, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
যুক্তরাষ্ট্র–কানাডা উত্তেজনা: বিদ্যুৎ ও খনিজবন্ধের হুমকি কানাডার একরামুল হত্যা শেখ হাসিনাসহ ৭ জনকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ যুক্তরাজ্যে যৌনাকাঙ্ক্ষা কমানোর ওষুধ কর্মসূচি ভূগর্ভস্থ পানির চাপ কমাতে লবণাক্ত পানি শোধনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর পে-স্কেলেবাস্তবায়নে অর্থ জোগান সম্ভব নয় বাংলাদেশ :দৈনিক ১০ জন হত্যার শিকার বিদ্যুৎ না থাকায় ঘেরে প্যাডেল হুইল অক্সিজেন বন্ধ:অভিযোগ ভিত্তিহীনআসাদুজ্জামান তদন্ত কমিটি গঠন রংপুর চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা: চিকিৎসক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সম্পাদক গ্রেফতার ব্রিটিশ নাগরিকত্বনিয়ে পররাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী:কে নিউজ করেছে, কার এত জ্বালা

যাঁর পাঠানো অর্থে যাত্রা শুরু করে মুজিব নগর সরকার

  • প্রকাশের সময় : ১২:৪২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
  • ৫৭ পড়া হয়েছে

যাঁর পাঠানো অর্থে যাত্রা শুরু করে মুজিব নগর সরকার
আকবর আলি খান; যিনি একাই একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের ঊষালগ্নে তিন কোটি টাকা যোগান দিয়েছিলেন মুজিবনগর সরকারের জন্য।
১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল। রাত প্রায় একটা। হবিগঞ্জের এসডিও অফিসের ঘরে বসে এক মানুষ। সামনে খোলা তালা, ভেতরে টাকা। তিনি ঝুঁকি নিচ্ছেন। পাকিস্তানি সেনারা যে কোনো মুহূর্তে আক্রমণ করতে পারে। তবু তিনি নির্দেশ লিখে যাচ্ছেন – ‘ত্রাণ তহবিল থেকে তিন কোটি টাকা বের করে আগরতলা পাঠাও।’ কে এই সাহসী মানুষ? তিনিই আকবর আলি খান – তৎকালীন হবিগঞ্জের মহাকুমা প্রশাসক (এসডিও)। পরদিন ঠিক সেই টাকা ট্রাকে করে চলে গেল ভারতের আগরতলায়। সেই টাকায় গঠিত হলো মুজিবনগর সরকারের ভিত্তি। ইতিহাসের এক অনন্য সাহসিকতার গল্প।
প্রশ্ন জাগে—ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক সাধারণ ছেলে কীভাবে হয়ে উঠলেন মুক্তিযুদ্ধের গোপন অর্থযোগানদাতা? আর কেন তাকে পাকিস্তানি আদালতে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল?
শৈশব ও শিক্ষা: ইতিহাসের ছাত্র থেকে অর্থনীতির পণ্ডিত:
১৯৪৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে জন্ম। নবীনগর পাইলট হাইস্কুল, ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে বিএ (১৯৬৪) ও এমএ (১৯৬৫)। পরে কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে এমএ (১৯৭৭) ও পিএইচডি (১৯৭৯)।
কিন্তু ইতিহাসের ছাত্র কীভাবে অর্থনীতির গভীরে গেলেন? কারণ তিনি বুঝেছিলেন – দেশ বাঁচাতে হলে দরকার অর্থনীতির জ্ঞান।
রহস্য ১: কেন তিনি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলেন?
বুয়েটে কিছুদিন শিক্ষকতার পর তিনি যোগ দেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে। লাহোরের সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে প্রশিক্ষণ (১৯৬৭-৬৮)। ১৯৬৯ সালে তিনি হবিগঞ্জের এসডিও নিযুক্ত হন। কিন্তু চাকরি ছিল পাকিস্তানের, মন ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের। কীভাবে এই দ্বন্দ্ব সামলাতেন? উত্তরের খোঁজ মেলে ১৯৭১ সালের মার্চে।
১৯৭১: যে রাতগুলো ইতিহাস বদলে দিল:
২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে আকবর আলি খান সিদ্ধান্ত নেন – তাঁকে প্রতিরোধ গড়তে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গোলাবারুদ যোগাতে থাকেন। কিন্তু তৎকালীন পুলিশ সুপার ও অন্যান্য কর্মকর্তারা লিখিত আদেশ ছাড়া অস্ত্র দিতে রাজি ছিলেন না। আকবর আলি সাহস করে নিজ হাতে লিখে দিলেন নির্দেশনা।
শুধু অস্ত্র নয়, তিনি উপজেলা তহবিল থেকে প্রায় তিন কোটি টাকা তুলে ট্রাকে করে আগরতলা পাঠান। সেই টাকাই ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের কাজে ব্যবহৃত হয়। পাকিস্তানি আদালত তাকে অনুপস্থিতিতে ১৪ বছরের কঠোর কারাদণ্ড দেয়।
পরে তিনি আগরতলা চলে যান, সেখানে ‘পূর্বাঞ্চলীয় প্রশাসন’ গড়ে তুলতে সাহায্য করেন। শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কাজ করেন। জুলাই মাসে কলকাতায় মুজিবনগর সরকারের ক্যাবিনেট বিভাগে ডেপুটি সেক্রেটারি, পরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন।
স্বাধীনতা-উত্তর চাকরি ও বিতর্ক:
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে স্বাধীনতার পর তিনি প্রতিষ্ঠান মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন – মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তান থেকে ফেরত আসা মানুষদের পুনর্বাসনে কাজ করেন। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বদলি।
১৯৭৩ সালে তিনি চাকরি ছেড়ে আবার শিক্ষকতায় ফিরতে চাইলেন। শেখ মুজিবুর রহমান তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি, বরং ছুটি মঞ্জুর করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর অনুমতি দেন। সেখানে কমনওয়েলথ বৃত্তি পান – কানাডায় পিএইচডি করতে যান। ১৯৭৯ সালে ফিরে এসে কিছুদিন জাহাঙ্গীরনগরে সহযোগী অধ্যাপক, তারপর আবার সিভিল সার্ভিসে ফিরে যান।
১৯৯৩ সালে স্থায়ী সচিব হন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও অর্থ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন (১৯৯৫-২০০১)। অর্থ সচিব থাকাকালে তিনি ‘বিএনএস বঙ্গবন্ধু’ জাহাজ কেনার বিরোধিতা করেছিলেন। তখন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিল না। তবু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ওপর ওভাররুল করেন। তিনি তার আপত্তি লিখিতভাবে দিয়েছিলেন – তার অভ্যাস ছিল, কোনো অনিয়ম বা আইনবিরোধী কাজে তিনি লিখিত ভিন্নমত রাখতেন। রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী তার ভিন্নমত নোট দেখে শিক্ষামন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী বোঝাতে বলেছিলেন।
রহস্য ২: কেন তাকে ‘শেখ মুজিবের রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল?’
গুজব আছে – ১৯৭২ সালে এক পর্যায়ে তাকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল? সেটা সত্য না কল্পকাহিনি? তিনি নিজে কখনো তা স্পষ্ট করেননি। তবে তার সক্ষমতা ও নিষ্ঠার কথা সবাই স্বীকার করতেন।
ফাইনাল টুইস্ট:
চাকরি থেকে অবসরের পর তিনি বিশ্ব ব্যাংকে বিকল্প নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন (২০০১-২০০৫)। ২০০৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হন। কিন্তু নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ ও প্রশাসনের অনাগ্রহের কারণে তিনি আরও তিন উপদেষ্টাসহ পদত্যাগ করেন – ‘এই অবস্থায় আমরা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে পারছি না,’ বলেছিলেন।
পরবর্তীতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘গভর্নমেন্ট স্টাডিজ’ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নিয়মিত টক শোতে অংশ নিয়ে দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি বিশ্লেষণ করতেন। ২০০৯ সালে নিয়ন্ত্রণ সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন, কিন্তু সরকারের অসহযোগিতায় পদত্যাগ করেন।
২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর রাতে তিনি অসুস্থ বোধ করলে অ্যাম্বুলেন্সে করে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়। ইসিজি পরীক্ষায় হার্ট অ্যাটাক নিশ্চিত হয়। বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।
অদ্ভুত কাকতালীয় ঘটনা – তিনি নিজেও আগে বলেছিলেন, ‘মৃত্যু যেন কষ্ট না দিয়ে আসে।’ হয়েছিল তাই, অ্যাম্বুলেন্সেই শেষ নিঃশ্বাস।
শেষ কথা:
আকবর আলি খান ছিলেন একাধারে অর্থনীতিবিদ, ইতিহাসবিদ, গবেষক, শিক্ষক, এবং সৎ ও সাহসী আমলা। তিনি রেখে গেছেন ১৪ থেকে ১৮টি বই। তাঁর ‘ডিসকভারি অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থটি এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক ১৯৯৬-৯৮ সালের সেরা মানববিদ্যা গ্রন্থ হিসেবে পুরস্কৃত হয়। জাস্টিস মোহাম্মদ ইব্রাহিম স্বর্ণপদক, মৌলানা আকরম খান স্বর্ণপদক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক স্বর্ণপদক ও বাংলা একাডেমির সাম্মানিক ফেলোশিপ পেয়েছেন।
তিনি শুধু একজন আমলা ছিলেন না – তিনি ছিলেন এক স্বপ্নের রথী।
#আকবরআলিখান #মুজিবনগরসরকার #মুক্তিযুদ্ধেরঅর্থসংস্থান #বিএনএসবঙ্গবন্ধু #বাংলাদেশেরঅর্থমন্ত্রী #biography #biography #Abiography

Ashis Kumar Dey’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।

জনপ্রিয়

যুক্তরাষ্ট্র–কানাডা উত্তেজনা: বিদ্যুৎ ও খনিজবন্ধের হুমকি কানাডার

যাঁর পাঠানো অর্থে যাত্রা শুরু করে মুজিব নগর সরকার

প্রকাশের সময় : ১২:৪২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

যাঁর পাঠানো অর্থে যাত্রা শুরু করে মুজিব নগর সরকার
আকবর আলি খান; যিনি একাই একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের ঊষালগ্নে তিন কোটি টাকা যোগান দিয়েছিলেন মুজিবনগর সরকারের জন্য।
১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল। রাত প্রায় একটা। হবিগঞ্জের এসডিও অফিসের ঘরে বসে এক মানুষ। সামনে খোলা তালা, ভেতরে টাকা। তিনি ঝুঁকি নিচ্ছেন। পাকিস্তানি সেনারা যে কোনো মুহূর্তে আক্রমণ করতে পারে। তবু তিনি নির্দেশ লিখে যাচ্ছেন – ‘ত্রাণ তহবিল থেকে তিন কোটি টাকা বের করে আগরতলা পাঠাও।’ কে এই সাহসী মানুষ? তিনিই আকবর আলি খান – তৎকালীন হবিগঞ্জের মহাকুমা প্রশাসক (এসডিও)। পরদিন ঠিক সেই টাকা ট্রাকে করে চলে গেল ভারতের আগরতলায়। সেই টাকায় গঠিত হলো মুজিবনগর সরকারের ভিত্তি। ইতিহাসের এক অনন্য সাহসিকতার গল্প।
প্রশ্ন জাগে—ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক সাধারণ ছেলে কীভাবে হয়ে উঠলেন মুক্তিযুদ্ধের গোপন অর্থযোগানদাতা? আর কেন তাকে পাকিস্তানি আদালতে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল?
শৈশব ও শিক্ষা: ইতিহাসের ছাত্র থেকে অর্থনীতির পণ্ডিত:
১৯৪৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে জন্ম। নবীনগর পাইলট হাইস্কুল, ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে বিএ (১৯৬৪) ও এমএ (১৯৬৫)। পরে কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে এমএ (১৯৭৭) ও পিএইচডি (১৯৭৯)।
কিন্তু ইতিহাসের ছাত্র কীভাবে অর্থনীতির গভীরে গেলেন? কারণ তিনি বুঝেছিলেন – দেশ বাঁচাতে হলে দরকার অর্থনীতির জ্ঞান।
রহস্য ১: কেন তিনি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলেন?
বুয়েটে কিছুদিন শিক্ষকতার পর তিনি যোগ দেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে। লাহোরের সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে প্রশিক্ষণ (১৯৬৭-৬৮)। ১৯৬৯ সালে তিনি হবিগঞ্জের এসডিও নিযুক্ত হন। কিন্তু চাকরি ছিল পাকিস্তানের, মন ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের। কীভাবে এই দ্বন্দ্ব সামলাতেন? উত্তরের খোঁজ মেলে ১৯৭১ সালের মার্চে।
১৯৭১: যে রাতগুলো ইতিহাস বদলে দিল:
২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে আকবর আলি খান সিদ্ধান্ত নেন – তাঁকে প্রতিরোধ গড়তে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গোলাবারুদ যোগাতে থাকেন। কিন্তু তৎকালীন পুলিশ সুপার ও অন্যান্য কর্মকর্তারা লিখিত আদেশ ছাড়া অস্ত্র দিতে রাজি ছিলেন না। আকবর আলি সাহস করে নিজ হাতে লিখে দিলেন নির্দেশনা।
শুধু অস্ত্র নয়, তিনি উপজেলা তহবিল থেকে প্রায় তিন কোটি টাকা তুলে ট্রাকে করে আগরতলা পাঠান। সেই টাকাই ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের কাজে ব্যবহৃত হয়। পাকিস্তানি আদালত তাকে অনুপস্থিতিতে ১৪ বছরের কঠোর কারাদণ্ড দেয়।
পরে তিনি আগরতলা চলে যান, সেখানে ‘পূর্বাঞ্চলীয় প্রশাসন’ গড়ে তুলতে সাহায্য করেন। শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কাজ করেন। জুলাই মাসে কলকাতায় মুজিবনগর সরকারের ক্যাবিনেট বিভাগে ডেপুটি সেক্রেটারি, পরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন।
স্বাধীনতা-উত্তর চাকরি ও বিতর্ক:
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে স্বাধীনতার পর তিনি প্রতিষ্ঠান মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন – মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তান থেকে ফেরত আসা মানুষদের পুনর্বাসনে কাজ করেন। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বদলি।
১৯৭৩ সালে তিনি চাকরি ছেড়ে আবার শিক্ষকতায় ফিরতে চাইলেন। শেখ মুজিবুর রহমান তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি, বরং ছুটি মঞ্জুর করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর অনুমতি দেন। সেখানে কমনওয়েলথ বৃত্তি পান – কানাডায় পিএইচডি করতে যান। ১৯৭৯ সালে ফিরে এসে কিছুদিন জাহাঙ্গীরনগরে সহযোগী অধ্যাপক, তারপর আবার সিভিল সার্ভিসে ফিরে যান।
১৯৯৩ সালে স্থায়ী সচিব হন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও অর্থ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন (১৯৯৫-২০০১)। অর্থ সচিব থাকাকালে তিনি ‘বিএনএস বঙ্গবন্ধু’ জাহাজ কেনার বিরোধিতা করেছিলেন। তখন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিল না। তবু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ওপর ওভাররুল করেন। তিনি তার আপত্তি লিখিতভাবে দিয়েছিলেন – তার অভ্যাস ছিল, কোনো অনিয়ম বা আইনবিরোধী কাজে তিনি লিখিত ভিন্নমত রাখতেন। রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী তার ভিন্নমত নোট দেখে শিক্ষামন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী বোঝাতে বলেছিলেন।
রহস্য ২: কেন তাকে ‘শেখ মুজিবের রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল?’
গুজব আছে – ১৯৭২ সালে এক পর্যায়ে তাকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল? সেটা সত্য না কল্পকাহিনি? তিনি নিজে কখনো তা স্পষ্ট করেননি। তবে তার সক্ষমতা ও নিষ্ঠার কথা সবাই স্বীকার করতেন।
ফাইনাল টুইস্ট:
চাকরি থেকে অবসরের পর তিনি বিশ্ব ব্যাংকে বিকল্প নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন (২০০১-২০০৫)। ২০০৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হন। কিন্তু নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ ও প্রশাসনের অনাগ্রহের কারণে তিনি আরও তিন উপদেষ্টাসহ পদত্যাগ করেন – ‘এই অবস্থায় আমরা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে পারছি না,’ বলেছিলেন।
পরবর্তীতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘গভর্নমেন্ট স্টাডিজ’ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নিয়মিত টক শোতে অংশ নিয়ে দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি বিশ্লেষণ করতেন। ২০০৯ সালে নিয়ন্ত্রণ সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন, কিন্তু সরকারের অসহযোগিতায় পদত্যাগ করেন।
২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর রাতে তিনি অসুস্থ বোধ করলে অ্যাম্বুলেন্সে করে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়। ইসিজি পরীক্ষায় হার্ট অ্যাটাক নিশ্চিত হয়। বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।
অদ্ভুত কাকতালীয় ঘটনা – তিনি নিজেও আগে বলেছিলেন, ‘মৃত্যু যেন কষ্ট না দিয়ে আসে।’ হয়েছিল তাই, অ্যাম্বুলেন্সেই শেষ নিঃশ্বাস।
শেষ কথা:
আকবর আলি খান ছিলেন একাধারে অর্থনীতিবিদ, ইতিহাসবিদ, গবেষক, শিক্ষক, এবং সৎ ও সাহসী আমলা। তিনি রেখে গেছেন ১৪ থেকে ১৮টি বই। তাঁর ‘ডিসকভারি অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থটি এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক ১৯৯৬-৯৮ সালের সেরা মানববিদ্যা গ্রন্থ হিসেবে পুরস্কৃত হয়। জাস্টিস মোহাম্মদ ইব্রাহিম স্বর্ণপদক, মৌলানা আকরম খান স্বর্ণপদক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক স্বর্ণপদক ও বাংলা একাডেমির সাম্মানিক ফেলোশিপ পেয়েছেন।
তিনি শুধু একজন আমলা ছিলেন না – তিনি ছিলেন এক স্বপ্নের রথী।
#আকবরআলিখান #মুজিবনগরসরকার #মুক্তিযুদ্ধেরঅর্থসংস্থান #বিএনএসবঙ্গবন্ধু #বাংলাদেশেরঅর্থমন্ত্রী #biography #biography #Abiography

Ashis Kumar Dey’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।