
১৯৭১-এর ৩টি কান্নার গল্প
যাঁদের নাম ইতিহাসের বইয়ে নেই, কিন্তু বাংলাদেশ তাঁদের ঋণ
১. কলাগাছের ভেলায় মা—নাম: সখিনা বেওয়া, বরিশালের গৌরনদী
১৯৭১, অক্টোবর। রাত ২টা। পাকিস্তানি বাহিনী গ্রামে আগুন দিয়েছে।
সখিনা বেওয়ার ১৪ বছরের ছেলে রফিক মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য চাল-ডাল পৌঁছে দিত। সেদিন রফিক ফেরেনি।
ভোরে খবর এল—নদীর ওপারে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প। রফিক সেখানে গুলিবিদ্ধ।
সখিনার ঘরে নৌকা নেই। বর্ষার পানি টইটম্বুর।
মা কী করল জানেন? উঠোনের কলাগাছ কেটে ৪টা গাছ জোড়া দিয়ে ভেলা বানাল। আঁচল দিয়ে ভেলায় বেঁধে, হৃদয়ে পাথর বেঁধে নদীতে নামল।
৪ ঘণ্টা ঠেলে, কাঁপতে কাঁপতে ওপারে গিয়ে দেখল ছেলে মারা গেছে ৩ ঘণ্টা আগে।
সখিনা লাশ কোলে নিয়ে আবার ভেলায় উঠল। বাড়ি এনে গোসল করিয়ে দাফন দিল।
গ্রামের লোক বলল, “চাচি, এত কষ্ট করলা কার জন্য?”
সখিনা মাটির দিকে তাকিয়ে বলল, “কার জন্য আবার? দেশটার জন্য। আমার রফিকের কবরের উপর দিয়াই তো বাংলাদেশ হাঁটব।”
আজও গৌরনদীতে বন্যা হলে বুড়োরা বলে, “সখিনার ভেলার মতো সাহস লাগব।”
এই মাকে আপনি কী বলবেন? ‘অশিক্ষিত?’
২. পাগলা মসজিদের ইমাম—নাম: মওলানা ইউসুফ আলী, ময়মনসিংহের নান্দাইল
নান্দাইল বাজারের পাশে ছোট্ট মসজিদ। ইমাম ইউসুফ আলী। বয়স ৫৫। দাড়ি সাদা।
১৯৭১-এর জুলাই। পাকিস্তানি ক্যাম্পে খবর গেল—এই মসজিদে রাতে মুক্তিযোদ্ধারা আসে, নামাজ পড়ে।
ক্যাপ্টেন এসে বলল, ‘হুজুর, মুক্তিদের ধরিয়ে দেন। নাহলে মসজিদে আগুন।’
ইউসুফ আলী ওজু করে এসে বললেন, ‘আগুন দাও। আল্লাহর ঘর পুড়লে আল্লাহ দেখবে। কিন্তু মেহমানদের নাম আমি বলব না। মেহমান আল্লাহর রহমত।’
সেদিন রাতেই মসজিদে আগুন দেওয়া হলো। ইমাম সাহেব কোরআন বুকের মধ্যে নিয়ে বাইরে বের হলেন।
পরের ৪ মাস তিনি জঙ্গলে, মাদ্রাসায়, মানুষের ঘরে ঘরে লুকিয়ে বেড়িয়েছেন। আর প্রতি শুক্রবার গাছের নিচে দাঁড়িয়ে খুতবা দিতেন—’নামাজ পড়ো, দেশের জন্য দোয়া করো।’
স্বাধীনতার পর গ্রামের লোক চাঁদা তুলে নতুন মসজিদ করে দিল।
তিনি প্রথম নামাজে বলেছিলেন, ‘আল্লাহ, এই মসজিদের ইটের সাথে আমার পোড়া মসজিদের ছাই মিশিয়ে দিও। তাহলে আমি শান্তি পাব।’
ধর্মের নামে যারা দেশ ভাগ করতে চায়, এই ইমামকে আপনি কী বলবেন? “রাজাকার?”
৩. বোবা রাখাল—নাম: করিম, কুষ্টিয়ার কুমারখালী
করিমের বয়স ১৯। জন্ম থেকে বোবা। কথা বলতে পারে না, শুধু ‘আঁ…আঁ’ শব্দ করে।
গ্রামে গরু-ছাগল চরাত। সবাই আদর করে ‘বোবা করিম’ ডাকত।
১৯৭১-এর সেপ্টেম্বর। সেক্টর-৮-এর মুক্তিযোদ্ধারা কুমারখালীতে অপারেশন করবে। রাস্তা চেনে না।
করিম ইশারা দিয়ে বোঝাল ‘আমি নিয়া যামু’।
সারা রাত ধানক্ষেত, খাল, বিল পার করে ১২ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিরাপদে ক্যাম্পে পৌঁছে দিল। ফেরার পথে পাকিস্তানি পেট্রোলের মুখে পড়ল।
মুক্তিযোদ্ধারা গুলি করল। করিম সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত নাড়ছিল—”আমি কিছু জানি না” বোঝানোর জন্য।
একটা গুলি এসে লাগল বুকে। মাটিতে পড়ে যাওয়ার আগে সে শেষবার আঙুল দিয়ে আকাশের দিকে দেখাল। সেখানে ভোরের প্রথম আলো।
মুক্তিযোদ্ধারা পরে জানতে পারে, করিমের মা যুদ্ধের আগে মারা গেছে। বাবা নেই। একটা গরুই ছিল সম্বল। সেটাও পাকিস্তানিরা নিয়ে গেছে।
তবুও সে ১২টা অচেনা মানুষের জন্য জান দিল। কারণ সে বুঝত—”ওরা আমার দেশের লোক।”
এই ছেলেটাকে আপনি কী বলবেন? ‘বোঝা?’
সবশেষে একটা কথা
ইতিহাস লেখে বড় বড় নেতাদের নামে। কিন্তু দেশ গড়ে ওঠে সখিনার ভেলা, ইউসুফের কোরআন আর করিমের ইশারায়।
তাঁরা স্কুলে যায়নি। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বোঝেনি। শুধু বুঝেছিল—’আমার মাটিতে কেউ আগুন দিলে, আগুন নেভাতে হবে।’
আজ ৫০ বছর পর যদি আমরা তাঁদের নাতি-নাতনিদের বলি “তোমার দাদা রাজাকার ছিল”—তাহলে এর চেয়ে বড় বেঈমানি আর হয় না।
তাঁদের গলায় জুতার মালা না ভাই।
বর্ষার দিনে একটা কলা গাছ, শুক্রবারে একটা সুরা, আর রাস্তায় একটা নীরব সালাম—এটাই তাঁদের প্রাপ্য।
কারণ তাঁরা মানুষ ছিল। ক্ষুধা লাগত। ভয় পেত। তবুও বুক পেতে দিয়েছিল। আমাদের জন্য।
“লাল-সবুজের একটা কোনাও যদি পবিত্র হয়, সেটা এই তিনজনের চোখের পানির কারণে।”
Rokeya Akther
ঠিক বলেছেনএরাই আসল দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা. এদেরকথা কেউ মনে করেনা,
এদের রক্তের সাথে বেইমানি করেছি আমরা।
না, আমরা করিনি। আমাদের করানো হয়েছে তাদের দ্বারা, যারা ৫৫ বছর ধরে এদেশের শাসকের গদিতে বসে আসছে। বেইমানি করার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে তারা। আর আমরা স্বার্থপর। তাই ব্যক্তিগত লাভের জন্য সে সূযোগ গ্রহন করেছি।
বিনম্র শ্রদ্ধা, সেই প্রকৃত দেশপ্রেমিকদের প্রতি!
Bishnu Rup Chowdhury
ভদ্রমহিলার ছবিটি কি প্রতিকী? আমি যতদূর মনে করতে পারছি এটা নিহার বানুর ছবি, রাজাশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ছাত্রী, বাংলাদেশের জন্মের পর যিনি প্রথম অপহত্যার শিকার। যা নিয়ে তৎকালীন সাপ্তাহিক বিচিত্রার ক্রম সংখ্যাগুলোতে বুকভরা বেদনা নিয়ে পড়তাম। বয়স হয়েছে, ভুলে যাই, তবু যেন মনের মাঝে গুমড়ে উঠলো সে বেদনাময় দিনগুলো।
Saiful Islam
ইতিহাসে সত্যিকারের বীর এরাই।
তোমাদের ঋন শোধ করা যাবে না।





















