
মুক্তি সারথী’s Post
অনলাইন ,শুক্রবার০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভবনটির নাম ডালিম হোটেল। এর মালিক চন্দ্রমোহন নাথ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সপরিবারে বাড়ি ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমান। তখন সেখানে আস্তানা গড়েন মীর কাসেমের আল বদর বাহিনী।
মীর কাসেম ১৯৭১ সালে ছিলেন ইসলামী ছাত্র সংঘের চট্টগ্রাম শহর শাখার সভাপতি। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন কুখ্যাত গুপ্তঘাতক আলবদর বাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান। সেসময়কার পত্রিকায় চোখ বুলালে তার অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
১৯৭১ সালের ২ আগষ্ট চট্টগ্রামের মুসলিম ইনস্টিটিউটে এক ছাত্রসংঘের সমাবেশে মীর কাশেম ঘোষণা দেয়, “গ্রাম গঞ্জের প্রতিটি এলাকায় এলাকায় খুঁজে খুঁজে শত্রুর শেষ চিহ্নটুকু মুছে ফেলতে হবে।”
১৯৭১ এর ৪ ডিসেম্বর মীর কাসেম এবং আলী আহসান মুজাহিদ এক যৌথ বিবৃতিতে জানান,”৬৫ এর সালের মতন ইস্পাতকঠিন শপথ নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করা হবে।”
৭১ এর ১৪ নভেম্বর বদর দিবস উপলক্ষে বায়তুল মোকাররমের সমাবেশে মীর কাসেম বলেন, “শেষ বিন্দু দিয়ে হলেও দেশের ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখিবো।”
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার ‘ব্যাপক পারফরম্যান্স’ এর পুরষ্কার হিসেবে ৭ নভেম্বর তাকে পদোন্নতি দিয়ে পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের প্রাদেশিক কার্যকরী পরিষদের সদস্য এবং পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সাধারণ সম্পাদক করা হয়। সে সময় সংগঠনের সভাপতি ছিলেন যু*দ্ধা*পরাধী আরেক জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ।
তা কি ছিল সেই ব্যাপক পারফরম্যান্স?
মীর কাসেমের নেতৃত্বে সেই ডালিম হোটেলে স্থাপিত হয় আলবদর বাহিনীর টর্চার সেল। একাত্তরে এই ডালিম হোটেল চট্টগ্রামের মানুষের কাছে পরিচিতি পায় ‘হ*ত্যাপুরী’ হিসেবে। আর নৃ*শংসতার জন্য মীর কাসেম পরিচিতি পায় ‘বাঙালি খান’ হিসেবে।
৭১ সালে পবিত্র ঈদুল ফিতরের পরদিন মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে আটক করে আলবদর সদস্যরা। ২৮ নভেম্বর মীর কাসেমের নির্দেশে আলবদর সদস্যদের নির্মম অ*ত্যাচারে জসিম শহীদ হন। পরে শহীদ আরও পাঁচজনের সঙ্গে জসিমের ম*রদেহ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
নভেম্বরে হাজারী লেন থেকে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, রঞ্জিত দাস ও টুন্টু সেনকে আটক করে মীর কাসেমের নেতৃত্বাধীন আলবদর সদস্যরা। ওই সময় হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ হাজারী লেনের ২৫০ থেকে ৩০০ ঘরে আগুন দেওয়া হয়। রঞ্জিত ও টুন্টুকে ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতন ও পরে হ*ত্যা করা হয়। জাহাঙ্গীর আলম বিজয়ের পর ডালিম হোটেল থেকে আ*হ*ত অবস্থায় উদ্ধার হন। বেচে ফিরে আসা জাহাঙ্গীর আলম জানান অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়ে খাবার পানি চাইলে তাকে প্রসাব দেয়া হয়৷
একই অভিযোগ বেচে আসা আরেক মুক্তিযোদ্ধা সাইফুদ্দিন খানের৷ তিনি জানান প্রতিদিন ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘন্টা মেঝেতে ফেলে পেটানো হতো। এসময় সাইফুদ্দিন কয়েকবার রাজাকারদের কাছে এক গ্লাস পানি চাইলে নরপশুরা তার মুখের ওপর প্রস্রাব করে দিয়েছিল। এরপর থেকে আর কোনদিন তিনি নির্যাতনের সময় রাজাকারদের কাছে পানি খেতে চাননি।
ডালিম হোটেলে কি পরিমাণ ভয়াবহতা চলতো তার সাক্ষী হয়ে আছে এলাকাবাসীও। পাশের বাড়ির অমিতাভ সেন জানান, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলাম। ওই ভবন থেকে প্রতি রাতে আর্তচিৎকার শোনা যেত। মুক্তিযুদ্ধের পর অনেক দিন পর্যন্ত ভয়ে ওই ভবনে কেউ ঢোকেনি।’
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ডা মাহফুজুর রহমান কয়েকজন বেঁচে ফিরে আসা ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য নিয়েছেন। তারা জানান মীর কাসেম যখনই ক্যাম্পে আসতো তাকে ‘কমান্ডার’ বলে সম্বোধন করতো।
আজ জামাত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা দিনভর মীর কাশেমের নামের সাথে ‘শহীদ’ লাগিয়ে তাকে মহান বানিয়ে স্মরণ করেছে। তা তারা করতেই পারে। তাদের আদর্শিক গুরুর ‘মৃ*ত্যু’কে তারা স্মরণ করতেই পারে৷ ৩০ লাখ শহীদের এই ভূমিতে দাড়িয়ে এই ধৃষ্টতা দেখানোর বৈধতা তাদেরকে ‘৫ আগষ্ট’ এনে দিয়েছে৷ এটা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র সমস্যা নাই৷ কিন্তু আমার সমস্যা অন্যখানে৷ ৭১ এ বদর কমান্ডার মীর কাসেমের ‘ফাঁ*সি দিবস’কে ‘শহিদী মৃ*ত্যু’ হিসেবে পালন করার পরেও, ঠিক কোন মুখে এরা দাবি করতে পারে “৭১ এর জাশি আর ২৪ পরবর্তী জাশি এক নয়”? এদের কি নুন্যতম লাজ-শরম নাই?
০৩/০৯/২০২৬
মুক্তি সারথী’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















