
20/06/2026
আওয়ামী লীগ দলটির চালিকাশক্তি হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে উঠে আসা লোকজন যাদেরকে মার্কসীয় ভাষায় বলে পেটিবুর্জোয়া শ্রেণী। তবে এই দলের মধ্যে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের সমাহার ঘটে। বুর্জোয়া, পেটিবুর্জোয়া ও সর্বহারা-মেহনতি শ্রেণীর সকল পর্যায়ের মানুষ আছে এই দলে। এখানে উকিল-মোক্তার, ইঞ্জিনিয়ার-ডাক্তার,
সাংবাদিক, কবি, লেখক, শিল্পী, ছাত্র-শিক্ষক, চাকরিজীবী,
নারী-পুরুষ, গৃহকর্তা-গৃহকর্মী,
ভূস্বামী কৃষক, চাষী-ক্ষেতমজুর,
শিল্পের মালিক, শ্রমিক,কামার, কুমার জেলে, তাঁতী, দিনমজুর, বড় ব্যবসায়ী, ছোট ব্যবসায়ী ইত্যাদি সকল শ্রেণি ও পেশাজীবি মানুষের সম্মিলনে এই দল আওয়ামী লীগ গড়ে উঠেছে। এখানে মালিকের স্বার্থ এবং শ্রমিকের স্বার্থ দ্বান্দ্বিক হলেও উভয়ের স্বার্থ সংরক্ষণে ভারসাম্য রক্ষা করে নীতিনির্ধারণ করা হয়। জটিল দ্বান্দ্বিকতার ভেতর দিয়ে আওয়ামী লীগ ভারসাম্য রক্ষা করে পরিচালিত হয়। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক বিকাশের পর্যায়ে দেশপ্রেমিক জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণী কোনো সমস্যা নয়, কিন্তু সমস্যা হলো বাংলাদেশে চলতি তিন দশকে গজিয়ে উঠা নতুন লুটেরা লুম্পেন বুর্জোয়া গোষ্ঠী। এরা শিল্পে কলে কারখানায় তেমন কোনো বিনিয়োগ করে না। রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্রয়ে থেকে এরা লুটপাট চাঁদাবাজি দখলবাজি ধান্দাবাজি কমিশনবাজি ও রেন্টসিকিং করে বিপুল অর্থ সম্পদের মালিক হয় এবং সমাজে ও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে তার নিজস্ব একটি “বলয়” সৃষ্টি করে। এরা সংগঠনের ভেতরে অনুগত
“বাহিনী” সৃষ্টি করে। তারা এটি করে সমাজে, প্রশাসনে এবং দলের মধ্যে তাদের আধিপত্য ধরে রাখতে। তার অনুগত বাহিনীর পেছনে সে বিনিয়োগ করে, অনুসারীদের পেছনে খরচ করে। এটি তার রাজনৈতিক বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগ থেকে সে বহুগুণ বেশি আয় রোজগার করে।
আওয়ামী লীগের সমস্যাটা এইখানে। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এই যুগে রাষ্ট্রের ক্ষমতায় থাকা ও ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাব্য দলগুলির সবক’টিতে এই টাকার খেলা, আধিপত্যের খেলা, বাহিনীর খেলা চলতে থাকে। উচ্চতর নেতৃত্ব এই অপচর্চাকে প্রশ্রয় দেওয়া শুরু করে। এভাবেই আওয়ামী লীগে সৃষ্টি হয়েছে “বাহিনী বলয়” কিংবা “ভাই বলয়”। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতির দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে এই রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি শেকড় গেঁড়ে বসেছে। ব্যবসায়ী বুর্জোয়া শ্রেণি একসময় রাজনীতি থেকে নির্দিষ্ট একটি দূরত্ব বজায় রাখতো। কিন্তু বিগত তিন দশকে এই বুর্জোয়া শ্রেণী সরাসরি রাজনৈতিক দলে ঠাঁই করে নিয়েছে।
১৯৯১ এর সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়নে ত্যাগী, সৎ, নিষ্ঠাবান, যোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই প্রাধান্য দিয়েছিল। সেই নির্বাচনে ফলাফল ভালো হয়নি। তারা মনে করেছে সেই সময়ে ব্যবসায়ী বুর্জোয়াদেরকে মনোনয়ন দিলে দল নির্বাচনে জিততে পারত। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বড় ব্যবসায়ী শিল্পপতি পুঁজিপতি আমলা মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণী থেকে বিপুল সংখ্যক মনোনয়ন দিয়ে নির্বাচনে সামান্য ব্যবধানে জিতেছিল। তখন থেকে আওয়ামী লীগে পোড়-খাওয়া রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোনঠাসা হওয়া শুরু হলো। এই পোড়-খাওয়া আওয়ামী লীগার এবং তাদের অনুসারী রাজপথের ছাত্র-যুবকদের মধ্যে একটি নতুন ধারণার উন্মেষ ঘটলো যে, “টাকা ছাড়া রাজনীতিতে উপযুক্ত পদ পাওয়া যাবেনা”। আর সেই উপলব্ধি থেকে একসময়ের ত্যাগী নিষ্ঠাবান নেতা-কর্মীরা সুযোগ সৃষ্টি করে দুই হাত ভরে কামাই করা শুরু করলো। এই চরিত্রটি বিএনপি’র জন্মলগ্ন থেকে ছিল আর আওয়ামী লীগে নতুন।
বিগত তিন দশকে এই কু-প্রবৃত্তির জোয়ারে আওয়ামী লীগ ভেসে গেছে। এর ফলে আওয়ামী লীগের ভেতরে একটি “রাজনীতিজীবী” পেশার জন্ম হয়েছে। ফলে এখানে কমিটি বাণিজ্য হয়েছে, পদ বাণিজ্য হয়েছে, মনোনয়ন বাণিজ্য হয়েছে। চিন্তা চেতনায় আওয়ামী লীগ নেই– এমন অনেকেই আওয়ামী লীগে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছে। এমনকি বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে, এমনকি জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও মনোনয়ন লাভ করেছে। দলীয় অনেক নেতাকর্মী আজেবাজে নোংরা পথে অর্থ রোজগারে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বিএনপিতে এটি জন্মলগ্ন থেকেই ছিল, বর্তমানেও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। বিএনপি’র জন্য এটি স্বাভাবিক। কিন্তু আওয়ামী লীগের জন্য অস্বাভাবিক। এই চরিত্রটি আওয়ামী লীগের জন্য তার ঐতিহাসিক চরিত্রের বিচ্যুতি। (চলবে)
লেখক: আহমাদ সাদ
শিক্ষক কলামিস্ট
আওয়ামী লীগের ৭৭ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে একটি ধারাবাহিক লেখা)
(কিস্তি এক)





















