গভীর আর্থিক সংকটে পড়েছে সিটি গ্রুপ। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, চলতি মূলধনের ঘাটতি, ব্যাংক সহায়তা কমে যাওয়া এবং নতুন প্রকল্পে গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় আর্থিক সংকট প্রকট হয়েছে।

১৯ জুন, ২০২৬
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর মতে, সিটি গ্রুপের মতো বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সচল রাখা শুধু প্রতিষ্ঠানটির জন্য নয়, বরং দেশের ব্যাংকিং খাত, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে ঋণগুলো তাৎক্ষণিকভাবে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত না করে একটি সমন্বিত পুনর্গঠন কাঠামোর আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত পুনর্গঠন পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে একটি কেন্দ্রীয় এসক্রো অ্যাকাউন্ট চালু করা।
এ ছাড়া সিটি গ্রুপের আর্থিক কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য পরিচালনা পর্ষদেও ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিত্ব রাখার প্রস্তাব রয়েছে। ৩৬টি ব্যাংক সম্মত হলে তারা যৌথভাবে কয়েকজন প্রতিনিধি মনোনয়ন দেবে, যাঁরা কম্পানির আর্থিক সিদ্ধান্ত, নগদ প্রবাহ, ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও ব্যাবসায়িক কার্যক্রম তদারকি করবেন। ব্যাংকগুলোর ধারণা, এই ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং ঋণ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাও জোরদার হবে।
পুনর্গঠন কার্যক্রমকে কার্যকর ও নিরপেক্ষ রাখতে একটি স্বাধীন মনিটরিং কমিটি গঠনের কথাও আলোচনায় রয়েছে। এই কমিটিতে পুনর্গঠন ও করপোরেট পুনরুদ্ধার বিষয়ে অভিজ্ঞ দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁরা নিয়মিতভাবে ব্যবসার অগ্রগতি, নগদ প্রবাহ, ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা এবং পুনর্গঠন পরিকল্পনার বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করবেন।
ব্যাংকারদের মতে, সিটি গ্রুপকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমানের মৃত্যুর পর গ্রুপের ব্যবস্থাপনায় কিছুটা পরিবর্তন আসে। একই সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি শিল্পগোষ্ঠীটির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। চলতি মূলধনের ঘাটতির কারণে কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হয় এবং ব্যবসার পরিধি সংকুচিত হতে শুরু করে।
গ্রুপের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারের বড় ধরনের পরিবর্তনের কারণে প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। তাঁর দাবি, ২০২২ সালের পর থেকে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে সিটি গ্রুপের ক্ষতির পরিমাণ দুই হাজার ৫০০ কোটির টাকার বেশি। একই সময়ে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আগের ঋণসীমা থাকলেও প্রকৃত আমদানি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগে যখন ডলারের বিনিময় হার ছিল প্রায় ৮৫ টাকা, তখন সিটি গ্রুপের ব্যাংকিং সুবিধার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ছিল প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ। কিন্তু বর্তমানে ডলারের দাম ১২৫ টাকার কাছাকাছি পৌঁছানোয় সেই সক্ষমতা কমে প্রায় ২১০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। ফলে কার্যত প্রায় ৯০ কোটি ডলারের আমদানি সক্ষমতা হারিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে ব্যাংকিং খাতের চলমান অস্থিরতা। সিটি গ্রুপের দাবি, অতীতে যেসব ব্যাংক বড় অঙ্কের চলতি মূলধন সহায়তা দিত, তাদের অনেকেই এখন আগের মতো সহায়তা দিতে পারছে না। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু স্থানীয় ব্যাংকের গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়ায় বিদেশি সরবরাহকারীরা সেসব ব্যাংকের ইস্যুকৃত এলসি গ্রহণে অনাগ্রহ দেখিয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে ঋণ সুবিধা থাকলেও বাস্তবে তা ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে মুন্সীগঞ্জে গ্রুপের বেশ কয়েকটি নতুন শিল্প প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। কম্পানির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে নির্মিত ছয়টি প্রকল্প উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত থাকলেও গ্যাস না পাওয়ায় সেগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে এসব প্রকল্প থেকে কোনো রাজস্ব আসছে না, অথচ সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ, বেতন এবং অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় অব্যাহত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, এ কারণে প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার সমপরিমাণ আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সিটি গ্রুপ নিজস্ব উদ্যোগেও কিছু পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে অপ্রধান বা নন-কোর সম্পদ বিক্রি, অব্যবহৃত জমি ও আয়হীন সম্পদের নগদায়ন এবং নতুন বিনিয়োগ অংশীদার খোঁজা। ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকেও গ্রুপের অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাই-টেক পার্ক এবং অন্যান্য অপ্রধান প্রকল্পের জন্য সম্ভাব্য ক্রেতা অনুসন্ধানের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা মনে করছেন, কোনো একটি ব্যাংক এককভাবে পদক্ষেপ নিলে ঝুঁকি ও ক্ষতির আশঙ্কা বাড়তে পারে। কিন্তু সব ব্যাংক সমন্বিতভাবে এগোলে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা অনেক বেশি। তাঁদের মতে, এ উদ্যোগ সফল হলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বড় করপোরেট ঋণ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে এটি একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সিটি গ্রুপের মতো বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর সংকট শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি দেশের শিল্পায়ন, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক আর্থিক সুনাম এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিবেশের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই ঋণ পুনর্গঠন, পর্যাপ্ত চলতি মূলধন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং নীতিগত সহায়তার সমন্বয় ঘটাতে পারলে প্রতিষ্ঠানটি আবারও স্বাভাবিক ব্যাবসায়িক ধারায় ফিরতে সক্ষম হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল আশা করছে।





















