, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
একদিন তোমার চশমার ফ্রেমটা মোটা হয়ে যাবে,? সুনামগঞ্জ সীমান্তে সাবেক এমপি রঞ্জিত সরকার গ্রেফতার.. সিনেমা হলের আধুনিকায়ন ও দর্শক ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেবে সরকার :প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী আওয়ামী লীগেরপুনরুত্থান ও রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত:সাবেক ২ সেনা কর্মকর্তা ৪ দিনের রিমান্ডে সারের ডিলার নিয়োগে পয়সার বিনিময়ে লাইসেন্স:এমপি প্রশাসনে অপারেশন ক্লিনহার্ট” চালানো দরকার।’ জেলা প্রশাসন এমপিকে পাত্তা দিচ্ছেন না:পরিষ্কার বললাম।অভদ্র হতে বাধ্য করবেন না জামায়াত এমপি সৌদি বিমানবন্দর বন্ধ৫১ ফ্লাইট বাতিলঢাকা থেকে৫ হাজার ৪১৮ যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত ধর্ম নয়, নাগরিক হিসেবে সবার অধিকার নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব: প্রধানমন্ত্রী মায়েদের সঙ্গে কারাগারে বন্দি ৩০৩ শিশু

সার্জিও গোরের ঢাকা সফরে নতুন কূটনৈতিক ধাঁধা, দীনেশ ত্রিবেদীর আকস্মিক বৈঠক ঘিরে প্রশ্ন

  • প্রকাশের সময় : ০৭:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
  • ১২৬ পড়া হয়েছে

অনলাইন  শনিবার, ০১ আগস্ট, ২০২৬

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় দেশের পররাষ্ট্রনীতি এমন একপর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রায় প্রতিটি উচ্চপর্যায়ের বিদেশি সফরই নতুন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যাখ্যার জন্ম দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত ও ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের তিন দিনের ঢাকা সফরের প্রথম দিনেই এমন কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যা কূটনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর কোনো যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়নি। পূর্বনির্ধারিত নৈশভোজ শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়েছে। সার্জিও গোরের সম্মানে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হয়নি।

এর পরদিন আজ শুক্রবার (৩১ জুলাই) পূর্বঘোষণা ছাড়াই ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে সার্জিও গোরের বৈঠক হয়। এসব ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যে বিশ্লেষণ প্রকাশিত হচ্ছিল—বিশেষ করে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, বাংলাদেশ-চীন ঘনিষ্ঠতা এবং ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ—সেগুলোর কিছু প্রতিফলন বাস্তব ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে বলে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করছে। যদিও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ভারতের কোনো সরকারই এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি।

গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সার্জিও গোরের সঙ্গে বৈঠক করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিনিধিদল পর্যায়ে প্রায় এক ঘণ্টা আলোচনা হয়। পরে দুই নেতা প্রায় ২০ মিনিট একান্তে কথা বলেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, আলোচনায় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত অংশীদারত্ব, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা, অভিবাসন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।

Geographic Reference

তবে বৈঠক শেষে সাধারণত যে যৌথ সংবাদ বিবৃতি বা অন্তত দুই পক্ষের পৃথক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়, এবার তা হয়নি। ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস কিংবা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়—কোনো পক্ষই আলোচনার বিস্তারিত তুলে ধরেনি। সার্জিও গোর কেবল এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি সংক্ষিপ্ত বার্তায় বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং ‘অনেক ইতিবাচক অগ্রগতি’ হয়েছে।

অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের খুব ভালো আলোচনা হয়েছে। আমাদের দুই দেশের মধ্যে অত্যন্ত চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রয়েছে। এটাকে আরও কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।’

তবে সাংবাদিকদের একের পর এক প্রশ্নে তিনি বারবার বলেন, আওয়ামী লীগ নিয়ে আলোচনা হয়নি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়নি, বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে আলোচনা হয়নি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে আলোচনা হয়নি, এমনকি অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়েও কোনো আলোচনা হয়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য থেকেই নতুন প্রশ্ন উঠেছে—যদি এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় না-ই আসে, তাহলে প্রায় দেড় ঘণ্টার আলোচনার মূল বিষয় কী ছিল?

আরও একটি বিষয় কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বৈঠকের পর পদ্মায় সার্জিও গোরের সম্মানে একটি নৈশভোজ হওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি একটি সাংস্কৃতিক আয়োজনও নির্ধারিত ছিল। শেষ মুহূর্তে দুটি অনুষ্ঠানই বাতিল করা হয়। কেন বাতিল করা হলো, সে বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। কূটনৈতিক রীতিতে এমন পরিবর্তন সচরাচর ঘটে না। ফলে বিষয়টি নিয়েও নানা ব্যাখ্যা সামনে আসছে। বাড়ছে বিভ্রান্তি। সরকারবিরোধী পক্ষ নিজেদের মতো ব্যাখ্যা প্রচার করছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

এর মধ্যেই আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে সার্জিও গোরের সঙ্গে ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বৈঠকটি আগে প্রকাশিত কর্মসূচিতে ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের একটি কূটনৈতিক সূত্র সংবাদ সংস্থা ইউএনবিকে শুধু জানিয়েছে, এটি ইতিবাচক বৈঠক ছিল এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।

দীনেশ ত্রিবেদী গত ২৫ জুন ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর সার্জিও গোর তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছিলেন, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অপেক্ষায় আছেন। সেই প্রেক্ষাপটে ঢাকায় তাদের এই বৈঠককে স্বাভাবিকও বলা যেতে পারে। কিন্তু সফরের সময়, প্রেক্ষাপট এবং গোপনীয়তা এটিকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছে।

ভারতীয় গণমাধ্যম গত দুই সপ্তাহ ধরে এই সফরকে ঘিরে যেসব বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে, শুক্রবারের ঘটনাগুলোর পর সেগুলো আবারও আলোচনায় এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের সংবাদ প্রতিদিন, দিল্লিভিত্তিক বিভিন্ন কৌশলগত বিশ্লেষণমাধ্যম এবং কয়েকজন ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক যুক্তি দিয়েছেন, সার্জিও গোরের ঢাকা সফরকে কেবল একটি নিয়মিত কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তাদের বিশ্লেষণে কয়েকটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে। প্রথমত, শেখ হাসিনা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চলতি বছরের শেষ নাগাদ দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আগ্রহ রয়েছে। তৃতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর, এরপর রাশিয়া, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ওয়াশিংটন ও দিল্লি—উভয়ের নজরে রয়েছে।

তবে ভারতীয় গণমাধ্যমও স্বীকার করেছে, আওয়ামী লীগ কিংবা শেখ হাসিনার বিষয়টি সার্জিও গোরের সফরের আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচিতে রয়েছে—এমন কোনো তথ্যভিত্তিক প্রমাণ নেই। এগুলো মূলত সময়, প্রেক্ষাপট এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির ভিত্তিতে করা বিশ্লেষণ।

বাংলাদেশ সরকারের বক্তব্যও একই ধরনের। পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেছেন, আওয়ামী লীগ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি এবং এ ধরনের প্রশ্ন ‘সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক’।

তবু কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সব আলোচনা সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ করা হয় না। অনেক বিষয় অনানুষ্ঠানিক বা একান্ত বৈঠকে উঠে আসে, যা পরে কোনো পক্ষই প্রকাশ করে না। ফলে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের বাইরে থেকেও বিভিন্ন দেশ নিজেদের মূল্যায়ন তৈরি করে।

এবারের সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর ওয়াশিংটন থেকে আসা তৃতীয় জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তার সফর। এর আগে মার্চে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর এবং মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চ ঢাকা সফর করেন। ফলে পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো সফর নয়; বরং বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার অংশ।

ভারতীয় বিশ্লেষকদের একটি বড় উদ্বেগের জায়গা বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক। সাম্প্রতিক সময়ে অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বন্দর উন্নয়ন এবং সম্ভাব্য বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরও দিল্লির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী যদিও বলেছেন, করিডোর নিয়ে বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়নি। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনায় কোনো বিষয় আনুষ্ঠানিকভাবে না এলেও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নিজেদের মূল্যায়নে সেটিকে গুরুত্ব দেয়।

বাংলাদেশ এখন একদিকে চীন, রাশিয়া, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কেও নতুন ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা চলছে। এই বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতিই এখন বাংলাদেশের জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি জটিলতাও বাড়াচ্ছে।

বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহবুব কামাল শুক্রবার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর থেকেই তিনি মনে করেছিলেন, পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে। সার্জিও গোরের সঙ্গে বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিব্যক্তি দেখে তার সেই ধারণা আরও দৃঢ় হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। যদিও এটি তার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন; সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, খলিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অথচ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়াকে উসিলা করে প্রথম গেলেন চীনে, আমি খানিকটা অবাক হয়েছিলাম। চ্যানেল ওয়ানে এমনটা বলেছিলাম, চীন সফর আমেরিকার সঙ্গে চুক্তির গ্রস ভায়োলেশন। না জানি কী হয়! সার্জিও গোরের সঙ্গে মিটিং শেষে খলিলুর রহমানের ম্লান ও শুকনো মুখ দেখে কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি। প্রধানমন্ত্রী কি বুঝতে পারছেন পররাষ্ট্রনীতিটা জটিল হয়ে যাচ্ছে? তাকে পরামর্শ দিচ্ছি নিজে মাথা খাটান।

এদিকে সার্জিও গোর শুক্রবার কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেছেন। আগামীকাল শনিবার তার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সেখানেই হতে পারে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে চীন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, পাশাপাশি ভারত, রাশিয়া ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা। দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন আর কেবল একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়; বঙ্গোপসাগর, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, রোহিঙ্গা সংকট, আঞ্চলিক সংযোগ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে দেশটি বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।

সেই বাস্তবতায় সার্জিও গোরের ঢাকা সফরের প্রথম দিনের ঘটনাগুলো—যৌথ বিবৃতি না আসা, নৈশভোজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাতিল হওয়া, পরদিন ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে আকস্মিক বৈঠক এবং আলোচনার বিষয়ে দুই পক্ষের সীমিত তথ্য প্রকাশ—স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। এসব প্রশ্নের অনেকগুলোর উত্তর হয়তো এখনই মিলবে না।

তবে ভারতীয় গণমাধ্যমে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যে ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ উঠে এসেছে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে সেগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই সেই বিশ্লেষণের সত্যতা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। তাই বর্তমান বাস্তবতায় নিশ্চিত তথ্য, কূটনৈতিক ইঙ্গিত এবং সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ—এই তিনটিকে আলাদা রেখেই পরিস্থিতি মূল্যায়ন করাই অধিকতর সতর্ক ও দায়িত্বশীল পন্থা।

 

জনপ্রিয়

সার্জিও গোরের ঢাকা সফরে নতুন কূটনৈতিক ধাঁধা, দীনেশ ত্রিবেদীর আকস্মিক বৈঠক ঘিরে প্রশ্ন

প্রকাশের সময় : ০৭:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬

অনলাইন  শনিবার, ০১ আগস্ট, ২০২৬

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় দেশের পররাষ্ট্রনীতি এমন একপর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রায় প্রতিটি উচ্চপর্যায়ের বিদেশি সফরই নতুন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যাখ্যার জন্ম দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত ও ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের তিন দিনের ঢাকা সফরের প্রথম দিনেই এমন কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যা কূটনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর কোনো যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়নি। পূর্বনির্ধারিত নৈশভোজ শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়েছে। সার্জিও গোরের সম্মানে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হয়নি।

এর পরদিন আজ শুক্রবার (৩১ জুলাই) পূর্বঘোষণা ছাড়াই ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে সার্জিও গোরের বৈঠক হয়। এসব ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যে বিশ্লেষণ প্রকাশিত হচ্ছিল—বিশেষ করে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, বাংলাদেশ-চীন ঘনিষ্ঠতা এবং ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ—সেগুলোর কিছু প্রতিফলন বাস্তব ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে বলে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করছে। যদিও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ভারতের কোনো সরকারই এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি।

গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সার্জিও গোরের সঙ্গে বৈঠক করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিনিধিদল পর্যায়ে প্রায় এক ঘণ্টা আলোচনা হয়। পরে দুই নেতা প্রায় ২০ মিনিট একান্তে কথা বলেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, আলোচনায় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত অংশীদারত্ব, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা, অভিবাসন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।

Geographic Reference

তবে বৈঠক শেষে সাধারণত যে যৌথ সংবাদ বিবৃতি বা অন্তত দুই পক্ষের পৃথক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়, এবার তা হয়নি। ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস কিংবা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়—কোনো পক্ষই আলোচনার বিস্তারিত তুলে ধরেনি। সার্জিও গোর কেবল এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি সংক্ষিপ্ত বার্তায় বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং ‘অনেক ইতিবাচক অগ্রগতি’ হয়েছে।

অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের খুব ভালো আলোচনা হয়েছে। আমাদের দুই দেশের মধ্যে অত্যন্ত চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রয়েছে। এটাকে আরও কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।’

তবে সাংবাদিকদের একের পর এক প্রশ্নে তিনি বারবার বলেন, আওয়ামী লীগ নিয়ে আলোচনা হয়নি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়নি, বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে আলোচনা হয়নি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে আলোচনা হয়নি, এমনকি অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়েও কোনো আলোচনা হয়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য থেকেই নতুন প্রশ্ন উঠেছে—যদি এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় না-ই আসে, তাহলে প্রায় দেড় ঘণ্টার আলোচনার মূল বিষয় কী ছিল?

আরও একটি বিষয় কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বৈঠকের পর পদ্মায় সার্জিও গোরের সম্মানে একটি নৈশভোজ হওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি একটি সাংস্কৃতিক আয়োজনও নির্ধারিত ছিল। শেষ মুহূর্তে দুটি অনুষ্ঠানই বাতিল করা হয়। কেন বাতিল করা হলো, সে বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। কূটনৈতিক রীতিতে এমন পরিবর্তন সচরাচর ঘটে না। ফলে বিষয়টি নিয়েও নানা ব্যাখ্যা সামনে আসছে। বাড়ছে বিভ্রান্তি। সরকারবিরোধী পক্ষ নিজেদের মতো ব্যাখ্যা প্রচার করছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

এর মধ্যেই আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে সার্জিও গোরের সঙ্গে ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বৈঠকটি আগে প্রকাশিত কর্মসূচিতে ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের একটি কূটনৈতিক সূত্র সংবাদ সংস্থা ইউএনবিকে শুধু জানিয়েছে, এটি ইতিবাচক বৈঠক ছিল এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।

দীনেশ ত্রিবেদী গত ২৫ জুন ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর সার্জিও গোর তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছিলেন, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অপেক্ষায় আছেন। সেই প্রেক্ষাপটে ঢাকায় তাদের এই বৈঠককে স্বাভাবিকও বলা যেতে পারে। কিন্তু সফরের সময়, প্রেক্ষাপট এবং গোপনীয়তা এটিকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছে।

ভারতীয় গণমাধ্যম গত দুই সপ্তাহ ধরে এই সফরকে ঘিরে যেসব বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে, শুক্রবারের ঘটনাগুলোর পর সেগুলো আবারও আলোচনায় এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের সংবাদ প্রতিদিন, দিল্লিভিত্তিক বিভিন্ন কৌশলগত বিশ্লেষণমাধ্যম এবং কয়েকজন ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক যুক্তি দিয়েছেন, সার্জিও গোরের ঢাকা সফরকে কেবল একটি নিয়মিত কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তাদের বিশ্লেষণে কয়েকটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে। প্রথমত, শেখ হাসিনা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চলতি বছরের শেষ নাগাদ দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আগ্রহ রয়েছে। তৃতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর, এরপর রাশিয়া, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ওয়াশিংটন ও দিল্লি—উভয়ের নজরে রয়েছে।

তবে ভারতীয় গণমাধ্যমও স্বীকার করেছে, আওয়ামী লীগ কিংবা শেখ হাসিনার বিষয়টি সার্জিও গোরের সফরের আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচিতে রয়েছে—এমন কোনো তথ্যভিত্তিক প্রমাণ নেই। এগুলো মূলত সময়, প্রেক্ষাপট এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির ভিত্তিতে করা বিশ্লেষণ।

বাংলাদেশ সরকারের বক্তব্যও একই ধরনের। পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেছেন, আওয়ামী লীগ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি এবং এ ধরনের প্রশ্ন ‘সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক’।

তবু কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সব আলোচনা সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ করা হয় না। অনেক বিষয় অনানুষ্ঠানিক বা একান্ত বৈঠকে উঠে আসে, যা পরে কোনো পক্ষই প্রকাশ করে না। ফলে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের বাইরে থেকেও বিভিন্ন দেশ নিজেদের মূল্যায়ন তৈরি করে।

এবারের সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর ওয়াশিংটন থেকে আসা তৃতীয় জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তার সফর। এর আগে মার্চে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর এবং মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চ ঢাকা সফর করেন। ফলে পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো সফর নয়; বরং বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার অংশ।

ভারতীয় বিশ্লেষকদের একটি বড় উদ্বেগের জায়গা বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক। সাম্প্রতিক সময়ে অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বন্দর উন্নয়ন এবং সম্ভাব্য বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরও দিল্লির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী যদিও বলেছেন, করিডোর নিয়ে বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়নি। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনায় কোনো বিষয় আনুষ্ঠানিকভাবে না এলেও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নিজেদের মূল্যায়নে সেটিকে গুরুত্ব দেয়।

বাংলাদেশ এখন একদিকে চীন, রাশিয়া, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কেও নতুন ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা চলছে। এই বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতিই এখন বাংলাদেশের জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি জটিলতাও বাড়াচ্ছে।

বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহবুব কামাল শুক্রবার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর থেকেই তিনি মনে করেছিলেন, পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে। সার্জিও গোরের সঙ্গে বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিব্যক্তি দেখে তার সেই ধারণা আরও দৃঢ় হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। যদিও এটি তার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন; সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, খলিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অথচ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়াকে উসিলা করে প্রথম গেলেন চীনে, আমি খানিকটা অবাক হয়েছিলাম। চ্যানেল ওয়ানে এমনটা বলেছিলাম, চীন সফর আমেরিকার সঙ্গে চুক্তির গ্রস ভায়োলেশন। না জানি কী হয়! সার্জিও গোরের সঙ্গে মিটিং শেষে খলিলুর রহমানের ম্লান ও শুকনো মুখ দেখে কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি। প্রধানমন্ত্রী কি বুঝতে পারছেন পররাষ্ট্রনীতিটা জটিল হয়ে যাচ্ছে? তাকে পরামর্শ দিচ্ছি নিজে মাথা খাটান।

এদিকে সার্জিও গোর শুক্রবার কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেছেন। আগামীকাল শনিবার তার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সেখানেই হতে পারে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে চীন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, পাশাপাশি ভারত, রাশিয়া ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা। দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন আর কেবল একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়; বঙ্গোপসাগর, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, রোহিঙ্গা সংকট, আঞ্চলিক সংযোগ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে দেশটি বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।

সেই বাস্তবতায় সার্জিও গোরের ঢাকা সফরের প্রথম দিনের ঘটনাগুলো—যৌথ বিবৃতি না আসা, নৈশভোজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাতিল হওয়া, পরদিন ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে আকস্মিক বৈঠক এবং আলোচনার বিষয়ে দুই পক্ষের সীমিত তথ্য প্রকাশ—স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। এসব প্রশ্নের অনেকগুলোর উত্তর হয়তো এখনই মিলবে না।

তবে ভারতীয় গণমাধ্যমে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যে ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ উঠে এসেছে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে সেগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই সেই বিশ্লেষণের সত্যতা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। তাই বর্তমান বাস্তবতায় নিশ্চিত তথ্য, কূটনৈতিক ইঙ্গিত এবং সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ—এই তিনটিকে আলাদা রেখেই পরিস্থিতি মূল্যায়ন করাই অধিকতর সতর্ক ও দায়িত্বশীল পন্থা।