
দেক্লাম কিছু বুদ্ধিবিচি সম্প্রদায় কইতাছে— “আওয়ামী লীগ শেষ!” কেউ কইতাছে দল ভইঙ্গা যাইবো… কেউ কইতাছে আর ফিরা আসতে পারবো না… কেউ আবার কইতাছে ইতিহাসের ডাস্টবিনে চইলা গেছে। 
খুবই ভালা কতা।
কিন্তু আমার ছোট্ট একটা confusion আছে।
এইযে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতা হারাইছে। কিন্তু তার পতনের পর তার নেতাকর্মীদের ওপর এমন কোনো মারাত্মক পরিস্থিতি তো নেমে আসে নাই, যেটা বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর আইছে।
মমতার দলের কার্যক্রম তো আর আওয়ামী লীগের মতো নিষিদ্ধ হয় নাই। মমতার দলের স্লোগান দিলে কাউরে জেলে যাইতে হয় না, অথচ আওয়ামী লীগের স্লোগান দিলেই গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটতাছে! 
এমনকি বিএনপি রাতের আঁধারে পুলিশ পাঠাচ্ছে তাদেরকে গ্রেফতার করে আনার জন্য। সব মিলিয়ে প্রায় ২ কোটি মানুষের উপরে মামলা করা হয়ে গেছে। ১৫–২০ লাখ মানুষ গ্রেফতার হয়ে পড়ে আছে জেলের ভিতর।
আপনি তাদের পরিবারে খবর পাঠান তো— এই গ্রেফতারের কারণে কি তারা আফসোস করতেছে যে তারা আওয়ামী লীগ কেন করেছিল? আপনি একটা পরিবারও খুঁজে বের করতে পারবেন না যে তারা আফসোস করে বলতেছে, “আওয়ামী লীগ করার কারণে আমার সন্তান গ্রেফতার হয়েছে।”
এটার জন্য কখনো তার আফসোস করবে না।
এটাই হচ্ছে আওয়ামী লীগ।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে, একদিন বিজয় স্লোগান হয়েছে সত্য, কিন্তু তাদের উপরে কোন ধরনের অমানবিক অত্যাচার নেমে আসে নাই।
তবুও দেক্লাম, মমতা তার দলরে ধইরা রাখতে পারে নাই। তার আশপাশের অনেকেই সাইড বদলাইয়া ফেলছে। তৃণমূল কংগ্রেস তাসের ঘরের মতো ভাইঙা পড়ছে।
কিন্তু আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে চিত্রটা একদম উল্টা!
শেখ হাসিনারে ছাইড়া একটা নেতাও তো দলত্যাগ করে নাই। বরং আওয়ামী লীগের অনেক অভিমানী ও দলত্যাগী নেতাকর্মী এহন দলে ফিরা আইছে। এমনকি আমাদের মতো অনেক নিউট্রাল অ্যাক্টিভিস্টও আজ সোশ্যাল মিডিয়ায় আওয়ামী লীগের পক্ষে সরব হইয়া গেছি।
আমি ব্যক্তিগত জীবনেও এর জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ দেক্লাম।
আমার অফিসে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা একসময় শেখ হাসিনারে চরমভাবে অপছন্দ করতো। প্রচণ্ড গালাগালি করতো নোংরা ভাষায়।
কিন্তু এহন তাদের অনেকেই মনে মনে তারে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করতাছে।
কিছুদিন আগে গাজীপুর যাইতেছিলাম এয়ারটেল-রবির একটা আঞ্চলিক প্রোগ্রামে সহকর্মীদের সাথে। এক্সপ্রেসওয়ে দিয়া যাওয়ার সময় যে ছেলেটি একসময় শেখ হাসিনারে নিয়মিত গালাগাল করতো, সে-ই কইতাছে—
“একটা বিষয় অবশ্যই স্বীকার করতে হইবো— হাসিনা অনেক কাম করছে। ড. ইউনূস দুই বছর টাইম পাইয়াও দৃশ্যমান কোনো কাম দেখাইতে পারলো না।
হাসিনা ইউনূস সম্পর্কে যা যা কইছিল, তার সব কথাই এহন সোলো আনা সত্য মনে হইতাছে। আগে হাসিনারে গালি দিতাম, এহন মনে হয় উনি ভবিষ্যৎটা বুঝতে পারছিলেন।
উনি যে পরিমাণ কাম কইরা থুইয়া গেছেন, আগামী একশো বছরেও কোনো সরকার তা করতে পারবো কি না সন্দেহ!”
যারা আগে শুধু আওয়ামী লীগ সমর্থন করতো, তাদের অনেকেই এহন আরও দৃঢ়, কট্টর আওয়ামী লীগ সমর্থকে পরিণত হইছে।
অনেকেই আওয়ামী লীগের আসল ‘কোর ভোটব্যাংক’ নিয়া চিন্তাই করে না।
আওয়ামী লীগ প্রায় তিন কোটি মানুষকে ঘর দিছে, এক কোটিরও বেশি মানুষকে টিসিবি কার্ড দিছে, ১৪৭ ধরনের বিভিন্ন ভাতা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করছে।
এই বিপুল সংখ্যক উপকারভোগী মানুষের পুরো অংশ আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থনশীল। তারা হয়তো এহন প্রকাশ্যে কথা কইতাছে না, কিন্তু সময় আইলে ঠিকই তাদের অবস্থান স্পষ্ট করবো।
আপনি তাদের কাছে গেলে দেকবেন, নেতা বলতে তারা মূলত শেখ হাসিনারে চেনে।
আমি কোন একটা প্রোগ্রামে গিয়া একটা মহিলাকে জিজ্ঞেস করছিলাম— “দেশের প্রধানমন্ত্রীর নাম জানেন?”
আমি অবাক হইয়া শুনলাম, উনি বলতেছে— “দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।”
এদিকে যে ইউনূস দুই বছর কাটাইয়া গেল, তারপরে তারেক জিয়া চলে আসছে— উনার কোনো খোঁজই নাই।
আর সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকও দীর্ঘদিন ধইরা ঐতিহাসিকভাবে প্রথাগত ভাবেই আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি। আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দল সেটি পুরোপুরি নিজেদের দিকে টানতে পারে নাই।
কারণ, আওয়ামী লীগের বাইরে অন্য সরকার ক্ষমতায় আইলে সংখ্যালঘুদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়— এমন ধারণা তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধইরা আছে।
ফলে সংখ্যালঘু ভোটের বড় অংশ ঐতিহাসিকভাবেই আওয়ামী লীগের প্রতি ঝুঁইকা থাকে।
সংখ্যালঘু ভোটারদের অন্য দল কেন টানতে পারে না, তার একটা উদাহরণ চোখের সামনে দেকুন।
এই যে গাইবান্ধাতে একটা রামের মূর্তি বানানো হইতাছে সর্ববৃহৎ, যেটাতে সরকার কোনো ডোনেশন দেয় নাই— হিন্দু সম্প্রদায় তাদের চাঁদা দিয়া নিজেদের জমিতে, নিজেদের মন্দিরের জমিতে বানাইতাছে।
কিন্তু এই যে তৌহিদি জনতা আন্দোলন কইরা বাধা দিয়া সেই মূর্তি বানানো বন্ধ কইরা দিছে।
বর্তমান সরকার অর্থাৎ বিএনপি সরকার তৌহিদি জনতার বিরুদ্ধে যাইতে পারে নাই, কারণ তারা নিজেরাও তৌহিদি জনতার একটা স্টেকহোল্ডার।
তারা নিজেরাও কে কত বড় মুসলিম, কে কত বড় শরীয়াহ পালন করে— এই মতবাদ ধারণ করে।
বিএনপি তো সেকুলার দল না, যে সব ধর্মের মূল্যায়ন করবো— এমন কোনো দল না। এজন্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে তারা টানতে পারে না।
নির্বাচনের সময় হয়তো কিছু টেনেছিল, কিন্তু এই ঘটনার পরে হিন্দু সম্প্রদায় বুঝতে শুরু করছে যে, আমাদের ধর্মের সক্রিয়তা রক্ষা করতে হইলে এখানে একটা সেকুলার সরকার দরকার— আর সেকুলার সরকার সেটা আওয়ামী লীগের দখলেই।
কারণ আওয়ামী লীগের আমলেই হিন্দু সম্প্রদায়সহ সংখ্যালঘু সকল সম্প্রদায়ের একটা প্রতিনিধিত্ব ছিল সবখানে।
কিন্তু গত জামাত-সমর্থিত ইউনূস এবং পরবর্তীতে বিএনপি তাদেরকে সেই পজিশন থাইকা সরাইয়া দিছে।
আর বিশেষ কইরা ধর্মীয় ব্যাপারে এই বিষয়টা অনেক বেশি সেনসিটিভ। কারণ হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধানতম একটা দেবতা হচ্ছে ভগবান রাম।
সেই ভগবান রামের মূর্তি যখন বানাইতে বাধা দিতাছে তৌহিদি জনতা, এমনকি ভিডিও ফুটেজে দেখলাম— এই রামকে অপমান করে তার মূর্তিতে জুতা নিক্ষেপ করতাছে— এটা তো ধর্মের প্রতি অবমাননা।
বিএনপি এটার বিরুদ্ধে কোন অ্যাকশন নিতে পারে নাই।
কারণ দেখা যাবে বিএনপি নিজেও এটা ধারণ করে।
তাই সেখানে সরকার প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিতাছে— এটা তো তারা বুঝতে পারতাছে।
তাহলে তারা বিএনপির পক্ষে কেন থাকবো?
তারা তো অটোমেটিক সেই আওয়ামী লীগের পক্ষেই চইলা যাইবো!
এ ছাড়া বাংলাদেশের কিছু জেলা আছে, যেগুলো ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি। সেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারানো অত্যন্ত কঠিন বইলা বিবেচিত হয়।
আরেকটি বিষয় হইলো বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন।
কবি, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের একটি বড় অংশকে আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে দেকা যায়।
যারা আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করে, তাদের মধ্যে অনেকেই জনপরিসরে ততটা পরিচিত নন। ফলে বর্তমানে তাদের নীরবতা বা অবস্থান নিয়াও নানা আলোচনা আছে।
এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ নিয়া বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেকা যাইতাছে।
যাউগ্গা, প্রশ্ন আসতে পারে— দুই বাংলায় দুই দলের চিত্র এত ভিন্ন কেন?
উত্তর হইলো— ইতিহাস, আদর্শ, সাংগঠনিক ভিত্তি, তৃণমূল পর্যায়ের শেকড় এবং জনপ্রিয়তা।
আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত একটি দল। এটি তিন প্রজন্মের রাজনৈতিক ঐতিহ্য বহন করে। আওয়ামী লীগের আদর্শের কেন্দ্রবিন্দু অসাম্প্রদায়িকতা।
এর সাংগঠনিক ভিত্তি কৃষক, শ্রমিক ও বৃহৎ মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজ। তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তাও ব্যাপক।
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস একটি তুলনামূলক নতুন রাজনৈতিক দল, যা কংগ্রেস থাইকা বাইর হইয়া গঠিত হইছে।
এটা মূলত একটা আঞ্চলিক দল।
বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়া তাদের উত্থান। শুরুতে শিল্পায়নের বিরোধিতা করলেও পরবর্তীতে শিল্পপতিদের সমর্থন ও অর্থনৈতিক শক্তির ওপর নির্ভর কইরা দলটি আরও শক্তিশালী হইছে।
সমালোচকদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের নির্দিষ্ট কোনো আদর্শিক অবস্থান নাই। কখনো বিজেপির মতো হিন্দুত্ববাদী অবস্থান, কখনো কংগ্রেসঘেঁষা অবস্থান, আবার কখনো বামপন্থী শ্রেণি-সংগ্রামের ভাষা ব্যবহার করতে দেকা যায়।
ফলে অনেকের কাছে দলটিকে আদর্শিকভাবে অস্পষ্ট মনে হয়।
মুসলিম ভোটকে কেন্দ্র কইরা রাজনীতি করার অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে আছে, যদিও সমালোচকদের দাবি— মুসলিম সমাজের প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বা ক্ষমতাকেন্দ্রিক উন্নয়নে তারা কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারে নাই।
সুতরাং অনেকের মতে, আওয়ামী লীগ তুমুল, তীব্র ও প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশেও শুধু টিকবো না, বরং আরও শক্তিশালী হইয়া উঠবো।
অন্যদিকে তৃণমূলের মতো আদর্শিকভাবে দুর্বল বা সুযোগসন্ধানী দল সামান্য ঝড়েই নাস্তানাবুদ হইয়া যাইতে পারে।
তাদের দৃষ্টিতে এটাই স্বাভাবিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ।
এই নিয়া আলাদা কইরা বিস্মিত হওয়ার কিছু নাই!
এজন্য আওয়ামী লীগের সাথে তৃণমূল কংগ্রেসের তুলনা করা বোকামি হবে।
কিছু বুদ্ধিজীবীকে টকশোতে দেখলাম মমতার দলের সাথে আওয়ামী লীগের তুলনা করতেছে— তাদের উদ্দেশ্যেই লেখাটা।





















