
অনলাইন ০৪ জুলাই, ২০২৬
সাত বীর, এক জাতির আত্মা: বীরশ্রেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি
১৯৭১। একটি জাতি সিদ্ধান্ত নিল—দাসত্বের চেয়ে মৃত্যু ভালো। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ দিলেন, ২ লাখ মা-বোন নির্যাতনের শিকার হলেন। এই সমুদ্রসম আত্মত্যাগের মাঝে ৭ জন সন্তান এমন বীরত্ব দেখালেন, যা কিংবদন্তি হয়ে গেল। রাষ্ট্র তাঁদের দিল সর্বোচ্চ খেতাব—’বীরশ্রেষ্ঠ।’ তাঁরা নিজের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে আমাদের একটি মানচিত্র, একটি পতাকা দিয়ে গেলেন।
৭ বীরশ্রেষ্ঠের সংক্ষিপ্ত জীবনী
১. ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ (১ মে ১৯৪৩ – ৮ এপ্রিল ১৯৭১)
বাহিনী: পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস, ইপিআর
যুদ্ধক্ষেত্র: কুষ্টিয়ার চুয়াডাঙ্গার বুড়িপোতা সীমান্ত
বীরত্ব: ৮ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনীর মর্টার শেলিংয়ের মধ্যে তিনি একা একটি হালকা মেশিনগান নিয়ে শত্রুর অগ্রযাত্রা রুখে দেন। নিজে শহীদ হন, কিন্তু পিছু হটেননি। ফলে মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপদে সরে যেতে পারেন।
সমাধি: বুড়িপোতা, দর্শনা, চুয়াডাঙ্গা।
২. সিপাহী মোস্তফা কামাল (১৬ ডিসেম্বর ১৯৪৭ – ১৮ এপ্রিল ১৯৭১)
বাহিনী: পূর্ব বেঙ্গল রেজিমেন্ট
যুদ্ধক্ষেত্র: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দারুইন
বীরত্ব: মাত্র ২৩ বছর বয়সে। পাকিস্তানি বাহিনী যখন আক্রমণ করে, তিনি একাই মেশিনগান নিয়ে প্রতিরোধ গড়েন। গুলিতে এক হাত উড়ে যাওয়ার পরও অন্য হাতে গুলি চালিয়ে ৩০-এর বেশি শত্রু সেনা হত্যা করেন এবং শহীদ হন।
সমাধি: আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
৩. ইঞ্জিন রুম আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিন (১৯৩৫– ১০ ডিসেম্বর ১৯৭১)
বাহিনী: বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী জাহাজ পলাশ
যুদ্ধক্ষেত্র: খুলনার রূপসা নদী
বীরত্ব: ১০ ডিসেম্বর পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজের আক্রমণে বাংলাদেশ নৌবাহিনী জাহাজ পলাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইঞ্জিন বিকল হলেও তিনি মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে ইঞ্জিন চালু রাখার চেষ্টা করেন যাতে জাহাজটি যুদ্ধ চালাতে পারে। শত্রুর গুলিতে শহীদ হন।
সমাধি: খুলনা নৌঘাঁটি।
৪. ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান (২৯ অক্টোবর ১৯৪১ – ২০ আগস্ট ১৯৭১)
বাহিনী: পাকিস্তান বিমানবাহিনী
বীরত্ব: তিনি করাচি থেকে একটি টি-৩ প্রশিক্ষণ বিমান ছিনতাই করে বাংলাদেশে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেন। পথে তাঁর প্রশিক্ষক মাইনউদ্দিন বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। বিমান ভারতের থাটায় বিধ্বস্ত হয়। মাতৃভূমিতে ফেরার চেষ্টায় শহীদ হন।
সমাধি: প্রথমে পাকিস্তানে, ২০০৬ সালে তাঁর দেহাবশেষ ঢাকার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে আনা হয়।
৫. ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ (১৯৩৬ – ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১)
বাহিনী: পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস
যুদ্ধক্ষেত্র: যশোরের গোয়ালহাটি
বীরত্ব: শত্রুর হালকা মেশিনগানের গুলিতে তার সহযোদ্ধা আহত হন। তিনি আহত সাথীকে কাঁধে নিয়ে নিরাপদ স্থানে যেতে নিজে গুলিবিদ্ধ হন। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত যুদ্ধ করেন।
সমাধি: কাশিপুর, শার্শা, যশোর।
৬. ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর (৭ মার্চ ১৯৪৮ – ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১)
বাহিনী: পূর্ব বেঙ্গল রেজিমেন্ট
যুদ্ধক্ষেত্র: চাঁপাইনবাবগঞ্জের রেহাইচর
বীরত্ব: মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শেষ দিকে। তিনি একটি কোম্পানি নিয়ে শত্রুর শক্তিশালী বাংকার আক্রমণ করেন। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে শত্রুর গুলিতে শহীদ হন। তার আক্রমণের ফলে ওই এলাকা মুক্ত হয়।
সমাধি: চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
৭. ল্যান্স নায়েক মো. হামিদুর রহমান (২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩ – ২৮ অক্টোবর ১৯৭১)
বাহিনী: পূর্ব বেঙ্গল রেজিমেন্ট
যুদ্ধক্ষেত্র: সিলেটের ধলই সীমান্ত
বীরত্ব: মাত্র ১৮ বছর বয়সে। ধলই চা-বাগানে শত্রুর বাংকার দখলের সময় তিনি গ্রেনেড হাতে নিয়ে শত্রুর মেশিনগান পোস্টে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বাংকার ধ্বংস করে শহীদ হন। তাঁর আত্মত্যাগে ওই দিন ধলই মুক্ত হয়।
সমাধি: ত্রিপুরা, ভারত। পরে ২০০২ সালে তাঁর দেহাবশেষ সিলেটে আনা হয়।
আত্মাহুতির আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ: তাঁরা কী শিখিয়ে গেলেন?
৭ জনের ৭ রকম গল্প, কিন্তু শিক্ষা একটাই—’আমি’ থেকে ‘আমরা’তে উত্তরণ।
১. নিঃস্বার্থতা: রউফ, নূর মোহাম্মদ ও হামিদুর—তিনজনই সৈনিক। পদ নেই, ক্ষমতা নেই। তবু সহযোদ্ধাদের বাঁচাতে, বাংকার দখল করতে নিজেকে উৎসর্গ করলেন। এটা আধ্যাত্মিকতার সর্বোচ্চ স্তর— নিজের চেয়ে আদর্শকে বড় করা।
২. সাহসের সংজ্ঞা: মতিউর দেশের স্বার্থে বিমান ছিনতাই করতে গেলেন একা। কামাল হাত হারিয়েও গুলি চালালেন। জাহাঙ্গীর শেষ যুদ্ধে সামনে দাঁড়ালেন। ভয়কে জয় করাই প্রকৃত ইবাদত।
৩. কর্তব্যবোধ: রুহুল আমিন জাহাজ ডুবছে জেনেও ইঞ্জিন রুম ছাড়েননি। কারণ, তাঁর কাছে দায়িত্ব ছিল জীবনের চেয়ে বড়।
তাঁরা বেঁচে থাকলে হয়তো কর্নেল, জেনারেল হতেন। কিন্তু তাঁরা বেছে নিলেন শহীদের মর্যাদা। কারণ, তাঁরা জানতেন—একটি জাতির জন্মের জন্য কিছু রক্ত লাগে। সেই রক্ত তাঁরা দিলেন।
শেষ কথা
আজ আমরা স্বাধীনভাবে কথা বলি, চলি ও স্বপ্ন দেখি। এই স্বাধীনতার প্রতিটি ইটের সঙ্গে মিশে আছে ৭ বীরশ্রেষ্ঠের রক্ত।
তাঁদের জীবন আমাদের প্রশ্ন করে— দেশের জন্য আমরা কী ত্যাগ করছি?
সালাম, হে বীরশ্রেষ্ঠ। তোমরা মরোনি। তোমরা বাংলাদেশ হয়ে বেঁচে আছ।
(বি.দ্র. ছবি ও লেখা তৈরিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা হয়েছে। ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। কমেন্টসের মাধ্যমে ত্রুটিগুলা চিহ্নিত করে দেবেন।)
Jashim Uddin’s Post





















