
অনলাইন রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
হাইকোর্টের প্রথম ভারতীয় ব্যারিস্টার ও জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম মুসলিম সভাপতি — বদরুদ্দীন তৈয়বজী
বদরুদ্দীন তৈয়বজী
(১০ অক্টোবর, ১৮৪৪ – ১৯ আগস্ট, ১৯০৬)
————————————————-
ভারতের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ রয়েছেন, যাঁরা শুধু নিজেদের কর্মক্ষেত্রেই কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেননি, বরং ধর্মীয় বিভাজন অতিক্রম করে জাতীয় ঐক্য, আধুনিক শিক্ষা, নারীস্বাধীনতা এবং সামাজিক সংস্কারের পথও দেখিয়েছেন। বদরুদ্দীন তৈয়বজী ছিলেন তেমনই এক দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের প্রখ্যাত আইনজীবী, বিচারপতি, সমাজসংস্কারক এবং জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক নেতা।
আজ তাঁর জন্মদিনে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এই অসামান্য মানুষটিকে, যিনি বিশ্বাস করতেন—ভারতের মানুষের স্বার্থ ও ভবিষ্যৎকে ধর্মীয় পরিচয়ের সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখা যায় না।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
১৮৪৪ সালের ১০ অক্টোবর তৎকালীন বোম্বাই, অধুনা মুম্বাইয়ে একটি সচ্ছল সুলাইমানি বোহরা মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বদরুদ্দীন তৈয়বজী। তাঁর পিতা মোল্লা তৈয়ব আলি ভাই মিয়াঁ সন্তানদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহী ছিলেন।
প্রাথমিক শিক্ষার পর বদরুদ্দীন বোম্বাইয়ের এলফিনস্টোন ইনস্টিটিউশনে পড়াশোনা করেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে, ১৮৬০ সালে, তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে যান। সেখানে নিউবেরি পার্কের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন। পরে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় ও মিডল টেম্পলে আইনশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হন।
চোখের সমস্যার কারণে ১৮৬৪ সালে তাঁকে ভারতে ফিরে আসতে হয়। তবে তাঁর আইনশিক্ষা থেমে থাকেনি। ১৮৬৭ সালে তিনি ব্যারিস্টার হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন এবং বোম্বাইয়ে আইন পেশায় যোগ দেন।
আইনজগতে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ
ঔপনিবেশিক ভারতে উচ্চ আদালতের আইন পেশায় ইউরোপীয়দের প্রাধান্য ছিল। সেই সময় বদরুদ্দীন তৈয়বজী বোম্বাই হাইকোর্টের মূল বিচারিক ক্ষেত্রে (Original Side) আইনচর্চা শুরু করে এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি ছিলেন বোম্বাই হাইকোর্টে ওই ক্ষেত্রে আইনচর্চা করা প্রথম ভারতীয় ব্যারিস্টার।
তাঁর মেধা, যুক্তিবোধ, সাহস এবং আইনের প্রতি নিষ্ঠা তাঁকে অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত করে।
১৮৯৫ সালে তিনি বোম্বাই হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হন। তিনি ছিলেন এই আদালতের প্রথম মুসলিম এবং তৃতীয় ভারতীয় বিচারপতি।
১৯০২ সালে তিনি বোম্বাই হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় একজন ভারতীয়ের পক্ষে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়া ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
বিচারপতি হিসেবে তিনি স্বাধীন বিচারবোধ ও নিরপেক্ষতার জন্য পরিচিত ছিলেন। আইন ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তাঁর দৃঢ় অবস্থান তাঁকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছিল।
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম মুসলিম সভাপতি
বদরুদ্দীন তৈয়বজীর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা।
১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। তৈয়বজী ছিলেন এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রথম যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও সংগঠক। তাঁর বড় ভাই কামরুদ্দীন তৈয়বজীও জনজীবনে সক্রিয় ছিলেন এবং কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
১৮৮৭ সালে মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের তৃতীয় অধিবেশনে বদরুদ্দীন তৈয়বজী সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনিই ছিলেন কংগ্রেসের প্রথম মুসলিম সভাপতি।
তাঁর এই দায়িত্ব গ্রহণ কেবল ব্যক্তিগত সম্মানের বিষয় ছিল না; এটি ছিল জাতীয় রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে সম্মিলিত অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
সেই সময় বহু মুসলিম নেতা কংগ্রেসের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। স্যার সৈয়দ আহমদ খান তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি মনে করতেন, কংগ্রেসের রাজনৈতিক কর্মসূচি মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষা করতে পারবে না।
কিন্তু বদরুদ্দীন তৈয়বজী ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ভারতীয়দের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার জন্য বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি মুসলিম সমাজের শিক্ষা ও উন্নতির পক্ষে যেমন সোচ্চার ছিলেন, তেমনই বৃহত্তর ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।
তাঁর কাছে মুসলিম সমাজের উন্নয়ন এবং ভারতের সামগ্রিক অগ্রগতি পরস্পরবিরোধী ছিল না।
আঞ্জুমান-ই-ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও আধুনিক শিক্ষার প্রসার
বদরুদ্দীন তৈয়বজী উপলব্ধি করেছিলেন, শিক্ষার প্রসার ছাড়া কোনও সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
১৮৭৬ সালে তিনি তাঁর ভাই কামরুদ্দীনের সঙ্গে বোম্বাইয়ে আঞ্জুমান-ই-ইসলাম প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে আধুনিক শিক্ষার বিস্তার এবং সামাজিক উন্নয়ন।
তিনি মনে করতেন, কেবল রাজনৈতিক অধিকার অর্জন করলেই চলবে না; সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত ও সচেতন করে তোলাও জরুরি। বিশেষত মুসলিম সমাজে আধুনিক শিক্ষার প্রসারকে তিনি সময়ের দাবি হিসেবে দেখেছিলেন।
শিক্ষাকে তিনি সামাজিক অগ্রগতি, আত্মমর্যাদা ও ক্ষমতায়নের অন্যতম প্রধান মাধ্যম বলে মনে করতেন।
নারীশিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারে অগ্রণী ভূমিকা
বদরুদ্দীন তৈয়বজীর চিন্তাভাবনার সবচেয়ে প্রগতিশীল দিকগুলির একটি ছিল নারীশিক্ষার প্রতি তাঁর সমর্থন।
যে সময়ে ভারতীয় সমাজের বহু অংশে নারীদের শিক্ষার সুযোগ সীমিত ছিল, সেই সময় তিনি নিজের পরিবারের মেয়েদের শিক্ষিত করে তোলার উদ্যোগ নেন। তাঁর কন্যাদের উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়; তাঁদের মধ্যে একজন ইংল্যান্ডেও পড়াশোনা করেন।
তিনি পর্দাপ্রথার কঠোর সামাজিক বাধ্যবাধকতার বিরোধিতা করেছিলেন এবং নিজের পরিবারেও এই প্রথা পরিত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
১৮৯১ সালের এজ অব কনসেন্ট বিল বা সম্মতির বয়সসংক্রান্ত আইনকে তিনি সমর্থন করেছিলেন। এই অবস্থান তাঁর সমাজসংস্কারমূলক চিন্তারই পরিচায়ক।
তাঁর কাছে শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কার ছিল কোনও একটি সম্প্রদায়ের একক বিষয় নয়; এগুলি ছিল সমগ্র সমাজের অগ্রগতির অপরিহার্য শর্ত।
জনজীবন ও প্রশাসনিক ভূমিকা
বদরুদ্দীন তৈয়বজীর কর্মজীবন শুধু আদালত কিংবা কংগ্রেসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
তিনি বোম্বাইয়ের পৌর প্রশাসনে সক্রিয় ছিলেন এবং ১৮৮২ সালে বোম্বাই আইন পরিষদের সদস্য হন। নাগরিক অধিকার, প্রশাসনিক সংস্কার, শিক্ষা এবং ভারতীয়দের জনজীবনে অংশগ্রহণের মতো বিষয়েও তাঁর আগ্রহ ছিল।
বোম্বাইয়ের জনজীবনে ফিরোজশাহ মেহতা ও কাশীনাথ তেলাংয়ের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাঁকে এক সারিতে গণ্য করা হতো। এই তিনজন তাঁদের সময়ে বোম্বাইয়ের নাগরিক ও রাজনৈতিক জীবনে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।
তাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন দিক থেকে বোঝা যায়, তিনি শুধু একজন সফল আইনজীবী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় জননেতা, যিনি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং সমাজকে সংগঠিত করার গুরুত্ব বুঝতেন।
জীবনের শেষ অধ্যায়
দীর্ঘ কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে ১৯০৬ সালের ১৯ আগস্ট। ইংল্যান্ডের লন্ডনে তাঁর মৃত্যু হয়।
কিন্তু তাঁর জীবনাদর্শ ও অবদান ভারতীয় ইতিহাসে আজও স্মরণীয়। আইনজগতে ভারতীয়দের অগ্রযাত্রা, জাতীয় কংগ্রেসে মুসলিমদের অংশগ্রহণ, আধুনিক শিক্ষার প্রসার এবং নারীশিক্ষার সমর্থনে তাঁর ভূমিকা তাঁকে ঊনবিংশ শতকের ভারতের এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বদরুদ্দীন তৈয়বজীকে স্মরণ করার তাৎপর্য
আজকের দিনে বদরুদ্দীন তৈয়বজীর জীবন থেকে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাই—
বদরুদ্দীন তৈয়বজী এমন এক সময়ে এই আদর্শগুলির পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, যখন ঔপনিবেশিক শাসন, সামাজিক রক্ষণশীলতা এবং সম্প্রদায়গত দূরত্ব ভারতীয় সমাজের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
তিনি তাঁর কর্মের মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন, নিজের সম্প্রদায়ের উন্নয়নের জন্য কাজ করা এবং বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের পক্ষে দাঁড়ানো—দুটি একসঙ্গেই সম্ভব।
ভারতীয় ইতিহাসের এই পথিকৃৎ আইনজীবী, সমাজসংস্কারক ও জাতীয়তাবাদী নেতা বদরুদ্দীন তৈয়বজীর জন্মদিনে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণাম।
তাঁর জীবন ও আদর্শ আগামী প্রজন্মকে শিক্ষা, মানবিকতা, ন্যায়বিচার এবং সম্প্রীতির পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করুক।
Manik Biswas’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।




















