথ দেখাবে বলে বিশ্বাস করি। ভবিষ্যতের নীতি-নির্ধারণের পাথেয় হিসেবে কাজ করবে এবং যদি আত্মস্থ করেন কেউ, তাহলে তার লুম্পেনীয় দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেবে।
২.
শুরুতেই আওয়ামী লীগ আমলে বিভিন্ন ব্যাংকে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচালকদের নামের তালিকা দিচ্ছি। সোনালী ব্যাংকে সাইমুম সরওয়ার কমল, জান্নাত আরা বেগম হেনরি, অ্যাড. সত্যেন্দ্র নাথ ভক্ত, ফার্মাশিষ্ট সুভাষ সিংহ রায়, আফজাল হোসেন, লুতফর রহমান খান, কে এম জামান রুমেল, মোঃ নজিবুর রহমান, প্রয়াত সেলিমা আহমাদ মেরী, গোপাল চন্দ্র ঘোষ প্রমুখ।
অগ্রণী ব্যাংকে শাহজাদা মহিউদ্দিন, ব্যারিস্টার জাকির আহাম্মদ, শেখর দত্ত, নাগিবুল ইসলাম দীপু, ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সবুর, কে এম মনজুরুল হক লাভলু, খোন্দকার জাহাঙ্গীর কবির, কাশেম হুমায়ুন, মফিজউদ্দিন আহমেদ, মোঃ শাহাদাত হোসেন, শামীম আহসান, মোঃ আলতাফ হোসেন মোল্লা, এবিএম কামরুল ইসলাম, বলরাম পোদ্দার, হাসিনা নেওয়াজ প্রমুখ।
জনতা ব্যাংকে ড. জামাল উদ্দিন আহমেদ এফসিএ, এম কামরুল ইসলাম সিএ, বলরাম পোদ্দার, অজিত কুমার পাল এফসিএ, জিয়াউদ্দিন আহমেদ, রুবীনা আমীন, মেশকাত আহমেদ চৌধুরী, মোহাম্মদ আসাদ উল্লাহ, মোঃ নজিবুর রহমান, মোঃ আবু নাসের প্রমুখ।
বেসিক ব্যাংকের পরিচালক জাহাঙ্গীর আকন্দ সেলিম, হাসান মাহমুদ এফসিএ, রাজীব পারভেজ, এ কে এম রেজাউর রহমান, এ কে এম কামরুল ইসলাম এফসিএ প্রমুখ।
বিডিবিএল ব্যাংকে দেওয়ান নুরুল ইসলাম সিএ, রোজিনা নাছরীন, কাজী মোর্শেদ হোসেন কামাল, সৈয়দ এপতার হোসেন পিয়ার, অ্যাড. আবদুস সালাম, মাহবুবুর রহমান ভুঁইয়া, কাজী শায়রুল হাসান প্রমুখ।
কৃষি ব্যাংকে মশিউর রহমান হুমায়ুন, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকে পঙ্কজ রায় চৌধুরী ও মোঃ মনজুরুল আলম, কর্মসংস্থান ব্যাংকে আবু ছালেহ মু. ফেরদৌস খান, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকে গোলাম সারওরার ও মাহতাব জাবীন এবং গ্রামীণ ব্যাংকে মোঃ জসীম উদ্দিন ও মোঃ সালাহ উদ্দিন প্রমুখ।
বিভিন্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যানদের মধ্যে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু, বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন মহি, রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহমদ আল কবির উল্লেখযোগ্য।
৩.
এখানে যে এতজনের নাম লেখা হলো, এরমধ্যে কয়জনকে চিনেন আপনারা? আমার বিশ্বাস এমন কাউকে পাওয়া যাবে না, যিনি সবাইকে চিনেন। আমি নিজেও সবার সম্পর্কে জানি না। তবে এটা জানি যে, তারা সবাই রাজনৈতিক বিবেচনায় বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালক হয়েছিলেন। কেউ নেতা কোটায়, কেউ আইনজীবী কোটায়, কেউ এক্সপার্ট কোটায়, কেউ আত্মীয় কোটায়, কেউ সাংবাদিক কোটায়। আমি কয়েকজনকে চিনি যারা শুধুই রাজনৈতিক কোটায় নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং ২০০৯ সালের আগে তারা ঢাকা শহরে এক রুমে ৪জনের মেসে থাকতেন। পরে তাদের বিশাল ফ্ল্যাট, বাসা-বাড়ি, গাড়ি, নারী, সবই হয়েছে। খুদার রহমত ও বরকত তো এমন-ই হয়!
সকল রাজনৈতিক দল সবসময়েই ক্ষমতায় গেলে দলীয় ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ নেতাকর্মীদের বিভিন্ন খাতে ও ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ কিংবা পরিচালনা পরিষদের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেয়। এর কারণ হলো- দলীয় নেতাকর্মীরা নিযুক্ত প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করবেন এবং প্রতিষ্ঠানকে গতিশীল করতে বিরাট ভূমিকা রাখবেন। এটাই হলো মূল অভিপ্রায়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় দেখা যায় এই অভিপ্রায়ের উল্টোটা ঘটে। কেউ একটা চেয়ার পেলেই খুঁটি গেড়ে বসে লুটপাটে মত্ত হয়ে যায়। যদিও এসব চুরি-চামারি প্রায় অধরা থেকে যায়। কিন্তু চাইলেই কি সবকিছু ঢেকে রাখা যায়? নাহ, তা যায় না। তাদের জীবনাচারের প্রতি খেয়াল করলেই স্পষ্ট হয় যে, কি পরিমাণ টাকার মালিক হয়েছেন তাঁরা, যা নিঃসন্দেহে অন্যায় ও অবৈধভাবেই হয়ে থাকেন।
৪.
উল্লেখিত নামগুলোর মধ্যে সবাইকে যেহেতু চিনি না, জানি না; তাই কয়েকজনকে নিয়ে আলোচনা করা যাক।
আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় মুখ হলেন সুভাষ সিংহ রায়, সাইমুম সরওয়ার কমল, জান্নাত আরা বেগম হেনরি, কে এম জামান রুমেল, প্রয়াত সেলিমা আহমাদ মেরী, শাহজাদা মহিউদ্দিন, ব্যারিস্টার জাকির আহাম্মদ, শেখর দত্ত, নাগিবুল ইসলাম দীপু, ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সবুর, কে এম মনজুরুল আলম লাভলু, কাশেম হুমায়ুন, বলরাম পোদ্দার, রাজীব পারভেজ, রোজিনা নাছরীন, কাজী মোর্শেদ হোসেন কামাল (ক্যামেরা কামাল), মাহবুবুর রহমান ভুঁইয়া, বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন মহি, রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহমদ আল কবির উল্লেখযোগ্য।
এদের মধ্যে পরবর্তীতে কক্সবাজারের সাইমুম সরওয়ার কমল, সিরাজগঞ্জের জান্নাত আরা বেগম হেনরি, সদ্যপ্রয়াত কুমিল্লার সেলিমা আহমাদ মেরী, কুমিল্লার ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সবুর প্রমুখ সংসদ সদস্যও হয়েছেন। ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সবুর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক। সদ্যপ্রয়াত কুমিল্লার সেলিমা আহমাদ মেরী, এমনিতেই বড় ব্যবসায়ী ছিলেন, নিটোল-নিলয় গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান, নারী উদ্যোক্তা হিসেবেও দেশের খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব ছিলেন। অন্যরা?
কৃষি ব্যাংকের সাবেক পরিচালক কৃষিবিদ মশিউর রহমান হুমায়ুন পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীও ছিলেন। অর্থাৎ, ১৬ বছরই তিনি ক্ষমতার ভেতরে ছিলেন। তার নামে কুখ্যাতি আছে যে, জীবনে কারও উপকার করেননি এবং বাসায় গেলে পচা মিষ্টি খাইয়ে আপ্যায়ন করেন। ঠিকাদার হিসেবেও তিনি বড় ব্যবসায়ীতে পরিণত হয়েছিলেন শুধুমাত্র দলের ক্ষমতায়নে এবং এত টাকার মালিক হয়েও এখন কোন নির্যাতিত কর্মীকে একটি পয়সা দিয়েও সহায়তা করেন না।
বর্তমানে হারিয়ে যাওয়া একজন টকশোজীবী, লেখক, কলামিস্ট, ফার্মাসিস্ট সুভাষ সিংহ রায় এখন প্রায় অতীত হয়ে গেছেন। সোনালী ব্যাংকে তিনি সহ সাইমুম সরওয়ার কমল, জান্নাত আরা বেগম হেনরি এবং কাশেম হুমায়ুন পরিচালক থাকাবস্থায় ব্যাংকটি বড় কয়েকটি দুর্নীতির মধ্যে নিমজ্জিত হয়। এই দায়ভার তারা কিভাবে এড়াতে পেরেছেন তা এক রহস্য। সুভাষ সিংহ রায় টকশোতে কথা বললেই আওয়ামী লীগের ভোট কমতো। সুভাষ সিংহ রায় টকশোতে কথা বললেই রবীন্দ্রনাথের ভক্তরা রাগে গমগম করতো, কারণ সুভাষের রবীন্দ্রপ্রেমের উম্মততায় তুমুল রবীন্দ্রপ্রেমীরাও লজ্জা পেতেন। তার ভাবখানা এমন যে, তিনি বিরাট জ্ঞানী, পণ্ডিত ইত্যাদি। আদতে লেখাচোর। আরেকজনের বই নিজের নামে প্রকাশ করার মতো ঘোরতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অঢেল টাকার মালিক সুভাষ বাবু জীবনে কাউকে এক কাপ চা খাইয়েছে এমন দৃষ্টান্ত পাওয়া কঠিন।
সাংবাদিক কাশেম হুমায়ূন, মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি থেকে পরে দৈনিক সংবাদের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ছিলেন। প্রায় ১৬ বছরই তিনি বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু কি অবদান রেখেছেন তা খুদা মালুম।
কে এম জামান রুমেল একজন ব্যবসায়ী, তার পিতা প্রয়াত এমপি ও সচিব খন্দকার আসাদুজ্জামান, রুমেলের বোনও এমপি হয়েছিলেন। ব্যবসায়ী নাগিবুল ইসলাম দীপুও দলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন। তথাকথিত উদ্যোক্তা পটুয়াখালীর রাজীব পারভেজ, তিনি কোথায় কি ব্যবসা করেছেন এবং কবে ছাত্ররাজনীতি করেছেন তা কেউ না জানলেও দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের অর্থ ও পরিকল্পনা উপকমিটির সদস্য।
নরসিংদীর আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবুর রহমান ভুঁইয়া, তিনিও একাধিক মেয়াদে বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন। যুবলীগ নেতা মহিউদ্দিন মহি ছিলেন বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান। অপর যুবলীগ নেতা রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহমদ আল কবির হলেন প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ভাগ্নিজামাই অথবা ভাগ্নে। ছাত্রলীগের সাবেক নেতা কে এম মনজুরুল আলম লাভলু, ফুলে ফেঁপে মোটা হলেও রাজপথের রাজনীতি ছেড়েছেন ১৯৯২ সালে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কুয়েত মৈত্রী হল ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এবং একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা রোজিনা নাছরীন দলের ক্ষমতায়নে চাকরি ছেড়ে পুনরায় রাজনীতি শুরু করেন এবং ব্যাংকের পরিচালকের পদ ভাগিয়ে নিয়ে এখন লাপাত্তা।
ছাত্রলীগের সাবেক নেতা বলরাম পোদ্দার, শাহজাদা মহিউদ্দিন; দুজন বন্ধু এবং দুজনই একসাথে একাধিক ব্যাংকের পরিচালকের পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ৫ আগস্টের পরে বলরাম পোদ্দার কারাগারে নিক্ষিপ্ত হলেও শাহজাদা মহিউদ্দিন ৫ আগস্ট বিকালেই দুবাইয়ের বিমান ধরেন। কিন্তু বেচারার কপাল মন্দ! ধানমন্ডি সাতাশ নম্বরে মবের খপ্পরে পড়ে পাসপোর্ট হাতছাড়া হয়ে যায়। বিনিময়ে নগদ ৫০ লক্ষ টাকা দিয়ে পাসপোর্ট ফেরত পান এবং যথাসময়ে বিমানে আরোহণ করে পালিয়ে যান। এখন ইউরোপ-আমেরিকা ঘুরে বেড়ান আর প্রতিদিন নাকি নেত্রীকে ফোন করে বলেন যে, চট্টগ্রামের সকল মিছিলের সংগঠক, উদ্যোক্তা এবং পৃষ্ঠপোষক তিনি। চইঙ্গা রোগে আক্রান্ত, অর্থাৎ সমকামী শাহজাদা মহিউদ্দিন ১৯৯০ সালে ডাকসুতে আলম-কামরুল প্যানেলে সদস্য পদে নির্বাচন করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে লেখা হয়েছিল ডাকসুতে কোন মহিউদ্দিন, শাহজাদা মহিউদ্দিন। এই স্লোগানের প্রচারণায় ভালোই সাড়া ফেলেছিল, কিন্তু ভোটের বাক্স ফাঁকা। আমি ভোটও দিয়েছিলাম, কিন্তু বেচারা সর্বনিম্ন সংখ্যক ভোট পেয়ে পেছনের দিকে প্রথম হয়েছিলেন। জীবনে কোনোদিন কাউকে এক কাপ চা খাওয়ানোর নজির নেই, কিন্তু হয়েছিলেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি। এরকম অদক্ষ, লুটেরা, চরিত্রহীন, কর্মীহীন ব্যক্তিরা যখন কোন দলের বড় নেতা হয়ে যান, তখনই দলটির ইমেজ সংকট হতে শুরু করে।
বলরাম পোদ্দার একদা বরিশালে বাকশাল ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। ১৯৯২ সালে ছাত্রলীগে যোগ দিয়ে বিএম কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই জিএস পদের বদৌলতে ১৯৯৮ সাল থেকে দুই মেয়াদে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তার পুঁজি হলো টাকা, অর্থাৎ সবাইকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে ফেলেন। সাংবাদিকদেরকে টাকা দিয়ে অবস্থা এমন করেছিলেন যে, তিনি বরিশালের কোন প্রোগ্রামে ভাষণ দিয়েছেন তা টিভি-পত্রিকার নিউজে প্রচার-প্রকাশ হয়েছে। এদিকে একই সময়ে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ছাত্রলীগের সমাবেশে তিনি উপস্থিত নেই, তাতে কী? পত্রপত্রিকায় ঠিকই তার নাম ছাপা হয়ে যেতো। এই তথ্য শুনে হাসবো নাকি কাঁদবো তা বুঝতে পারছি না।
শেষকথাঃ এখানে সকলের নাম নেই। পাইনি, তাই উল্লেখ করিনি। এজন্য কেউ মন খারাপ করবেন না।




















