
অনলাইন মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
কত কিছুই তো বলতে ইচ্ছে করে। কত কিছু লিখতে মন চায়। অথচ বলা হয়ে ওঠে না, লেখাও হয় না। কিছু কথা ভাষা খুঁজে পায় না, আর কিছু কথা ভাষা পেলেও প্রকাশের সাহস পায় না। কখনো কখনো মনে হয়, মানুষের জীবনের সবচেয়ে গভীর কথাগুলোই বোধহয় সবচেয়ে বেশি অব্যক্ত থেকে যায়।
কাছের মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সবচেয়ে বড় বিপত্তি সম্ভবত এখানেই। যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি যদি সত্যিই আপনার কাছের মানুষ হন, তাহলে সেই অভিযোগের দায়ও শেষ পর্যন্ত আপনার নিজের কাঁধেই এসে পড়ে। কারণ, ভালোবাসার এক অদ্ভুত দায় আছে। যাকে ভালোবাসা যায়, তাকে সহজে বিদ্রূপ করা যায় না, জনসমক্ষে ছোট করা যায় না, তার সমস্ত অন্যায়ের হিসাবও নির্বিকারভাবে মেলে ধরা যায় না। অথচ সেই মানুষটির কাছেই নিজের আঘাতের কথা বলা কখনো কখনো সবচেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে। ফলে মানুষ এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে আটকে যায়—যে তাকে আঘাত করেছে, তাকেই সে আঘাতের অভিযোগ থেকে রক্ষা করতে চায়।
ভালোবাসার এই পরস্পরবিরোধিতার চেয়ে নির্মম আর কী হতে পারে!
আমরা জীবনের বিভিন্ন সময়ে কত কিছু নিয়েই না আক্ষেপ করি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, দীর্ঘদিনের অবহেলা, অসম্মান, অন্যায় কিংবা অসহনীয় আচরণও একসময় মানুষের অভ্যাস হয়ে উঠতে পারে? মানুষ শুধু একটি সম্পর্কের সঙ্গে অভ্যস্ত হয় না, সেই সম্পর্কের ভেতরে নিজের বঞ্চনা, অপমান, নীরবতা, এমনকি প্রতিদিনের ক্ষতগুলোর সঙ্গেও বসবাস করতে শেখে।
একসময় সেই অভ্যস্ততাই এমন এক অদৃশ্য শৃঙ্খল হয়ে ওঠে, যেখান থেকে মুক্তির সম্ভাবনাও মানুষকে ভীত করে।
ভয়টা কী জানেন?
ভয়টা শুধু পরিচিত মানুষটিকে হারানোর নয়। ভয়টা নতুন জীবনের, নতুন অনিশ্চয়তার, নতুন করে বিশ্বাস করার, আবার নতুন করে আঘাত পাওয়ার। পুরোনো আক্ষেপের সঙ্গে মানুষ অন্তত পরিচিত। তার সীমা জানা, তার ভাষা চেনা, তার আঘাতের ধরনও অনুমেয়। কিন্তু নতুন জীবনের আক্ষেপ কেমন হবে, তা তো জানা নেই। সম্ভবত সেই অজানাকে গ্রহণ করার মতো মানসিক শক্তি আর অবশিষ্ট থাকে না বলেই মানুষ পুরোনো সব অভিযোগ, অন্যায়, অপমান আর বঞ্চনাকে নিজের জীবনের অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিতে শেখে।
কী অদ্ভুত মানুষের মনস্তত্ত্ব! কখনো কখনো মানুষ সুখের সম্ভাবনার চেয়ে পরিচিত দুঃখের নিশ্চয়তাকেই বেশি নিরাপদ মনে করে।
কিন্তু এই মেনে নেওয়ারও একটা ইতিহাস আছে। আছে অদৃশ্য মূল্য, নিঃশব্দ ক্ষয়। প্রতিদিন একটু একটু করে নিজের প্রত্যাশা, অভিমান, আকাঙ্ক্ষা, আত্মমর্যাদা, এমনকি নিজের সত্তার কিছু অংশ বিসর্জন দিতে দিতে মানুষ একসময় এমন এক জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে তার নীরবতাকে অন্যরা শান্তি বলে ভুল করে। তার সহ্যশক্তিকে ভালোবাসা, তার আত্মসংযমকে পরিণতিবোধ, আর তার আত্মবিসর্জনকে সম্পর্কের সাফল্য হিসেবে উদ্যাপন করে।
অথচ নীরবতা সব সময় সম্মতি নয়। সহ্য করা সব সময় ক্ষমা করা নয়। আর থেকে যাওয়া মানেই ভালোবেসে থেকে যাওয়া নয়।
আমরা যা দেখাই, তা সব সময় আমাদের সত্য নয়। আমরা যা বলি, তার মধ্যেও অনেক না-বলা কথা থেকে যায়। ভালোবাসা, আবেগ, সম্পর্ক আর সুখের যে সুন্দর গল্প আমরা সমাজের সামনে সাজিয়ে রাখি, তার অনেকটাই হয়তো সমাজের দেখতে চাওয়া এক পরিপাটি প্রতীক। সেই প্রতীকের আড়ালে কত অস্বীকৃত বেদনা, কত অপমান, কত অসমাপ্ত কথোপকথন, কত নিঃশব্দ রক্তক্ষরণ জমে থাকে, তার কোনো সামাজিক হিসাব নেই।
সমাজ সম্পর্কের স্থায়িত্ব দেখতে ভালোবাসে, কিন্তু সেই স্থায়িত্বের মূল্য কে দিচ্ছে, তা জানতে খুব একটা আগ্রহী নয়। একটি সম্পর্ক কত বছর টিকে আছে, সেটি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেই বছরগুলোতে মানুষটি কতটা বেঁচে ছিল, কতটা নিজেকে হারিয়েছে, সেই প্রশ্নটি আমরা সচরাচর করি না। অথচ সম্পর্কের দীর্ঘায়ু আর সম্পর্কের সার্থকতা এক জিনিস নয়।
আজকাল তাই মনে হয়, ভালোবাসার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সব সময় বিচ্ছেদ নয়। কখনো কখনো তার চেয়েও গভীর ট্র্যাজেডি হলো, একটি সম্পর্কের ভেতরে থাকতে থাকতে নিজের কাছ থেকেই নির্বাসিত হয়ে যাওয়া। নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করতে করতে একসময় নিজের সত্যটুকুও চিনতে না পারা।আর সবচেয়ে নির্মম পরিহাস হলো, এই আত্মবিসর্জনেরও সামাজিক স্বীকৃতি আছে। আমরা তাকে ধৈর্য বলি, ত্যাগ বলি, সম্পর্ক রক্ষা বলি। শুধু প্রশ্ন করি না, যে মানুষটি এত কিছু রক্ষা করতে গিয়ে নিজেকেই হারিয়ে ফেলল, তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব কার ছিল?
ভালোবাসা যদি মানুষকে নিজের অস্তিত্ব থেকেই নির্বাসিত করে, তবে সেই নির্বাসনকে মহিমান্বিত করার আগে ভালোবাসার সংজ্ঞাটিই বোধহয় নতুন করে ভাবা দরকার।
কারণ, সব সম্পর্ক ভেঙে গেলে মানুষ একা হয়ে যায় না। কিছু সম্পর্ক অটুট রেখেও মানুষ এমন নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে, যেখানে নিজের অস্তিত্বের সাক্ষী হয়ে থাকা ছাড়া আর কেউ অবশিষ্ট থাকে না।
আর তখন প্রশ্ন জাগে—যে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে প্রতিদিন নিজের কিছুটা মৃত্যু মেনে নিতে হয়, তাকে ভালোবাসা বলব, নাকি বেঁচে থাকার এক দীর্ঘ অভ্যাস?
অন্তদর্শনের খসড়া ২১
স্নিগ্ধা রেজওয়ানা
১১ অক্টোবর, ২০২৬,
ঢাকা, রাত – ১১.২৮
Rezwana Karim Snigdha’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।




















